পূর্বাঞ্চল জিতেছিল ম্যাচটা ছয় উইকেটে। মধ্যাঞ্চল ৩১৭—তেই ইনিংস শেষ করে পরের দিন। প্রথম ওভারেই অনন্ত চার বলে উইকেট দুটি পায়, উসমানিকে সে ইয়র্ক করে। জীবন গুহঠাকুরতা নামে একটি ছেলে প্রচণ্ড পিটিয়ে খেলে ১৭১ করায় পূর্বাঞ্চল ১৩ রান এগিয়ে যায় প্রথম ইনিংসে। দ্বিতীয় ইনিংসে মধ্যাঞ্চল ১৪৭ রানে সবাই আউট। অনন্ত পায় প্রথম তিনটি উইকেট। পূর্বাঞ্চল চার উইকেট হারিয়ে জিতে যায়, জীবন আবার ৫৩ রানের একটা প্রচণ্ড ইনিংস খেলে।
সেমি—ফাইনালে পশ্চিমাঞ্চলের কাছে টসে হারে পূর্বাঞ্চল। ২৯৪ রানে ছিল জীবনেরই ৯১। অনন্তর সঙ্গে সপ্তম উইকেটে ৫৩ রান ওঠার পর জীবন রান আউট হয়েছিল। অরুণ সেন মাঠে গেছলেন কিন্তু নিজেকে ছেলের দৃষ্টির আড়ালে রাখেন। তিনি বুঝতে পারেন দোষটা ছিল অনন্তরই। দ্রুত দৌড়বার মতো পেশী ও ফুসফুসের ক্ষমতা তখন আর তার ছিল না বলেই অনন্ত দ্বিতীয় রান নিতে ইতস্তত করে জীবনকে ফেরত পাঠিয়েছিল। জীবন ক্রিজে ফিরতে পারেনি। রানটা কিন্তু নেওয়া সম্ভব ছিল। জীবনের পরপর দুটো সেঞ্চুরি পাওয়া আর হয়নি। অরুণ সেন ব্যথিত হন।
পশ্চিমাঞ্চলের ইনিংস যখন আট উইকেটে ২১১ তখন ম্যাচের সময় ফুরিয়ে যায়। ম্যাচের মীমাংসা হয়েছিল টস করে। অনন্ত ছয়টি উইকেট নিয়েছিল ৬০ রানে।
বাড়ি ফিরে আসার দু’দিন পর বিকেলে অনন্ত অবাক হয়ে দেখল, বাবা লোহার ভারী—ভারী চাকতি, পুলি আর লোহার দড়ি কিনে আনলেন। আর একটা মোটা ক্যানভাসের ব্যাগ, যা পিঠে বেঁধে ছেলেরা বই নিয়ে স্কুলে যায়।
‘জীবন গুহঠাকুরতার সেঞ্চুরিটা হল না তোমার জন্য কারণ তোমার শরীর আর বইতে পারছিল না বুট, প্যাড, ব্যাটের ভারসমেত নিজের ওজন। রানিং বিটুইন দ্য উইকেট খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কাল থেকে তোমাকে সকালে আরও বেশি দৌড়তে হবে, ছ’ মাসের মধ্যে অন্তত স্বচ্ছন্দে দিনে পাঁচ মাইলে পৌঁছনো চাই। এই ব্যাগে লোহা ভরে পিঠে বেঁধে পুশ—আপ আর কাঁধের কাছে ধরে সিট—আপ করতে হবে দু’বেলা। তোমার খাওয়ার চার্টও বদলাতে হবে। এই দ্যাখো সয়াবিন এনেছি। মাছ, মাংসটা খুব দরকারি নয়। লো ফ্যাট, হাই নিউট্রিশন ডায়েটের জন্য ডাল, তরিতরকারি, ফল আর দুধই তোমার প্রধান খাদ্য হবে। ভুসি—মেশানো আটার রুটি এখন থেকে আমরা সবাই খাব। খেতে খারাপ লাগবে, লাগুক, দু’দিনেই সয়ে যাবে। চকোলেট, আইসক্রিম, রসগোল্লা, সন্দেশ, যা কিছু চিনির জিনিস একদম ছোঁবে না। খাওয়ার ব্যাপারটা যেন বাঙালি ঘরের মতো না হয়, তা হলে কোনও দিনই তুমি মজবুত শরীর পাবে না।’
এরপরই অরুণ সেন একটু তীব্রস্বরে বলেছিলেন, ‘ছ’টা উইকেট নেওয়ার জন্য নিশ্চয় তুমি প্রশংসা আশা করছ?’
অনন্ত তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝেছিল তীক্ষ্ন সমালোচনা এবার আসছে। সেটা নরম করে দেওয়ার জন্য সে বলে, ‘এসব খেলায় ছ’টা কেন দশটা উইকেটেরও কোনও দাম নেই।’
‘সে কী! রীতিমত একটা ম্যাচ খেলে তুমি এগুলো সংগ্রহ করেছ, খেলার অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগাতে পেরেছ, এটার দাম কি কম? আগের খেলায় একই মাঠে একই পিচ থেকে তুমি উইকেট পাওনি। কেন? অপ্রত্যাশিত অনেক কিছুই তো তুমি এরপর প্রতি ম্যাচেই পাবে—ফেদারবেড পিচ, ড্রপড ক্যাচেস, ব্যাড কন্ডিশনস, ইনজুরি, আরও অনেক কিছুই, যার ফলে তোমার স্বাভাবিক ছন্দে তুমি বল করতে পারবে না। এজন্য তোমাকে ভাল বোলার হয়ে উঠতে হবে, আরও আরও ভালো, যাতে এইসব বাধাবিঘ্ন ছাপিয়ে যেতে পার, যাতে ভাঙ্গা পা নিয়েও বল করে উইকেট পেতে পার এমনভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।’
‘বাবা, আমি পরিশ্রম করলে ডেনিস লিলি বা অ্যান্ডি রবার্টসের মতো বোলার হতে পারব কি? তুমি মনে করো?’
‘কেন পারবে না! তোমার ট্যালেন্ট আছে তুমি কঠিনভাবে খাটতেও ইচ্ছুক। যে—কোনও বিষয়ে সাফল্য পেতে হলে যে তিনটি জিনিস দরকার, তার দুটো হল ওইগুলো। তৃতীয়টি হল, সাফল্যের জন্য প্রচণ্ড একটা খিদে থাকা দরকার। সাফল্যের মতো দুষ্প্রাপ্য কোনও—কিছু যখন আকাঙ্ক্ষা করবে তোমাকে তখন বাকি পৃথিবীকে পিছনে ফেলে দিয়ে সেটা ছিনিয়ে নিতে হবে। তোমাকে এও তীব্রভাবে আকাঙ্ক্ষা করতে হবে যে, তখন কোনও খাটুনিকেই আর কষ্টকর মনে হবে না, কোনও যন্ত্রণাই যথেষ্ট মনে হবে না, কোনও একাকিত্বই অসহ্য লাগবে না।’
সেদিন সন্ধ্যায়ই বাড়ির সবজি বাগানে স্টাম্প পুঁতে পিছনে জাল খাটিয়ে অনন্ত বল করতে শুরু করল। বাইরের ইলেকট্রিক আলোটা যথেষ্ট জোরালো নয় তাই টেবল ল্যাম্পটাও আনা হয়েছে। দৌড়ে আসার জন্য তাকে বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে গিয়ে রাস্তার ওপার থেকে দৌড় শুরু করতে হচ্ছে। গুড লেংথে, অফ স্টাম্পের এক ফুট বাইরে খাতার একটা সাদা পাতা জমিতে চুলের কাঁটা দিয়ে আটকানো। দুটি মাত্র পুরনো বল। ওই কাগজে ফেলে বল কাট করিয়ে লেগ স্টাম্পে মারতে হবে।
প্রায়ান্ধকার রাস্তা দিয়ে দুটি লোক যাচ্ছিল। তারা থমকে পড়ল।
‘দ্যাখ দ্যাখ, কাণ্ডটা দ্যাখ।’
‘কী দেখব, ছেলেটার তেকাঠিতে বল লাগানো?’
‘আরে না, জালের কাছে, বোধহয় মা হবে, বল কুড়িয়ে কেমন হাত ঘুরিয়ে ছুঁড়ে ফেরত পাঠাচ্ছে দ্যাখ!’
.
সেবার বাঙ্গালোরে ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য এক মাসের কোচিং ক্যাম্প করে। ভারতের নানা জায়গা থেকে একুশটি ছেলে সেজন্য নির্বাচিত হয়। বাংলা থেকে শুধু অনন্ত।
