‘হয়তো পারি। কিন্তু তার আগে বলো, একজন দোকানি কেন এভাবে কিস্তিতে টাকা নিয়ে একটা জিনিস তোমাকে দিচ্ছে? তার কারণ, সে ধারে দেওয়ার জন্য সুদও নিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত দেখবে আড়াই হাজার টাকার জিনিসের জন্য তুমি তিন হাজার টাকা দিয়েছ। যেহেতু তুমি প্রথমেই একবারে টাকাটা দিতে পারছ না তাই বেশি টাকা নিয়ে জিনিস নিচ্ছ, এর কি কোনও মানে হয়? অন্তু আমি এখন টিভি সেট কিনতে পারব না, এই নিয়ে তুমি আর কোনও কথা বলবে না।’
সেই রাতে অরুণ সেন লিখলেন:
অন্তু, ভীষণভাবে চাই তোমাকে একটা টিভি সেট কিনে দিতে, কিন্তু তা করতে হলে আমাদের জমানো টাকা থেকে তুলে সেটা কিনতে হবে। অথচ ওই সঞ্চয়টাই আমাদের মনের শান্তি। আমি বা তোমার মা প্রাইভেট কোচিং করি না, করলে আমাদের আয় অনেক বেড়ে যেত। আমাদের চলতে হয় নির্দিষ্ট একটা সামর্থ্যের গণ্ডির মধ্যে। এইজন্যই যাতে আমরা তোমার সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারি, আরও বেশি মানসিক স্বাধীনতা আমরা পাই যাতে সততা ও নির্ভীকতার পথে, জীবনের শুভ দিকগুলো খুলে দেবার পথে তোমাকে এগিয়ে দিতে পারি, যাতে তুমি সুখী হতে পারো। তোমার মা আর আমি এইরকমই ভেবেছি আর আমাদের বিশ্বাস সেটা কার্যকরও হচ্ছে। টিভি সেট আমাদের সকলেরই আনন্দের কারণ হবে কিন্তু তার জন্য আমাদের পরিকল্পনাটাও বদলাতে হবে।
কিন্তু জীবনের একটা ধরন আছে। একটা জিনিসের পর আর—একটা। আমাদের সঞ্চয়টা চলে গেলে আমাকে তখন টিউশনির কথা ভাবতে হবে, তখন আমি তোমার সঙ্গে, তোমার মায়ের সঙ্গে আর সন্ধ্যাটা কাটাতে পারব না।
বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মধ্যাঞ্চলের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা হয় কলকাতায়, সি সি অ্যান্ড এফ সি মাঠে। অনন্ত দলের সঙ্গে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের এক হোটেলে ছিল। হোটেলে যাওয়ার আগের দিন রাতে তনিমা ইস্ত্রি করছিলেন অনন্তর প্যান্ট—শার্ট। এক গ্লাস দুধ খাচ্ছিল সে। গ্লাসটা হঠাৎ হাত থেকে পড়ে গেল। অরুণ সেন বই পড়ছিলেন। মুখ তুলে বললেন, ‘নার্ভাস হচ্ছ?’
লজ্জিত অনন্ত প্রতিবাদ করে। তনিমা বলেন, ‘নার্ভাস হওয়া তো স্বাভাবিকই। এত বয়স্ক সব ছেলে বয়স ভাঁড়িয়ে শিং ভেঙে বাছুর সেজে খেলছে, তাদের সঙ্গে এইটুকু ছেলে—’
‘খেললেই বা! অন্তুকে লড়তে হবে জেতার জন্য, তাই না অন্তু? ক্রিকেটে তো আর হাতাহাতি যুদ্ধ হয় না! স্কিল আর বুদ্ধি থাকলে বয়স্করা ছোটদের কাছে হার মানে। জেতাটাই মূল ব্যাপার, এর কোনও বিকল্প নেই।’
‘বাবা, ভাগ্যেরও তো কিছু সাহায্য চাই।’
‘হ্যাঁ তাও দরকার। তবে কী জানো, সবার উপরে থাকাটা যদি অভ্যাস করে ফেলতে পার তা হলে তুমি ধরেই নেবে, ওটাই তোমার জায়গা আর জায়গায় থাকার জন্য সবসময়ই চেষ্টা চালিয়ে যাবে। কিন্তু অভ্যাসটা যদি চার—পাঁচ নম্বরে থাকাতেই আটকে যায় তা হলে উপরে ওঠার চেষ্টাটাও বন্ধ হয়। বাংলার ক্রিকেটের যা হয়েছে।’ এই বলে অরুণ সেনের মনে হল অল্পবয়সী ছেলের কোমল মনের উপর বোধহয় অযথা চাপ তুলে দিলেন। তাই যোগ করলেন, ‘আবার সবসময় সবাই যে জেতে তাও নয়। ম্যাচ হেরে গেলেই যে পৃথিবী লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে তাও নয়। সবথেকে বড় কথা হল, চেষ্টা করে যাওয়া। হারো বা জেতো, তুমি জানবে তুমি চেষ্টা করেছিলে।’
তনিমা ইস্ত্রি—করা জামা—প্যান্ট সযত্নে ভাঁজ করে ছোট একটা সুটকেসে রাখছিলেন। তাই দেখে অন্তু বলেছিল, ‘যেন লর্ডসে খেলতে যাচ্ছি, মা এমন ভাবে সুটকেস সাজাচ্ছে না! আরে এটা আন্ডার—ফিফটিন বিজয় মার্চেন্ট ট্রফির খেলা।’
‘তুই তো একদিন লর্ডসেও খেলতে যেতে পারিস।’
‘ওরেব্বাবা! লর্ডসে?’ মায়ের দিকে তাকিয়ে অন্তু এমন মুখ করল যেন একদলা তেঁতুল মুখে দিয়ে ফেলেছে। ‘বিল্ডিং ক্যাসল ইন দ্য এয়ার? স্বপ্নটপ্ন পরে দেখব, আগে তো এই ট্রফিটা জিতি।’
‘পরে কেন দেখবে? দেরি করে দেখলে কাজে নামতেও দেরি হয়ে যাবে। আকাশে প্রাসাদ বানানোটা মোটেই বোকাদের কাজ নয়। আজ থেকে প্রায় একশো চল্লিশ বছর আগে হেনরি ডেভিড থরো নামে এক আমেরিকান প্রকৃতিপ্রেমী দার্শনিক তাঁর বাড়ি থেকে দু’ কিলোমিটার দূরে ওয়ালডেন নামে এক ঝিলের ধারে একটা ছোট্ট কাঠের ঘর, ছ’ হাত বাই দশ হাত, তৈরি করে সেখানে কিছুকাল থাকেন। ঘরটা বানাতে খরচ হয়েছিল মাত্র আঠাশ ডলার। তারপর থরো লেখেন,—’ তনিমা মুচকি হেসে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী যেন লাইনটা?’
‘যদি আকাশে প্রাসাদটা বানিয়ে ফেলেই থাক, তা হলেও সেটা ভেঙে পড়বে না, ওটা ওখানেই থাকবে। শুধু এইবার তুমি ওর নীচে ভিতটা তৈরি করে ফেলো।’ অরুণ সেন তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে পালটা মুচকি হাসলেন। ‘পরীক্ষায় পাশ তো?’
সেই ম্যাচের প্রথম দিনে মধ্যাঞ্চল আট উইকেটে ৩১৭ রান তুলেছিল। মহম্মদ উসমানি তিন নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ১৪৬ নট আউট থেকে যায়। অনন্ত ১৬ ওভার বল করে ৬৫ রান দিয়ে একটিও উইকেট পায়নি। অরুণ সেন মাঠের ধারে বসে খেলা দেখেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, উইকেটে পেস নেই, বল উঠছেও না, জোরালো বাতাসে সুইং করানো বল লাইনে থাকছে না, একটা রিটার্ন ক্যাচ ধরার চেষ্টায় মাটিতে ঝাঁপিয়ে অন্তু ডান কাঁধে চোট পেয়েছে, তা ছাড়া উসমানি ছেলেটির পেস বল খেলার টেকনিকটা ভাল। তাঁর আরও মনে হয়েছিল, মাঠের ধারে বাবাকে দেখে অন্তু যেন অস্বস্তিতে ভুগছিল।
