‘এই টাকাটা দিয়ে একটা ব্যাট কেনা যাবে না?’
‘অন্য একজনের নাম—ঠিকানা—লেখা ব্যাগের টাকা নেওয়াটা আমাদের পক্ষে সৎ না অসৎ কাজ হবে বলে মনে করো?’
‘অন্যের ব্যাট নিয়ে খেলতে আমার বিচ্ছিরি লাগে।’
‘আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।’
‘অসৎ কাজ, এটা তো তুমি জানোই, তা হলে আর—।’
‘কিন্তু তুমি এটা জানো কি না আমি সেটাই জানতে চাই।’ তীব্র স্বরটাকে কোমল করে অরুণ সেন তারপর বলেন, ‘অন্তু, জীবনটাকে সোজা সরল রাখো। যেমন ঠিক কাজ আছে তেমনিই বেঠিক কাজও আছে আর সোজাভাবে যদি এদের দিকে তাকাও, তা হলে দেখবে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। যখন কোনও কিছুকে বেঠিক বলে জানবে, তখন সেটা করার চেষ্টা করে সময় নষ্ট কোরো না। কারণ সেটা করে তুমি আনন্দ পাবে না।’
‘এটা একশো তেরো টাকা না হয়ে যদি এক লক্ষ টাকা হত?
‘সংখ্যাটা বিরাট হলেই ভাল বা মন্দের নীতিটা বদলে যায় না। টাকাটা যদি রাখি, আমি তো জানবই এটা অন্যায় আর নিজেকে তখন আমার খুব খারাপ লাগবে। লাখ টাকা আমার দরকার নেই কিন্তু আমার ভীষণ দরকার নিজেকে ভাল লাগা।’ অরুণ সেন ছেলেকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলেছিলেন, ‘নিজেকেই যদি তোমার প্রিয় না লাগে তা হলে কাউকে, কোনও জিনিসকেই তোমার আর প্রিয় লাগা সম্ভব নয়।’
দু’দিন পরেই অরুণ সেন দেখলেন বিকেলে অন্তু বাড়ির দেওয়ালকে উইকেট করে একা—একাই বল করে যাচ্ছে মাঠে খেলতে না গিয়ে।
‘কী হয়েছে?’
‘ওরা আমায় গাধা বলেছে, আরও অনেক কিছু বলেছে মানিব্যাগটা তোমায় দিয়েছি বলে।’
‘সেজন্য ওদের সঙ্গে খেলবে না?’
‘না। তুমিই তো বললে, ঠিক কাজ করলে নিজেকে নিজের ভাল লাগে।’
‘তোমার নিজেকে ভাল লাগছে?’
‘হ্যাঁ।’ বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে অন্তু বলেছিল, ‘কিন্তু কেউ আমাকে পছন্দ করে না।’
‘আমি করি। তোমাকে খুব বড় মনে করি। আমার ছেলে বলে সেজন্য গর্বও হচ্ছে।’
মুখের হাসিতে অন্তুর মুখ ছলছলিয়ে উঠল। সে শুধু বলল, ‘আমি তোমার ছেলে।’
‘নিশ্চয়।’
দু’জনে দু’জনকে জড়িয়ে নীরবে বসে রইল। বাবা আর ছেলে, শিক্ষক আর ছাত্র।
.
অরুণ সেন বাড়ি থেকে কিছু দূরে একটা বড় ক্লাবে অনন্তকে নিয়ে গেলেন। তাঁর এক ছাত্র সেই ক্লাবের খেলোয়াড়। জেলার লিগে খেলে। স্কুলের টিমেও অনন্ত সুযোগ পেয়েছে। ১৫ বছরের কম বয়সী স্কুল ছাত্রদের বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে বাংলা দল গড়ার ট্রায়াল ম্যাচে সে হ্যাটট্রিক করায় দুটি ইংরেজি কাগজে সেটা উল্লিখিত হয়। পড়াশুনোয়ও সে ভাল। কিন্তু খেলা এবং পড়ায় ভাল হওয়ার জন্য, তার উপর বাংলা স্কুল দলে খেলায়, ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের এক হাজার টাকা স্কলারশিপ পাওয়ায় আর বাঙ্গালোরে একমাসের সর্বভারতীয় ক্যাম্পের জন্য নির্বাচিত হওয়ায় ক্রমশ সে ক্লাসের বন্ধুদের কাছে প্রায় একঘরে হয়ে যেতে লাগল। অরুণ সেন এতে বিস্মিত হননি। কোনও কিছুতে সেরা হওয়া মানেই নিঃসঙ্গ হওয়া। সেরা মানেই হল চরম বা পরম, এর অর্থ নাম্বার ওয়ান। আর সেটা একজনই মাত্র হতে পারে। ‘স্কুলে সব ছেলের মধ্যে খেলাধুলোয় সেটা তুমি।’ অনন্তর কাঁধ—ধরা মুঠোটা শক্ত করে তিনি বলেছিলেন, ‘একা হয়ে যাচ্ছ? তাই যাও। কিন্তু তুমি মোটেই একা নও। এখন অবশ্য সেরকমই মনে হবে, কিন্তু পৃথিবীতে তোমার মতো আরও অনেক একা মানুষ রয়েছে। কোন—না—কোনওভাবে, কোনও—না—কোনওদিন, এক নম্বররা পরস্পরকে খুঁজে পেয়ে যাবে।’
অরুণ সেন আরও অনেক কথা তাঁর ছেলেকে বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু সব কথা একসঙ্গে বললে এত অল্পবয়সী মন বুঝতে পারবে না ভেবে আর বলেননি। সেই রাতে তিনি একটা নোটবইয়ে লেখা শুরু করেন। প্রথম পাতায় বড়—বড় অক্ষরে লিখলেন, ‘অন্তুর জন্য বাবার পরামর্শ’। তিনি স্থির করলেন, অন্তুর জানা দরকার এমন সব কথা যখনই তার মনে উদয় হবে সেগুলো লিখে রাখবেন। যখন বড় হয়ে কথাগুলোর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে তখন নোট বইটা ওকে দেবেন।
তিনি প্রথম দিন লিখেছিলেন :
যতই তোমার বয়স বাড়তে থাকবে ততই তুমি শুনবে, যেসব মহৎ গুণাবলীর দ্বারা আমাদের এই বিরাট প্রাচীন দেশ বিদেশী শাসকের সঙ্গে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে সেইসব গুণাবলীকে লোকে ব্যঙ্গ—বিদ্রূপ করছে। সেগুলি হল : সততা, বিনয়, কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ়তা, গুরুজনদের ও নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা—সম্মান, প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস, দেশকে ভালবাসা।
অন্তু, সততা গুণের জন্যই তুমি মানিব্যাগটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিলে। সেজন্য বন্ধুরা তোমায় বোকা গাধা বলেছিল। তারা চেয়েছিল টাকাগুলো খরচ করতে। এটা চুরিরই সমান অপরাধ। পুত্র, নিজের জায়গায় অটল হয়ে দাঁড়াও। নির্বান্ধব হয়ে পড়ার ভয়ে, যেসব শিক্ষা তুমি পেয়েছ, তা যদি কয়েকটা চোরকে বন্ধু হিসেবে পাবার জন্য বিসর্জন দাও তা হলে সেটা খুব ভালদরের লাভ বলা যাবে না।
‘অন্তু, টেলিভিশন—সেট এখন তোমার দরকার নেই।’ অরুণ সেন বললেন। ‘তুমি টিভি সেট চাও, আমিও চাই। কিন্তু আমি তোমাকে শুধু সেইটাই দিতে পারি, যা তোমার সত্যিকারের দরকার—খাদ্য, গৃহ, শিক্ষা, সেইরকম মা আর বাবা যাঁদের সময় এবং যোগ্যতা আছে তোমাকে ভালবাসা দেবার।’
‘আমাদের ক্লাসের দু’জনের বাড়িতে ইনস্টলমেন্টে টিভি সেট কিনেছে। ওইভাবে তো আমরাও কিনতে পারি।’
