বাড়িটা একটা ষাট ফুট লম্বা জমিতে। জমির এক ধার ঘেঁষে বাড়ি, অন্য ধারে কুড়ি ফুট চওড়া খালি জমি। সেখানে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, কাগজিলেবু, পালংশাক, লাউ, কুমড়ো ইত্যাদির কিচেন গার্ডেন। এই তরকারি—বাগানের পরিচর্যাই ছিল স্বামী—স্ত্রীর অবসর বিনোদন।
একদিন ছেলেটি বাবার কাছে পয়সা চাইল রবারের বল কেনার জন্য। সে এবং কয়েকজন মিলে ক্রিকেট খেলবে। বাবা পয়সা দিলেনই শুধু নয়, ওদের খেলা দেখার জন্য বাড়ি ফেরার সময় মাঠের ধারে দাঁড়িয়েও পড়তেন। তিনি স্কুল ও কলেজ টিমে ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলেছেন। বাচ্চচাদের সেই খেলা দেখতে—দেখতে তাঁর মনে হল, ছেলের মধ্যে খেলোয়াড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ওর শরীরের পটুত্ব এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইচ্ছাটা অন্য ছেলেদের থেকে বেশি। তিনি স্থির করলেন ছেলেকে উৎসাহ দেবেন ক্রিকেটার হয়ে ওঠার জন্য।
তিনি প্রথম টেস্ট ম্যাচ দেখতে ইডেন গার্ডেনসে যান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন ভারতে দ্বিতীয়বার সফর করতে আসে। রয় গিলক্রিস্ট এবং ওয়েস হলের ফাস্ট বোলিং তাকে স্তম্ভিত করে। তিনি অদ্ভুত এক সিরসিরানি অনুভব করেছিলেন রোমকূপে, হৃৎস্পন্দনের গতি দ্রুত হয়েছিল বল করার জন্য বোলারদ্বয়ের ছোটার সময়। বিস্ফারিত চোখে প্রবল গতিতে এক উচ্ছ্বাসের ধেয়ে যাওয়া এবং প্রচণ্ড বিস্ফোরণে শক্তিমত্তার ফেটে পড়া দেখতে—দেখতে তিনি যে শিহরণ অনুভব করেছিলেন, যে মুগ্ধতায় তাঁর দু’চোখ ভরে গেছল তা আর ভুলতে পারেননি। অরুণ সেন স্থির করলেন অনন্তকে ফাস্ট বোলার তৈরি করবেন।
তিনি খেলা শেখার বই কিনে পড়তে শুরু করলেন। ফাস্ট বোলিং সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। বই পড়ে কিছুটা ধারণা হল। তবে একটা জিনিস তিনি বুঝলেন শুধু বই পড়ে নয় আসল শিক্ষাটা হয় প্রত্যক্ষ করে, ভাল বোলারদের বল করা দেখে। শীতকালে রবিবারে ঝুলি কাঁধে তিনি ছেলেকে নিয়ে কলকাতার ময়দানে খেলা দেখাতে আসতেন। ঝুলিতে থাকত খাবার। খেলায় যখন লাঞ্চ হত, ওরাও তখন মাঠের ধারে বসে খেয়ে নিত। খেলা চলার সময় অনন্তকে তিনি বুঝিয়ে দিতেন বোলিংয়ের কলাকৌশল। বাড়ির গায়ে লম্বা সরু জমি, যেখানে তাদের রান্নার বাগান, সেখানে অরুণ সেন ছেলেকে অনুশীলন করাতে লাগলেন পিচ তৈরি করে। বাগান উঠে যাওয়ায় তনিমা সেন আপত্তি করেননি। স্বামী এবং পুত্রের উৎসাহ ও নিষ্ঠাকে তিনি আড়াল থেকে সমর্থন করেছেন। তাঁদের ছিল শান্তির এবং সুখের সংসার।
ছোট একতলা বাড়িটা তার বাসিন্দাদের মতোই সাদাসিধে, বাহুল্যবর্জিত। আকর্ষক কিন্তু দামি আসবাবহীন। অরুণ এবং তনিমা ‘স্মল ইজ বিউটিফুল’, এই নীতিতে বিশ্বাসী। ওঁরা মনে করেন, জীবনকে নানা ধরনের আরাম ও বিলাসের মধ্যে টেনে নিয়ে গেলে তাঁদের মন ও সময় নানারকম হাবিজাবিতে জড়িয়ে শুধু তাতেই মগ্ন হয়ে যাবে, মুক্ত স্বাধীন অবস্থাটা হারাবে। জীবনকে অনেক তীক্ষ্ন, চেতনাকে অনেক উজ্জ্বল এবং মনকে কালিমামুক্ত রাখার জন্য ওঁরা প্রয়োজনের বেশি কোনও কিছু দিয়ে নিজেদের ঘেরাও করতে দেননি।
এই ধরনের মানসিকতার জন্যই অরুণ সেন এককথায় বড় প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। প্রায় পনেরো লক্ষ টাকা মূল্যের ভাল অবস্থার রাসায়নিক জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে বলে সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য তাঁকে চাপ দিচ্ছিল তাঁর উপরওয়ালা। যন্ত্রগুলো খারাপ হয়ে গেছে তাই কম দামে বিক্রি করা এবং যাকে বিক্রি করা হবে তার কাছ থেকে টাকা খাওয়ার এই ষড়যন্ত্রে অরুণ সেন নিজেকে মেলাতে রাজি হননি। তাঁকে তখন প্রলোভন দেখানো হয় আরও বেশি বেতন, আরও বড় ফ্ল্যাট, আরও বড় গাড়ি, সেরা চিকিৎসা, প্রতি বছর পাহাড়ে কি সমুদ্রতীরে সপরিবার ছুটিযাপন সবই কোম্পানির খরচে তিনি পাবেন। এখনও তিরিশ বছর বাকি অবসর নেওয়ায়। তিরিশ বছর ধরে তিনি এইসব ভোগ করতে পারবেন।
সেদিন অফিস থেকে ফিরতে—ফিরতে অন্যান্য দিনের মতই রাত প্রায় ন’টা হয়ে গেছল। অন্তু ঘুমিয়ে পড়েছে। কোনওদিনই তাকে জাগা অবস্থায় পান না। সারাদিনে একবারও ছেলেকে সঙ্গ দিতে, ওর সঙ্গে গল্প করতে, খেলা করতে পারেন না। এই যে সময় দিতে পারছেন না, এর বিনিময়ে তা হলে অন্তুকে তিনি কী দিতে পারেন? কয়েক বান্ডিল টাকা? সন্তানকে দিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু এটাই কি পিতার সেরা জিনিস? উত্তরাধিকার হিসাবে তাঁর মনে হয়নি টাকাটাই যথেষ্ট।
অরুণ সেন তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘যদি চাকরি ছাড়ি তা হলে এখনকার স্বাচ্ছন্দ্য, এই ফ্ল্যাট, এই গাড়ি, কিছুই থাকবে না। তোমার কি তাতে অসুবিধা হবে?’ তিনি জানতেন তনিমা কী উত্তর দেবেন। তবু জিজ্ঞাসা করেছিলেন। অনন্তর তখন পাঁচ বছর বয়স। ‘অন্তু নোংরা টাকায় মানুষ হোক, নিশ্চয় তা চাই না।’ তনিমা এই জবাব দিয়েছিলেন। এর সাতদিন পরই দমদমের এই বাড়িটা কিনে, অরুণ সেন চাকরিতে ইস্তফাপত্রটি লিখে ফেলেন। স্বামী—স্ত্রী দু’জনেই রসায়নবিদ্যার প্রথম শ্রেণীর এম এসসি। দু’জনেই কলেজে শিক্ষকতার কাজ পেয়ে যান একমাসের মধ্যে।
.
অনন্তর বয়স যখন এগারো, একদিন সে রাস্তা থেকে একটা মানিব্যাগ কুড়িয়ে পায়। ব্যাগটা সে বাবাকে দেয়। ব্যাগে ছিল একশো তেরো টাকা আর মালিকের নাম ও ঠিকানা।
