কিন্তু সেই ‘তা হলে’টা মুছে দিল দুয়া আর কাপুর। ভারত আবার খাড়া হয়ে উঠেছে। সেকেন্ড ইনিংসেও কি এইরকম একটা সমান সমান অবস্থা তৈরি হবে?
জীবন পায়চারি শুরু করল। বারান্দায় এসে রাস্তার দিকে অন্যমনস্ক হয়ে লোকজন, গাড়ির চলাচল কিছুক্ষণ দেখে আবার ঘরে এল। উইকেট, কোনও সন্দেহ নেই উইকেটের জন্যই আঠারোজন আউট হয়েছে। ভার্দে বা বোলানের মতো টেকনিক্যালি অত বড় ব্যাটসম্যানরাও কীভাবে আউট হল! টিভির রিপ্লেটা জীবনের চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল। উইকেটে বল পড়ে সিম করে ঢুকল, কোমরের কাছে উঠে এল, দু’জনেই ছ’ফুট লম্বা, ব্যাট সরাতে পারল না।
কিন্তু উইকেট কি এই রকমই থাকবে? এদের চরিরত বদলায়। এমনকী এবেলা—ওবেলাও বদলে যায়। কাল যদি স্বাভাবিক হয়ে যায় ভারত কি আড়াইশো তুলতে পারবে? ফোর্থ ইনিংসটা খেলতে হবে অস্ট্রেলিয়াকে। পিচ যদি ডিটোরিয়েট করে! ধারাদ্ধার আর ফরজন্দের অর্থডক্স লেফট আর্ম স্পিন, পুষ্করনার অফ স্পিন যদি লাইন পেয়ে যায় আর ভালভাবে ঘোরে, তা হলে…।
বাঁ হাতে ফলসটা নিয়ে প্যাডের কাগজে সে কাঁপা কাঁপা লাইনে একটা মুখের স্কেচ করতে লাগল। তা হলে এই টিমই থাকবে। অস্ট্রেলিয়ানদের মধ্যে দু—তিনজন ছাড়া কেউই উঁচুদরের স্পিন খেলতে পারে না। জীবন দীর্ঘশ্বাস চাপল। ঘসঘস করে স্কেচটার নীচে লিখল, ”কোনও আশা নেই টেস্ট খেলার।”
অক্ষরগুলো ধ্যাবড়া, বাঁকা এবং ছোট—বড়। বাঁ হাত দিয়ে লেখার অনুশীলন রোজই সে করে। ধীরে—ধীরে লিখলে পরিচ্ছন্ন লেখা হয়। দ্রুত লিখতে গেলেই অসমান হয়ে যায়। সেই দুর্ঘটনার পরের দিনই ডান হাতের কবজির চার ইঞ্চি উপর থেকে হাতটি কেটে বাদ দিতে হয়েছে। নকল একটা হাত এখন লাগান। সেটা ঢাকতে সে গায়ের চামড়ার রঙের সুতির গ্লাভস পরে আর ঢিলে লম্বা—হাতা পাঞ্জাবি। ডান হাতে হালকা ছোটখাটো কাজ যেমন বই ধরে পড়া বা পরদা সরানো থেকে চলন্ত মোটর গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে থাকার মতো কাজও পারে। ঘুড়িও উড়িয়েছে, অসুবিধে হয়নি।
প্যাডটা টেবলের উপর ছুঁড়ে রেখে সে নিজের ঘরে এল। ঘরের দেওয়াল পরিষ্কার, একটা ছবিও নেই। ক্রিকেট খেলার কোনও সরঞ্জামও নেই। একটা হাতকাটা সোয়েটার পরে নিয়ে তার উপর পাঞ্জাবি পরল। গাড়ির চাবি আর টাকার পার্স পকেটে রেখে সে একতলায় নেমে এল।
বাবা কাজে বেরিয়েছেন, মা তার বন্ধুর বাড়ি গেছেন, ভাই কোথায় গেছে কে জানে। জীবনকে দেখে বাড়ির কাজের লোক বলল, ”বড়দা কি গাড়ি বার করবেন?”
”হ্যাঁ, গ্যারাজের শাটারটা তুলে দাও।”
এই গাড়ি কেনা নিয়ে আপত্তি ছিল তার মায়ের। স্বাভাবিকই। দু’চাকারই হোক বা চার চাকারই হোক, তিনি ছেলেকে গাড়ি চালাতে দিতে নারাজ কিন্তু বাবা রাজি। স্ত্রীকে তিনি বলেছিলেন, ‘জীবন তো স্বাভাবিকই, ও তো পঙ্গু হয়ে যায়নি। একটা হাতের একটুখানি শুধু নেই, তা ছাড়া সবই তো ঠিকঠাক রয়েছে। তা হলে ওকে অসহায়, অনুপযুক্ত ভাবছ কেন? তার থেকেও বড় কথা, ও নিজে যাতে নিজের সম্পর্কে এইরকম না ভাবে সেটাই তো আমাদের দেখা দরকার। নিজেকে অক্ষম মনে করলে সে কষ্ট পায়, দুঃখ পায়, জীবনে দাঁড়াতে পারে না। নিজেকে বোঝা মনে করলে তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। তুমি কি তাই চাও? জীবনকে ভুলে যেতে দাও ওর অঙ্গহানি ঘটেছে। ওকে বুঝতে দাও, আর পাঁচজনের মতোই সে স্বাভাবিক।’
তখন মা বলেন, ‘কিন্তু ও যে মারা যেতে পারত। ভগবানের দয়ায় শুধু বেঁচে গেছে।’ বাবা হেসে বলেছিলেন, ‘আমরা যে—কেউই তো যে—কোনও সময়, যে—কোনও জায়গায় দুঘর্টনায় মারা যেতে পারি। তাই বলে কি কেউ গাড়ি চালায় না? জীবন নিশ্চয় ওর অসুবিধেগুলো কাটিয়ে উঠবে।’
পুরনো এই প্রিমিয়ারটা বাবা কিনে দিয়েছিলেন দেড় বছর আগে। সেই থেকে স্বচ্ছন্দে নিখুঁতভাবেই জীবন গাড়ি চালাচ্ছে। আজও সে গাড়ি নিয়ে কাঁকুড়গাছি মোড়ে, রাস্তা জুড়ে দাঁড়ানো মিনিবাসের জন্য তৈরি জ্যামের মধ্য দিয়ে পথ করে এগোল।
পথে শুধু একটা জায়গায়, একটা মোটা গুঁড়িওলা গাছের কাছে সে অ্যাক্সিলেটরের থেকে পায়ের চাপ তুলে গাড়িটাকে মন্থর করল। দাঁতে দাঁত চেপে, চোয়াল শক্ত করে তারপর সে ডান পায়ে অ্যাক্সিলেটর চেপে, মেঝেয় মিশিয়ে দিল। একটা খ্যাপা ষাঁড়ের মতো প্রিমিয়ারটা ছুটল দমদমের দিকে, অনন্তদের বাড়ির উদ্দেশে।
.
।। তিন ।।
রেল লাইনের পুবে একটা টানা লম্বা ঝিল। ঝিলের পুব দিকের পাড় ঘেঁষে একতলা বাড়ি। একটা দালানকে ঘিরে তিনটি শোবার ঘর, রান্নাঘর ও স্নানঘর। দালানের পশ্চিমটা বাইরে খোলা তবে কোলাপসিবল লোহার দরজা আছে। দালানের লাগোয়া বাইরে একটা চাতাল, যার মাথার উপরে ঢালু করে নামানো লাল টালির ছাদ। চাতালটা থেকে দু’ধাপ নেমে সামনের রাস্তা পর্যন্ত তিরিশ ফুট ঘাসের জমি। সেখানে কিছু ফুল গাছ। ঘাসের এই আঙিনাতেই ইজিচেয়ারে স্বামী—স্ত্রী বিকেল সন্ধ্যায় বসতেন। পশ্চিমে ঝিল তারপর রেললাইন, তারপর অস্তগামী সূর্য। ওরা দেখতেন, মৃদুস্বরে এটা—ওটা নিয়ে কথা বলতেন। একমাত্র ছেলে কাছাকাছি মাঠ থেকে খেলা সেরে ফিরে এসে ওদের কাছে বসত। তিনজনে কিছুক্ষণ গল্প করার পর ছেলেটি হাত—মুখ ধুয়ে, কিছু খেয়ে পড়তে বসত। বাবা—মা দু’জনেই কলেজ শিক্ষক। তাঁরাও তখন অধ্যয়নে বা ছাত্রদের খাতা দেখার কাজ নিয়ে বসতেন। রান্নার ও সংসারের জন্য এক প্রৌঢ়া আছে। ঠিক দশটায় বাড়ির আলোগুলি নিবে যেত, ঠিক ভোর পাঁচটায় দালানের কোলাপসিবল দরজার তালা খুলে ছেলেটি দৌড়তে বেরোত বাবার সঙ্গে।
