”একেবারেই না চটে পাণিগ্রাহী প্রতিশ্রুতি দিলেন, ‘এখন আমাদের হার হল ঠিকই, কিন্তু আমার কথা মিলিয়ে নেবেন, এই সিরিজেই ওদের ঢিট করব।’ জানি না কীভাবে তিনি ঢিট করবেন, কেন না খেলোয়াড়দের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই ওই সই না করা দশজনই বিদ্রোহ করবে। গতকাল হোটেলে অধিনায়ক ভার্দের ঘরে বেশ কিছু সিনিয়র ক্রিকেটার মিলে শলা—পরামর্শ করে ঠিক করেছেন, অধিনায়ককে খবরের কাগজে প্রতিদিনের খেলা সম্পর্কে লিখতে দিতেই হবে। বিপক্ষ অধিনায়করা লিখে চাপ সৃষ্টি করতে পারে যদি তা হলে ভারতের অধিনায়কই বা লিখবেন না কেন? জানা গেল এই ‘বিদ্রোহীরা’ বোর্ডকে চিঠি দিয়ে তাঁদের সিদ্ধান্তের কথা জানাবেন। চিঠির খসড়া রচনার ভার কাপুর ও মধুরকরকে দেওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে বোর্ডের সঙ্গে ক্রিকেটারদের প্রচণ্ড এক সংঘর্ষ আসন্ন। দু’পক্ষই শর্তের ব্যাপারে একটা হেস্তনেস্ত করতে চায়।
”প্রথম টেস্টের ঠিক আগে এমন অবস্থা তৈরি হওয়ায় খেলোয়াড়দের মানসিক ভারসাম্য যে সুস্থির থাকবে না, তা বোধহয় না বললেও চলে। তবে যদি প্রথম টেস্ট—ম্যাচে ভারত—দল জিততে পারে, বা সম্মানজনক ড্র—ও করতে পারে, তা হলে জনমত ক্রিকেটারদের দিকেই যাবে। তখন বোর্ডের পক্ষে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে না। আর যদি হারে, তা হলে ক্রিকেটাররা কোণঠাসা হয়ে পড়বেই। বোর্ড তখন ‘ঢিট’ করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নিতে মনে হয় দ্বিধা করবে না। কিন্তু কী ব্যবস্থা তাঁরা নেবেন? সারা দলটিকে সাসপেন্ড করবেন? তা হলে খেলবে কারা? যাই হোক, এর উত্তর কয়েকদিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে।”
টিভি সেট বন্ধ করে জীবন বাঁ হাতে আজকের খবরের কাগজটা তুলে নিল। প্রবন্ধটি দু’বার পড়া হয়ে গেছে। তবু আবার চোখ বুলিয়ে সেই জায়গাটায় দৃষ্টি রাখল। যেখানে লেখা ‘আর যদি হারে, তা হলে ক্রিকেটাররা…।”
এবার সে লেখার প্যাডটা তুলে নিল। টিভি—তে টেস্ট—ম্যাচ দেখতে—দেখতে সে স্কোর লিখে রেখেছে। ভার্দে টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয়। লাঞ্চের সময় ভারতের সাত উইকেটে ৫৮ রান। লাঞ্চের পর চার ওভারে ইনিংস শেষ ৭৪। ৫৩ বলে ২৪ রান দিয়ে লটন পাঁচটি, ৬৬ বলে ২০ দিয়ে ব্রাইট তিনটি আর একটি করে উইকেট নিয়েছে অ্যামরোজ ও স্টিল ১৭ ও ১৩ রান দিয়ে। অতিরিক্ত রান হয়েছে ছয়টি। সবচেয়ে বেশি রান করেছে ভোজনি—২০, তারপর ভার্দে—১০ আর নট আউট রয়ে গেছে গুপ্তা ১২ রানে। তিনজনে শূন্য রান—ফরজন্দ, দুয়া আর পিল্লাই। মধুরকর খেলেনি পিঠে ব্যথা হওয়ায়। তার জায়গায় নেওয়া হয় অরবিন্দ নবরকে। আটটি বল খেলে একরান করে সে বোল্ড হয়। কর্ণাটকের মহম্মদ উসমানির এটি প্রথম টেস্ট খেলা। ৪২ মিনিটে ২৫ বল খেলে সে পাঁচ রান করেছে।
জীবন পাতা ওলটাল। ভ্রূ কুঁচকে সে স্কোরগুলো দেখতে দেখতে মনে মনে কী যেন হিসাব করল। অস্ট্রেলিয়া বাকি তিন ঘণ্টায় আট উইকেট হারিয়েছে ১১৮ রানে, ৪৪ ওভার খেলে। ভারতও তা হলে পালটা ঘা দিয়েছে! একদিনে আঠারোজন আউট! টিভি কমেন্টেটররা বারবার উইকেটের কথা বলেছে। কেউ বলেছে আন্ডার প্রিপেয়ার্ড, কেউ বলেছে মেঘলা আবহাওয়ায় আর বাতাসে বল লেট সুইং করেছে, সিম করেছে, লাফিয়ে বুকের কাছে উঠেছে। একজন তো বলল, ভারতের ব্যাটসম্যানদের ফাস্ট বল খেলার টেকনিক জানা নেই, সাহসটাও নেই।
কিন্তু সত্যিই হতভম্ব—করা ক্রিকেট আজ খেলা হল। লটন আর ব্রাইটের বল সত্যিকারের ফাস্ট। দুজনেই চল্লিশটার বেশি টেস্ট খেলেছে, দুজনেরই উইকেট সংখ্যা দুশোর কাছাকাছি। তা ছাড়া পৃথিবীর সেরা অলরাউন্ডারদের একজন জন আরউইন, যার প্রায় তিন হাজার রান আর তিনশো আঠাশ উইকেট, এই টেস্টে খেলছে না। তাতেই মনে হচ্ছে ম্যাচটা আড়াই দিনে শেষ হয়ে যাবে! ভারতের মাটিতে টেস্ট—ম্যাচ প্রথম দিনেই আঠারো উইকেট আগে কখনও পড়েছে কি?
স্বীকার করতেই হবে, ভারতের বোলাররাও সমানে টক্কর দিয়েছে। বোলানের মতো ব্যাটসম্যান, টেস্টে যার ছ’হাজার রান, সতেরোটা সেঞ্চুরি, সেও মাত্র নয় রান করল। নট আউট আছে ওপেনার রজার্স ৪৪ রানে আর ব্রাইট ১২ রানে। লটন ১৯ করেছে। তা ছাড়া বাকি সাতজন ডাবল ফিগারেই পৌঁছতে পারেনি। চমৎকার বল করল কাপুর আর দুয়া। আটটির মধ্যে দুয়া চারটি, কাপুর তিনটি উইকেট পেয়েছে। একটি রান আউট।
জীবন অস্থিরবোধ করতে লাগল। ম্যাচটায় যদি ভারত জেতে? বলা যায় না, ক্রিকেটে কিছুই বলা যায় না? যদি জিতে যায় তা হলে ক্রিকেট—বোর্ড ঢিট করার সুযোগ হারাবে। ক্রিকেটারদের নিয়ে দেশ জুড়ে নাচানাচি শুরু হয়ে যাবে। কার ঘাড়ে তখন ক’টা মাথা থাকবে ওদের বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেবার জন্য! বরং ওদের সমর্থন করেই ওইসব সাংবাদিকরা, যারা বলে আপনারা মেরুদণ্ডহীন বলেই ক্রিকেটাররা বেয়াড়া হবার সাহস পায়, তারাই তখন বলবে কাগজে লিখতে দিতে ক্ষতি কি? খুশিমতো লোগো পরলে ক্রিকেট অশুদ্ধ হয় না। ম্যাচ জেতাটাই তো আসল কথা।
কিন্তু জীবনের কাছে এই ম্যাচটা জেতা আসল কথা নয়। প্রবন্ধটায় পাণিগ্রাহীর একটা কথা তার মাথায় গেঁথে আছে সকাল থেকে। ‘আমার কথা মিলিয়ে নেবেন এই সিরিজেই ওদের…।’ আর জনৈক সাংবাদিকের প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে বলা কথাটাও, ‘বাদ দিয়ে দিন। সবক’টাকে বাদ দিন’। দুটো কথা মিলিয়ে তার মধ্যে যে ঘূর্ণি তৈরি হচ্ছিল, সেই ফেনানো আবেগ নিয়েই সে টিভি—তে দেখল ভারতের ব্যাটিংয়ের চুরমার ধ্বংস, তখন সে মনে—মনে চেয়েছিল, হারুক, ভারত হারুক। এই ক্রিকেটারদের ঢিট করতে হলে এইরকম একটা ধাক্কা দরকার। সবক’টাকে বাদ দিক। নতুন টিম হোক। তা—হলে…।
