”না।”
”বলছি থামা।” গর্জন করে উঠল জীবন।
পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে সে হান্ডেল ধরা অনন্তর ডান হাতটায় টান দিল। টলে উঠল স্কুটারটা। বাঁ দিকে চাকার মুখটা ঘুরে গিয়েই জলে ঢাকা একটা গর্তে পড়ল। তারপরই ডান দিকে ছিটকে স্কুটারটা রাস্তায় কাত হয়ে পড়ল।
ট্রাকটার ব্রেক কষার কর্কশ আর্তনাদ অনন্ত শুনতে পেল। ফুটপাতের দিকে চিত হয়ে সে পড়েছে জলের উপর। একটা পাতা ভরা গাছ, ডালপালার ফাঁক দিয়ে অন্ধকার আকাশ সে দেখতে পাচ্ছে। মাথার মধ্যে শূন্যতা। ট্রাকের শব্দ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
অনন্ত ধড়মড় করে উঠে বসল। দূর থেকে একটা মোটর আসছে। তার হেড লাইটের আলোয় সে দেখল রাস্তার মধ্যে ওলটানো আরশোলার মতো স্কুটারটা পড়ে। এঞ্জিন বন্ধ, পেছনের চাকাটা আস্তে আস্তে থেমে যাচ্ছে আর বাঁ হাতে ভর দিয়ে জীবন রাস্তা থেকে উঠিয়ে নিজেকে বসানোর চেষ্টা করছে। দেহের বাঁ দিকটা জলের মধ্যে ডোবানো।
মোটর গাড়িটা কাছে এসে পড়েছে। হেড লাইটের আলোয় জায়গাটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
”জীবন!” আর্ত চিৎকার করে অনন্ত উঠে দাঁড়াল। জীবন মুখটা ঘুরিয়ে উপর দিকে তুলে বলল, ”অন্তু তুই বড্ড লম্বা, নিচু হ।”
অনন্ত ঝুঁকে পড়ল।
”আমার আর টেস্ট খেলা হবে না রে।”
জীবন নিজের ডান হাতের দিকে তাকাল। অনন্ত দেখল আঙুলের ডগা থেকে কব্জি পর্যন্ত মাংস, হাড় থেঁতলে চটকে লাল একটা কাগজের মতো আর তার মাঝে ঘড়ির ডায়ালটা বসানো।
”না জীবন, না। তুই টেস্ট খেলবি। আমি তোকে খেলাব।”
অনন্ত কেন যে বুকফাটা চিৎকার করে কথাটা বলল তা সে জানে না।
।। দুই।।
এই দুর্ঘটনার তিরিশ মাস পর, পনেরো নভেম্বরের আনন্দবাজার পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার দিল্লি থেকে লিখলেন এই প্রবন্ধটি :
”না, না, আর কিছু নেব না। আমাকে শুধু একটা লিমকা দিন।” অবাক হয়ে দেখলাম, এই বলে বক্তা কম্পিত হাতে গ্লাস ভর্তি থামস আপ তুলে নিলেন। নেশার ঘোরে নয়, তখন তিনি হঠাৎ পাওয়া আঘাত, টেনশন, সব মিলিয়ে প্রকৃতিস্থ—অপ্রকৃতিস্থর সীমারেখায়। ভদ্রলোকের নাম এস পাণিগ্রাহী। ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের প্রেসিডেন্ট।
”অত্যন্ত গম্ভীর, ব্যক্তিত্ববান এই ভদ্রলোককে এমন অসহায় অবস্থায় এভাবে দেখতে হবে কখনও ভাবিনি। বোর্ডসচিব হরিহরণ তাঁর সঙ্গে ছিলেন। হরিহরণ পেশায় আইনজীবী এবং শোনা যায় দুঁদে আইনজীবী। তাঁরও প্রায় এই হাল। তার আগে মিনিট—পনেরো রীতিমত নাটক হয়ে গেছে দিল্লির তাজ প্যালেস হোটেলে, সাংবাদিক সম্মেলনে।
”ঘটনাটি এইরকম, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পাঁচ টেস্ট—ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচটির প্রথম বল হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টা আগে, হঠাৎ বোর্ডের এক সদস্য ফিরোজ শাহ কোটলা মাঠে এসে নেট প্র্যাকটিস দেখায় ব্যস্ত সাংবাদিকদের জানালেন, হোটেলের চারশো দুই নম্বর ঘরে একটা প্রেস কনফারেন্স বিকেল তিনটেয় ডাকা হয়েছে। আপনারা অনুগ্রহ করে আসবেন।
”প্রথম টেস্টম্যাচ শুরুর আগে কিছু মামুলি কথাবার্তা হবে ভেবে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক যাননি। এবং যাঁরা যাননি একটা বড় অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। ঘরে ঢুকে দেখি, মাথা নিচু করে বসে রয়েছেন বোর্ড—প্রেসিডেন্ট ও সচিব। চোখের চাহনিতে বিষাদ ও অবসন্নতা।
”পাণিগ্রাহীই শুরু করলেন, ‘আপনাদের একটা খবর দেবার আছে। টেস্ট—ম্যাচের জন্য নির্বাচিত চোদ্দজন ক্রিকেটারকে যে—চুক্তিপত্র আমরা দিয়েছিলাম মাত্র চারজন (অরবিন্দ নবর, চাঁদ গৌড়া, দেশরাজ আনোখা ও মহম্মদ উসমানি) তার সব শর্ত মেনে নিয়েছে। বাকি দশজনও চুক্তিপত্রে সই করেছে, তবে তিনটি ধারা কেটে দিয়ে। এই ধারাগুলি হচ্ছে বোর্ডের বিনা অনুমতিতে পত্র—পত্রিকায় লিখতে না পারা, অন্য কোনও লোগো ব্যবহার করতে না পারা এবং যে—কোনও টুর্নামেন্টে খেলতে না পারা।”
”নামগুলি তিনি একে একে পড়লেন—মধুরকর, পিল্লাই, পুষ্করনা, ভোজানি, কাপুর, ফরজন্দ আহমেদ, গুপ্তা, ধারাদ্ধার, দুয়া এবং অধিনায়ক মকরন্দ ভার্দে। ভেঙে—পড়া গলায় বোর্ড—সচিব যোগ করলেন, ‘এরা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। আজ সকালেও প্রত্যেকে আশ্বাস দিয়ে গেছে সব শর্ত মেনে নিয়ে সই করবে। শেষ মুহূর্তে এভাবে ডোবাবে ভাবিনি।’
”ভেঙে পড়ার কারণ এতক্ষণে বোঝা গেল। কাল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রথম টেস্ট—ম্যাচ। খেলোয়াড়দের নাম ঘোষিত হয়ে গেছে। চূড়ান্ত এগারোজনকে ম্যাচ শুরুর এক ঘণ্টা আগে বেছে নেওয়া হবে। এখন এই অবস্থা। বোর্ড—প্রেসিডেন্ট সরাসরিই সাংবাদিকদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘আপনাদের কী মত? বোর্ডের কী করা উচিত?’
”জনৈক সাংবাদিক ততক্ষণে প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন। উঠে বললেন, ‘বাদ দিয়ে দিন। সবক’টাকে বাদ দিন। দেশের মাঠে খেলা, কোথায় ভাল রেজাল্ট করার চেষ্টা করবে তা নয়, কোথা দিয়ে টাকা পেটা যায় তার ধান্দা করছে।’ তার বক্তব্য সমর্থন করলেন অন্যরাও। কিন্তু বোর্ডের দুই কর্তার কিন্তু—কিন্তু ভাব গেল না। পাণিগ্রাহী বললেন, ‘কড়া ব্যবস্থা নিতে আমরাও চাই। কিন্তু বাদ দিলে প্রতিক্রিয়া কি হবে ভেবে দেখেছেন? গোটা দেশ আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাবে। আর এই মুহূর্তে তা করা সম্ভবও নয়। খুব বাজে রেজাল্ট হবে।’
”বোর্ড—কর্তাদের বোঝানোর বহু চেষ্টা হল, এই ইস্যুতে ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিলে দেশবাসীর সায় তাদের পক্ষেই থাকবে। কিন্তু পাণিগ্রাহীরা ঝুঁকি নিতে রাজি নন। তখন উত্তেজনাটা এমনই চরমে পৌঁছে যায় যে, দিল্লির এক প্রবীণ সাংবাদিক বলেই ফেললেন, ‘আসলে আপনারা মেরুদণ্ডহীন বলেই ক্রিকেটাররা এতটা বেয়াড়া হবার সাহস পায়।’
