”আমার মুখস্থ। কোথায় কোথায় গর্ত আর ঢিপি আমার জানা আছে।”
বাড়িতে জীবনের ঘরটি দোতলায় পুব—উত্তর কোণে। ঘরের একটা দেওয়াল শুধু ক্রিকেটারদের রঙিন ব্লো—আপ ছবিতে ঢাকা। মাথায় খাটো ব্যাটসম্যানদের, যেমন ব্রাডম্যান, গাওস্কর, উইকস, বিশ্বনাথ, কালীচরণ প্রভৃতির ছবিই চোখে পড়বে সবার আগে। অগোছালো ঘর। অনন্ত বহুবার থেকে গেছে রাত্রে।
আজও তাকে থেকে যেতে বলেছিল জীবন। অনন্ত রাজি হয়নি। শুধুই ছ’টা ইলিশভাজা আর তেল দিয়ে ভাত মেখে সে খেয়েছে। দু’বার সাবান দিয়ে হাত ধুয়েও ইলিশের গন্ধ হাত থেকে যায়নি। ডান হাতের তালুটা শুঁকতে—শুঁকতে অনন্ত বলল, ”আজ যা আনফিট হয়ে গেলাম কাকিমা, এখন পুরো এক হপ্তা লাগবে শরীর ঠিক করতে। সামনেই আর একটা টুর্নামেন্ট রয়েছে।”
”এই ক’টা ভাত খেয়েই শরীর বসে যায় যদি তা হলে বাপু খেলাধুলো করার দরকার নেই। তোমাদের যত রাগ এই ভাতের উপর, খেলেই নাকি আনফিট হয়ে যাবে!”
অনন্ত মিটমিটিয়ে হাসতে থাকল। আগে সে রাতে রুটি খেত, মাস ছয়েক হল দু’বেলাই রুটি খাচ্ছে। কিন্তু কাকিমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিপছিপে লম্বা ছেলেটা, তাঁর ধারণায় দুর্বল আর রুগণ শুধু পেট ভরে ভাত না খাওয়ার জন্যই। তিনি হাতা হাতা ভাত থালায় ঢালবেনই আর অনন্তও দু’হাত মাথায় তুলে, ”আনফিট হব, আনফিট হব” বলে করুণস্বরে ডাক ছাড়বে। আজও তাই হল। তবে একটা কথা অনন্ত যোগ করল, ”পার্ক স্ট্রিটের রেস্টুরেন্টের থেকে অনেক তৃপ্তি করে খেলাম, তাই না রে?”
বাদলদা’র দেওয়া ঘড়িটা ডান হাতে পরতে—পরতে জীবন বলল, ”বাঙালির কাছে মাছ—ভাতের থেকে সেরা খাদ্য পৃথিবীতে আর কিছু আছে নাকি?”
”অনন্ত রাত হয়ে গেছে আজ নাইবা গেলে।” কাকাবাবু টুথপিক দিয়ে দাঁত খুঁটতে খুঁটতে বললেন।
”মা’কে বলে আসিনি, ভাববেন।”
”এত রাতে বাস পাবে কি?”
”বিধাননগর স্টেশন থেকে ট্রেনে দমদমায় গিয়ে বাকিটা হেঁটে চলে যাব।
জীবন ঘড়িতে সময় দেখে বলল, ”চল, তোকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসি।”
গেট থেকে স্কুটার বার করার সময় জীবন বলল, ”ফাঁসির খাওয়া খেয়েছি, পেট ব্যথা করছে।”
”তা হলে তুই পেছনে বোস, আমি চালাই।”
জীবন বিনা প্রতিবাদে পিছনে বসল। স্টার্ট দিয়ে ক্লাচ ছাড়তেই ঝাঁকুনি দিয়ে স্কুটারটা এগোল। অনন্তর হাত কেঁপে টলমল করে উঠল। সে থামিয়ে দিল এঞ্জিন।
”রেগুলার চালানো অভ্যেস নেই।” অপ্রতিভ হয়ে অনন্ত বলল।
”না চালালে অভ্যেস হবে কি করে, চালা এখন। কতবার বললুম একটা কিনে ফেল।”
অনন্ত আবার স্টার্ট দিয়ে সন্তর্পণে ক্লাচ ছাড়ল। মসৃণভাবে স্কুটার যাত্রা শুরু করল।
”মা রাজি নন। টু হুইলারে মা’র ভীষণ ভয়। কলকাতায় রাস্তার যা দশা, এসব গাড়ি চালান উচিত নয়।”
”অত ভয় করলে তুই কোনওদিনই ফাস্ট বোলার হতে পারবি না। আমিও কোনও দিন ফাস্ট বোলিং ফেস করতে পারব না।”
অনন্ত জবাব না দিয়ে রাস্তার দিকে চোখ ও মন নিবদ্ধ রাখল। বৃষ্টির জল রাস্তা থেকে এখনোও সরেনি। ফুটপাথ থেকে মাঝ—বরাবর রাস্তা জলে ডুবে। শুধু মাঝখানটায় কালো শিরদাঁড়ার মতো রাস্তার পিঠটুকু জেগে রয়েছে। অনন্ত মন্থর গতিতে মাঝখান দিয়ে স্কুটার নিয়ে চলল। রাস্তার আলোয় তেজ নেই। দোকানপাট বন্ধ, অন্ধকার লাগছে দু’ধারটা। অন্যান্য গাড়ির হেডলাইটের আলোয় মাঝে—মাঝে রাস্তা আলোকিত হচ্ছে। সামনে থেকে আসা গাড়ির আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। তখন সে বাঁ ধারে সরিয়ে নেয় স্কুটার। দ্রুত ধাবমান গাড়ি পেছনে এসে হর্ন বাজিয়ে পথ ছাড়তে বলে। অনন্ত তাড়াতাড়ি ফুটপাথের দিকে সরে আসে।
”জোরে চালা, জোরে চালা। পথ ছাড়ছিস কেন?” জীবন একটু অধৈর্য হয়ে বলে ওঠে। অনন্ত তাই শুনে স্পিড বাড়াল।
জীবনের এই স্কুটারটা নিয়েই সে চালানো শিখেছে। যখনই সে রাতে থেকেছে ভোরবেলা এই অঞ্চলের নির্জন রাস্তাগুলোয় জীবন তাকে স্কুটার চালানোর তালিম দিয়েছে। অজস্র ফ্ল্যাটবাড়ি। পড়তে মজা লাগত। বিবেকানন্দ, সুরেন্দ্রনাথ, ঈশ্বরচন্দ্র, বিধানচন্দ্র। কলকাতার এই পুব দিকটায়। কো—অপারেটিভ প্রথায় মালিকানা ভিত্তিতে তৈরি আবাসনগুলোর নাম পূর্বাশা, উদীচী, আইডিয়াল, এলিট। নাম থেকেই কিছুটা বোঝা যায় বাসিন্দাদের রুচি আর মানসিকতা। একটা রাস্তার নাম বিধান শিশু সরণি। হাসি পেয়ে গেছল তার। জীবন বলেছিল, ”বোধহয় এখানে শিশুরা বাস করে বলেই এই নাম।” একটা চারতলা আবাসনের নাম স্কাইলাইন দেখে জীবন মন্তব্য করেছিল, ”আমার মত হাইট তারই এই নাম তা হলে কুড়ি তলা বাড়ির কী নাম হবে?” অনন্ত বলেছিল, ”হেভেন লাইন”।
পেছন থেকে একটা বিরাট ট্রাক আসছে কান—ফাটানো এয়ার হর্ন বাজিয়ে।
”পথ ছাড়বি না, সরবি না” পিঠের কাছে রাগী গলায় জীবনের নির্দেশ।
”বড় গাড়িকে সবসময় পথ ছেড়ে দেওয়াই নিয়ম।”
”রাখ তোর নিয়ম। আমাদের গাড়িটা কি গাড়ি নয়, ফ্যালনা?”
ট্রাকটা প্রায় ধাক্কা দেবার মতো দূরত্বে এসে গেছে। জীবনের পিঠের থেকে হাত—তিনেক পেছনে। ড্রাইভারের পাশে খালাসিটা মুখ বার করে চিৎকার করছে।
স্কুটারের দুই আরোহীকে ধুইয়ে দিচ্ছে দুটো হেডলাইটের আলো।
কী একটা গালাগাল দিল খালাসিটা। জীবন চেঁচিয়ে উঠল। ”থামা তো, থামা। ব্যাটাকে টেনে নামিয়ে পেটাব। অন্তু থামা।”
