উজ্জ্বল মুখে বাদল দে থুতনি তুলে চারপাশে তাকাল। এই বারই প্রথম ক্রিকেট সেক্রেটারি হয়ে একটা ট্রফি জেতা মানে সে লাকি সেক্রেটারি। সবার চোখ তাকে বাহবা দিচ্ছে। একজন বলেই ফেলল, ”ইনসেনটিভ না দিলে ছেলেরা খেলবে কেন? নেক্সট রয়েছে পি সেন ট্রফির খেলা। যার পারফরম্যান্সে ট্রফি জিতব তাকে আমি একটা সোনার আংটি দোব।”
প্রশংসার মৃদুগুঞ্জন উঠল।
জীবন তার দুটো হাত তুলল। দু’হাতেই ঘড়ি। ”কী মুশকিলে পড়লাম। কোন হাতেরটায় সময় দেখব গায়কোয়াড়দা?
অনন্ত চাপা গলায় বলল, ”গাওস্করকে জিজ্ঞেস করে নিস।”
”তার সঙ্গে আমার দেখা হবার কোনও আশাই নেই। যখন আমি বেঙ্গল টিমে চান্স পাব, ততদিনে গাওস্কর ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট থেকে রিটায়ার করে যাবে।”
”কে বলল বেঙ্গল টিমে ঢুকতে তোর দেরি হবে? সামনের সিজনেই আসছিস, লিখে রাখ। দু’ সিজনে উনিশটা সেঞ্চুরি, এখন কার আছে?” বাদল দে হঠাৎ চিৎকার করে তাঁবুটাকে নীরব করে দিল। অনন্ত একটা সফট ড্রিঙ্কসের বোতল নিয়ে চুপিচুপি তাঁবুর বাইরের চাতালে এসে দাঁড়াল।
ঘন মেঘে আকাশ ছেয়ে আছে। স্যাঁতসেঁতে ভাব রয়েছে বাতাসে। সন্ধ্যা এরই মধ্যে কোন এক ফাঁকে নেমে আসবে। বৃষ্টির জলে ধুলো ধুয়ে গিয়ে গাছের পাতা সবুজে গাঢ় হয়ে উঠেছে। দূরে রাস্তায় অল্পস্বল্প জল জমে। মা এতক্ষণে কলেজ থেকে বাড়ি পৌঁছে গেছে। সকালে বেরোবার সময় অনন্ত যখন প্রণাম করে, মা বাধা দিয়ে বলেছিলেন, ”আগে ওনাকে কর।” বসার আর খাবারের জন্য ছোট দালানটার দেওয়ালে বাবার রঙিন ছবি। বেলফুলের বাসী একটা মালা তাতে ঝুলছে। চারদিন আগে বাবার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ছিল।
ছবিতে কপাল ঠেকিয়ে অনন্ত যা বলেছিল, সেটাই এখন তার মনে পড়ছে। ”আমি তোমার সব কথা মনে রেখেছি বাবা। আমি পরিশ্রম করব, অপেক্ষা করব।” তারপর মুখ ফিরিয়ে মা’র দিকে তাকিয়ে সে দ্যাখে, বাবার ছবির দিকে মা নির্নিমেষে তাকিয়ে, একটা সুন্দর হাসি চোখ দুটি থেকে ঝরে পড়ছে। সে মাকে প্রণাম করল।
”অন্তু, খেলায় হারজিত আছে। যাই হোক না কেন, তোর বাবা যা বলতেন সেটাই বলব, চেষ্টা করবি, হাল ছাড়বি না।”
অনন্ত আজ হাল ছাড়েনি। শুধু চেষ্টা নয় কিছুটা ভাগ্যও দরকার হয়। তার বলে দুটো ক্যাচ পড়েছে, সাত—আটবার ব্যাটসম্যানরা হেরে গেছে, তার পেসের কাছে কিন্তু স্টাম্পে বল লাগেনি। এজন্য সে নিজের উপরই রেগে উঠেছিল। প্রত্যেক ফাস্ট বোলারের মতো তারও ইচ্ছে করে স্টাম্প উড়ে যাওয়া দেখতে। কেন সে স্ট্যাম্পে বল লাগাতে পারছে না? তখন বাবার গলার স্বর যেন সে শুনতে পেয়েছিল, ”অন্তু তুমি পরিশ্রম করোনি। ফাস্ট বোলার হতে হলে অসম্ভব খাটতে হয়। লেংথ, আর ডিরেকশন নিয়ে কাজে অবহেলা করে তুমি শুধু পেসের উপরই জোর দিচ্ছ। ভুল করছ।”
হঠাৎ পিঠে একটা থাপ্পড় পড়ায় অনন্ত চমকে উঠল।
”একদৃষ্টে আকাশে তাকিয়ে কী করছিস, ধ্যান?”
জীবন উচ্ছ্বাসে আপ্লুত হয়ে রয়েছে। তার হাতে সন্দেশের বাক্স। এগিয়ে ধরল। অনন্ত একটা তুলে নিল।
”বাদলদাকে সবাই ধরেছে পার্ক স্ট্রিটে ডিনার খাওয়াতে হবে। যাবি?”
”হোটেল—রেস্টুরেন্টে খেতে আমার ভাল লাগে না।”
”আমারও। কাঁটা—চামচ—ফামচ দিয়ে খাওয়া, মনে হয় যেন পেট ভরল না। বাবাকে সকালে মানিকতলা বাজার থেকে একটা কেজি দেড়েকের ইলিশ নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে দেখেছি, চল আমাদের বাড়ি।”
”এখন বোশেখ মাসে ইলিশ!”
”বাংলাদেশী, দুর্দান্ত টেস্ট।”
ইলিশের নামে অনন্তর জিভ আনচান করে উঠল। সে গলা নামিয়ে বলল, ”স্কুটারটা বার করে স্টার্ট দে, রেস্টুরেন্টে খেতে না গিয়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি দেখলে আটকে দেবে। চটপট কেটে পড়তে হবে।”
দু’জনে কেটেই পড়ল।
.
জীবনরা অবস্থাপন্ন। বাবার ইলেকট্রনিক্সের যন্ত্রাংশ তৈরির ব্যবসা। একবছর আগে কাঁকুড়গাছির নতুন বাড়িতে ওরা উঠে এসেছে। বাবা, মা আর দুটি ছেলে নিয়ে এই পরিবারটির সবাই তাদের উচ্চতার মতোই ছোট। পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির উপর কেউ নেই। অনন্ত প্রথম দিনে নিজেকে নিয়ে অস্বস্তি বোধ করেছিল। জীবনের বাবা দেবেনবাবু আমুদে প্রকৃতির মানুষ। অনন্তর মনের অবস্থাটা বুঝে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ”এ যে দেখছি গালিভার! লিলিপুটদের বাড়িতে এসে মুশকিলে পড়ে গেলে তো? ঠিক আছে, তোমার বসার জন্য একটা নিচু টুল কিনে রাখব আর আমাদের জন্য রণ—পা।” অনন্তর ভাল লেগে গেছল সবাইকেই। তারপর বহুবারই সে এসেছে গত দেড় বছরে। পিতৃহীন বলে অনন্তকে ওঁরা আলাদা স্নেহ যত্ন করেন, নিজেদের ছেলের মতো।
স্কুটারে আসার সময় অনন্ত বলল, ”তুই যখন ‘ইয়াহু’ বলে চিৎকার করে বৃষ্টিতে ভেজার জন্য ইডেনে নেমে গেলি তখন হঠাৎই প্রথম দিনের কথাটা মনে পড়ে গেছল, এ যে দেখছি গালিভার!”
জীবন মুখ ঘুরিয়ে বলল, ”কেন মনে পড়ল?”
”সুইফট তাঁর গালিভারস ট্র্যাভেলসে একটা কাল্পনিক জাতির নাম দিয়েছেন ইয়াহু।” অনন্ত ঝুঁকে জীবনের কানের কাছে মুখ রেখে বলল।
”তুই খুব বই পড়িস?”
”মাঝে—মাঝে পড়ি।”
”আমার পড়তে ভাল লাগে না।” বলেই গিয়ার বদলে জীবন স্কুটারের গতি বাড়াল।
”তুই স্পিড খুব ভালবাসিস।” অনন্ত বলল।
জীবন মাথাটা দোলাল শুধু।
”আজ স্পিড তুলিস না। বৃষ্টিতে রাস্তাটা ভাল নয়, বড্ড গর্ত রয়েছে।”
