জীবন এখন ক্লাব হাউস থেকে মাঠ আর বিশাল স্ট্যান্ডের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে হাসল। উপরের ওই লোকটাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে আকাশের দিকে মুখ তুলল। ঘন মেঘ দ্রুত ধেয়ে আসছে, চারদিকে অন্ধকারের ছায়া ঘিরে ধরছে। গাছের মাথা পাগলের মতো দুলছে। পাখিরা ডানা ঝাপটাতে—ঝাপটাতে হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে। জীবনের বুকটা কেঁপে উঠল অজানা ভয়ে। ঈশ্বর কি এভাবেই দেখা দেন? বুকের কাছে দু’হাত জড়ো করে নমস্কারের ভঙ্গিতে সে দাঁড়িয়ে রইল।
”কী রে, কতবার ডাকলুম—ম্যাচ জিতিয়েছিস বলে কি প্রশংসা ছাড়া আর কিছু কানে ঢোকাবি না? এতক্ষণ ধরে তো পিঠ—চাপড়ানি খেলি, যা, এবার পিঠটা ঠাণ্ডা করে আয়।”
”আচ্ছা, অন্তু তুই ঈশ্বর—বিশ্বাসী না?”
”বাবা বলতেন, কোথাও একটা বিশ্বাস রাখবে। সেটা নোঙরের মতো কাজ করবে, তোমাকে ভেসে যেতে দেবে না। বিশ্বাসটা ঈশ্বরে রাখতে পারো, জন্মভূমিতে রাখতে পারো, দেশের মানুষের উপর রাখতে পারো, বন্ধুত্বের উপরও রাখতে পার।”
”তুই কোনটাতে রাখিস?”
”সব ক’টাতেই।”
শব্দ করে বৃষ্টির বড়—বড় ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। এলোমেলো হাওয়ার ঝাপটায় জলকণা এসে লাগছে ওদের অনাবৃত দেহে। জীবন জ্বলজ্বল চোখে দু’হাত বাড়িয়ে হঠাৎ ”ইয়াহুউউ” বলে চিৎকার করে উঠে ছুটল সিঁড়ির দিকে। লোহার দরজাটা দড়াম করে খুলে দোতলা থেকে মাঠে নামার সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে ছুটতে—ছুটতে মাঠের ঘাসের উপর গিয়ে দাঁড়াল। তারপর মুখ তুলে অনন্তর দিকে তাকিয়ে সে দু’হাত মাথার উপর তুলল।
”অন্তু, আমি টেস্ট খেলব,” চিৎকার করে জীবন আবার বলল, ”শুনতে পাচ্ছিস অন্তু, আমি টেস্ট খেলব। ঈশ্বর খবর পাঠিয়েছেন, আমি টেস্ট খেলব।”
অঝোর বৃষ্টির শব্দ ছাড়া অনন্ত শুনতে পাচ্ছে না আর কিছু। উদ্বিগ্নস্বরে সে চেঁচিয়ে বলল, ”ভিজিস না। নিউমোনিয়া হবে।”
ফাঁকা ইডেন মাঠে ঝাপসা দেখাচ্ছে জীবনকে। সে মাঠে গড়াগড়ি দিচ্ছে পুলকে, আনন্দে।
”জীবনের হল কী! পাগল—টাগল হয়ে যাবে নাকি?”
মোহন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
অনন্ত মাথা নেড়ে বলল, ”দেখো মোহনদা, জীবন একদিন টেস্ট খেলবেই।”
”আর তুমি?”
হেসে মাথা নাড়ল অনন্ত এমনভাবে যার অর্থ বোঝা শক্ত।
”জীবনের স্কুটারটা নীচে রয়েছে। এতক্ষণে ভিজে সেটার যে কী অবস্থা হল কে জানে। আমি নীচে যাচ্ছি, ওটাকে সরিয়ে কোথাও ঢাকা জায়গায় রাখতে হবে।”
একতলায় যাবার জন্য সিঁড়ির দিকে এগিয়েও অনন্ত একবার ঘুরে তাকাল। ঝাপসা বৃষ্টির মধ্যে দেখতে পেল পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির, অর্থাৎ তার থেকে ঠিক এক ফুট খাটো মাথার জীবন চিত হয়ে আকাশের দিকে মুখ করে দু’ হাত ছড়িয়ে শুয়ে। নিথর একটা মৃতদেহের মতো। তার বুকের মধ্যে পলকের জন্য ধক করে উঠল।
আধঘণ্টা পর বৃষ্টি থামতে বান্ধব সমিতির তাঁবুর দিকে ওরা রওনা হল। বৃষ্টিতে ভিজলেও স্কুটারের এঞ্জিন গোলমাল করেনি। সি এ বি ক্লাব হাউস থেকে তাঁবু তিন মিনিটের পথ। জীবন আকাশবাণীর সামনের গোলাকার ভূখণ্ডটি খুব জোরের উপর কাত হয়ে ঘুরল। পিছনে বসা অনন্ত তার কাঁধটা খামচে ধরে বলল, ”অত স্পিডের ওপর টার্ন করাসনি, বৃষ্টিতে রাস্তা পেছল হয়ে আছে।”
জীবন জবাব দিল না, স্পিডও কমল না। অনন্ত আর কিছু বলল না। জীবন এভাবেই চলে সর্ব ব্যাপারেই। সেটা ওর ব্যাটিংয়ের মধ্যেও ফুটে ওঠে। ঝুঁকি নিয়ে অদ্ভুত সব শট নেয় যা বিশুদ্ধবাদীদের ভ্রূ তুলে দেয়। তারা হতাশায় মাথা নাড়ে আর বলে, এভাবে খেললে বেশিদূর এগোতে পারবে না, টেস্ট লেভেলে যেতে পারবে না।” অথচ জীবন ঝুড়ি—ঝুড়ি রান পায়, সেঞ্চুরি পায়!
অনন্তও একবার বলেছিল, ”শুনছিস তো তোর সম্পর্কে কী বলা হচ্ছে? তোর বিগম্যাচ টেম্পারামেন্ট নেই।” জীবন অবাক হবার ভান করে বলেছিল, ”বিগ ম্যাচটা খেললাম কোথায় যে আমার টেম্পারামেন্ট মাপা হয়ে গেল! ব্যাটসম্যানের কাজটা কি মাঠে নেমে টেম্পারামেন্ট দেখানো না রান তোলার কাজ করা? ব্যাটিংটাকে আমি সহজ—সরলভাবে বুঝি মারার বল পেলেই মারো। যেটা মারতে পারবে না সেটা ছেড়ে দাও বা আটকাও। টেম্পারামেন্টওয়ালারা এই শেষের কাজ দুটোয় খুব ভাল, প্রথমটায় কুঁকড়ে থাকে। ফলে জেতার ম্যাচ হারি।”
”আর হারার ম্যাচ বাঁচায়।”
”আমি হারার বা ড্র করার চিন্তা নিয়ে খেলার মাঠে আসি না।”
আজ জীবনই ম্যাচটা জিতিয়েছে। সাতষট্টি বলে সেঞ্চুরিই শুধু নয়, সমিতির ইনিংস একসময় সাত উইকেটে ছিল একান্ন। সেখান থেকে একশো বাহাত্তরে টেনে নিয়ে গেছে জীবন।
তাঁবুতে তখন হই—হুল্লোড় ঝিমিয়ে এসেছে। ওদের দুজনকে দেখে আবার সেটা জেগে উঠল। অনন্ত একত্রিশ রানে একটি উইকেট পেয়েছে, একটি রান আউট হয়েছে মিড উইকেট থেকে তার ছোঁড়া বলে। তার পিঠে একটা—দুটো আলতো চাপড় ছাড়া আর কিছুই জুটল না। সেজন্য অনন্ত কিছু মনে করল না। আজ সবাইকে ছাপিয়ে একজনই নায়ক। ক্রিকেট সেক্রেটারি বাদল দে তার দামি ঘড়িটা হাত থেকে খুলে জীবনের ডান হাতে পরিয়ে দিল।
”এ কী এ কী, আ রে বাদলদা, আমার যে হাতে ঘড়ি রয়েছে। আর একটা দিয়ে কী করব?”
”দু’হাতে দুটো পরবি। পাকিস্তানে গাওস্কর একটা টেস্টে দুটো সেঞ্চুরি করায় ম্যানেজার গায়কোয়াড় তাঁর ঘড়িটা উপহার দিয়েছিলেন। আমিও তোকে দিলুম।”
