”পারি।”
”কী হবে?”
”শেষ বলে বান্ধব সমিতির নাটকীয় জয়।”
”বাজে হেডিং।”
”তা হলে, সি এ বি নকআউটের রুদ্ধশ্বাস সমাপ্তি।”
”আরও বাজে।”
”তা হলে….”
জীবন খোলা বুটজোড়া পাশে সরিয়ে রেখে পা দুটো টানটান করে ছড়িয়ে অনন্তর মুখের দিকে তাকাল। ঘামে—ভেজা জামাটা খোলার জন্য অনন্ত মাথা হেলিয়ে টেনে বার করতে কুঁজো হয়েছে, সেই অবস্থাতেই বলল, ”আজকাল সাহিত্য করে খেলার হেডিং হয়।” তারপর হাত থেকে জামা ছাড়াতে বলল, ”জীবনের ছক্কায় বান্ধবের জীবন লাভ, কিংবা জীবনের হাতে অগ্রগামীর জীবনান্ত।”
”এর থেকে বাজে আর কিছু হতে পারে না।” জীবন জোড়া—পা সামনের খালি চেয়ারে তুলে দিল। ”এরকম নাম বাচ্চচাদের অ্যাডভেঞ্চার গল্পের হয়।”
”চানটা করে আসি তারপর হেডিং বলব।” অনন্ত কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে প্যান্ট খুলতে লাগল।
”আরে দাঁড়া, দাঁড়া, আমি আগে। যা গরম পড়েছে। মে মাসের দুপুরে ক্রিকেট খেলা? অন্তু প্লিজ, আমি চান করে এলে তুই যাস।”
জীবন লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। ছ’ ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা, আটষট্টি কিলোগ্রাম ওজনের দেহটা যেন ছাড়া পাওয়া স্প্রিংয়ের মতো টান হয়ে উঠল। স্নানের ঘরের দিকে সে পা বাড়াবার আগেই অনন্ত ছুটে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ভিতর থেকে চেঁচিয়ে বলল, ”হেডিং কী হবে জানিস? জীবন রঞ্জি দলে আসার দাবি রাখল।”
”সিজন শেষ হয়ে গেল আর এখন দাবি রাখা!”
”সামনের সিজনে এই পারফরম্যান্স কাউন্ট করবে বেঙ্গল টিম সিলেকশনের সময়।” ভিতরে শাওয়ার থেকে জল পড়ার শব্দ ছাপিয়ে অনন্তর গলা ড্রেসিংরুমে পৌঁছল।
জীবনের মুখে হালকা হাসি আর বেদনা একই সঙ্গে ভেসে উঠল। বারো বছর বয়স থেকে টেস্ট ম্যাচ খেলার স্বপ্ন সে দেখছে। গত বছর আটটা আর এ—বছর এগারোটা সেঞ্চুরি করেছে স্থানীয় ক্রিকেট—ম্যাচে। কিন্তু এখনও সে বাংলার হয়ে প্রথম শ্রেণীর একটা ম্যাচও খেলার সুযোগ পায়নি। জাতীয় নির্বাচকরা তার খেলা না দেখলে তাঁদের বিবেচনায় সে আসবে কী করে?
খেলা শেষ হতেই সি এ বি—র ক্লাব হাউসে বান্ধব সমিতির ড্রেসিংরুমে প্রায় একঘণ্টা ধরে তুমুল উচ্ছ্বাস চলেছিল। এখন নির্জন। একে একে সবাই বান্ধব সমিতির তাঁবুতে চলে গেছে। আনন্দ করার জন্য যা কিছু—ভূরিভোজ, পটকা ফাটানো, মালা পরানো, উপহারের প্রতিশ্রুতি, পতাকা তোলা—এখন ক্লাবেই হবে।
ঘরে এখন ক্লাবের মালি মোহন। খেলার সরঞ্জামগুলো গুছিয়ে লম্বা ব্যাগে ভরায় ব্যস্ত। কয়েকদিন পরই তাদের পি. সেন ট্রফির খেলা। খেলার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রগুলো কেউ আর আজ বাড়ি নিয়ে যাবে না। জীবন জানলায় এসে দাঁড়িয়ে আকাশে তাকিয়েই ভ্রূ কোঁচকাল।
”মোহনদা, আকাশের অবস্থা দেখেছ?”
”কালবোশেখি আসছে।”
পশ্চিমে গঙ্গার ওপারে কালো মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে। চিলের মতো তিন—চারটে পাখি শাঁ—শাঁ করে নীচের দিকে নেমে আসছে। বাতাস থমথমে। মেঘ যেন পুবের দিকেই এগিয়ে আসছে। গত তিন—চার দিন গুমোট ভ্যাপসা ছিল। কলকাতার মানুষ বারবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনা করেছে। ট্রামে, বাসে, ট্রেনে সুযোগ পেলেই প্রতি বছর সকলে তাই বলেছে, এরকম গরম আর কখনও পড়েনি। অবশেষে বৃষ্টির কালো ঝাণ্ডা উঠেছে আকাশে। কালবোশেখির কুচকাওয়াজ এগিয়ে আসছে। জীবন ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে প্রেসিডেন্টস এনক্লোজারে এসে দাঁড়ানোমাত্র ঠাণ্ডা হাওয়ার প্রথম ঝলকটা মুখে লাগল।
”আহহ।” আপনা থেকেই তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল স্বস্তির শব্দ। আজ শেষ বলে ছয় মেরে সে এক উইকেটে তার ক্লাব বান্ধব সমিতিকে জিতিয়ে দেবার সময় ঠিক এইরকমই একটা আওয়াজ তার মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়েছিল। সেটা ছিল প্রচণ্ড টেনশন থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বস্তি। তার আগের ওভারেই সে সেঞ্চুরিটা পূর্ণ করেছিল।
আজ গরম কত ডিগ্রি হবে মনে হয়? জীবন চোখ বন্ধ করে মুখটা ঠাণ্ডা বাতাসের স্রোতে রেখে আন্দাজ করার চেষ্টা করল। কাল ছিল ঊনচল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বাবা বলেছিলেন, ‘এভাবে খেলার কোনও মানে হয় না। কেউই তার সেরা জিনিস বার করে আনতে পারবে না এ অসহনীয় অবস্থায়। তা ছাড়া শরীরেরও ক্ষতি করবে। রঞ্জি ট্রফির নকআউট পর্যায়ের আগে এইসব খেলা হলে তবু তার মূল্য থাকে, এইসব খেলায় কেউ ভাল পারফরম্যান্স দেখিয়ে টিমে আসতে পারে। কিন্তু বাংলা তো কোয়ার্টার ফাইনালেই আউট হয়ে গেছে, তা হলে এখন এই ঝাঁ—ঝাঁ গরমে টুর্নামেন্ট খেলে লাভ কী? তবু রক্ষে জে.সি. মুখার্জি ট্রফিতে সেমিফাইনালে হেরে বেঁচে গেছিস, ফাইনালটা খেলতে হবে না।’ জীবন তখন মৃদুস্বরে বাবাকে বলে, ‘সেমি—ফাইনালে অগ্রগামীর কাছেই সাত উইকেটে হারের বদলাটা নেওয়া দরকার। আমাকে যে রান—আউটটা দেয়, সেটা যে…’ সে থেমে গেছল। থেমে যাওয়ার কারণ, অন্তুর একটা কথা মনে পড়ায়। রান—আউট হয়ে ফিরে গিয়েই ব্যাটটা ছুঁড়ে ফেলে সে চেঁচিয়ে উঠেছিল, ”জোচ্চচুরি, জোচ্চচুরি, ক্রিজের ছ’ ইঞ্চি ভেতরে ব্যাট ফেলার তিন—চার সেকেন্ড পর বলটা উইকেটে লাগল।” তখন অন্তু দুটো হাত তার দু’ কাঁধে রেখে বলেছিল, ‘আউট হয়ে কখনও অভিযোগ করিসনি। মাথার উপর ঈশ্বর আছেন। আম্পায়ার ভুল করতেই পারেন। তিনি তো মানুষ। উপরের ওই লোকটা মানুষের ভুল শুধরে দেন। ক’দিন পরে এদের সঙ্গেই তো নকআউট ফাইনাল। উনি যদি তোর দুঃখের কারণটা বুঝে থাকেন তা হলে তোকে দেখবেন। কিন্তু কখনও আর কমপ্লেন করিসনি। তা হলে টেস্ট খেলার মতো লেভেলে যেতে পারবি না।’
