”মনে আছে কি ওয়ার্ল্ড কাপে ব্র্যাঙ্কোর ফ্রিকিকটা, যাতে ব্রাজিল হারিয়েছিল হল্যান্ডকে?” অনিরুদ্ধ ধীরভাবে বলল। ”এবার পেরাকটিস করা সেই কিকটা দেখবে।”
”হুমম।” অশোক ভদ্র মাঠ থেকে চোখ সরাল না। কুড়োন কিক নিতে যাচ্ছে।
পাঁচ সেকেন্ড পর বলটা উড়ল। পাঁচিলের পঞ্চমজন হঠাৎ বসে পড়ায় যে ফাঁকা জায়গাটা তৈরি হল সেখান দিয়ে উড়ে গিয়ে বলটা অপ্রত্যাশিত বাতাসে বাঁক নিয়ে গোলকিপারের অবাক চোখের সামনে দিয়ে প্রজাপতির মতো উড়ে গেল, গোলের পেছনের জাল বলটাকে ধরবে বলে যেন অপেক্ষা করছিল। অনিরুদ্ধ মাথা নামিয়ে কপালটা টেবলে দু—তিনবার ঠুকল।
এস.ডি.ও হাতঘড়িটা খুলে টেবলে রেখে বললেন, ”এটা আজ ওকে আমি দেব।”
নির্মল ঘোষ পড়িমরি সিঁড়ি ভেঙে ডায়াসে উঠে অনিরুদ্ধকে জড়িয়ে ধরে বলে যেতে লাগলেন, ”তোমার জন্য আমরা জিতব, তুমিই ওকে নামাতে বলেছিলে।”
অশোক ভদ্র শুধু তাকিয়ে রইল অনিরুদ্ধর মুখের দিকে।
মাঠের মধ্য থেকে উন্মত্ত দর্শকদের বার করে দেওয়ার দু’মিনিট পরই রেফারি খেলা—শেষের বাঁশি বাজালেন। এর পর জনতা মাঠে নামল, অনিরুদ্ধ আর কুড়োনকে দেখতে পেল না।
”ছেলেটা এখানে এল কী করে?” অশোক ভদ্র প্রশ্ন করল।
অনিরুদ্ধ বলল, ”আমার সঙ্গে এসেছে। আমাদের ওখানেই থাকে।”
”ওর বাড়িতে কে কে আছে?”
”কেউ নেই, ও একা।”
”তার মানে!”
”বাবা—মা মরে গেছে, ছিল এক দাদামশাই, সেও মরে গেছে। আক্ষরিক অর্থেই কুড়োন একা। ওর অবলম্বন, আশ্রয় যাই বলো সেটা হল ফুটবল।”
”ভালই হল, ওকে আমি সাই—তে নেব।”
.
মোটরে কলকাতা ফেরার সময় অনিরুদ্ধ চুপ করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল মিনিট দশেক। অলু আর কুড়োন নাগাড়ে বকবক করে যাচ্ছে, কখনও হাসতে হাসতে ওরা নুয়ে পড়ছে। ওদের কোনও কথা তার মাথায় ঢুকছে না। শুধু তার কানে বাজছে অশোক ভদ্রর কথাটা : ”ওকে আমি সাই—তে নেব।” একটা হিরে সে প্রায় কুড়িয়েই পেয়েছিল, অনুজ্জ্বল সাধারণ একটা কাচের ঢেলার মতো, সেটাকে সে যথাসাধ্য পরিষ্কার করে সবে কাটতে শুরু করেছে আর তাইতেই যে আলো ঠিকরে বেরিয়েছে, জহুরি তার বাহার দেখতে পেয়েছে। আরও কেটেকুটে পালিশ করে নিলে ভবিষ্যতে সেই আলো ঝকঝক করে উঠে চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। এই হিরেটাকে সে কি হাতছাড়া করবে? পৃথিবীতে কত বড় বড় ফুটবলার এসেছে, তাদের প্রথম আবিষ্কারকের নাম কে মনে রেখেছে? কুড়োন মণ্ডল ভারতবিখ্যাত হওয়ার পর সবাই বলবে ও সাই—এর আবিষ্কার। কেউ জানবে না ওকে খেলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সে কীভাবে চেষ্টা করেছে। কাঁটা বেঁধার মতো একটা খচখচানি সে বুকে অনুভব করল।
”আচ্ছা মামা, এই ঘড়িটার দাম কত?”
কুড়োন হাতের মুঠোয় এস.ডি.ও—র দেওয়া ঘড়িটা ধরে রয়েছে।
তুমুল হাততালির মধ্যে ওর হাতে পরিয়ে দিতেই ঘড়িটা কব্জি থেকে নেমে পড়ে যাচ্ছিল, কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল অলু, ঘড়িটা তার হাতে দেয় রাখার জন্য।
”অলু কয় দুই—তিন হাজার টাকা, সত্যি?”
”হতে পারে।” অনিরুদ্ধ আবার বাইরে তাকাল।
”এত দামি ঘড়ি নিয়া আমি কী করব। এটা আপনি নেন।”
অনিরুদ্ধ জবাব দিল না। একটু পরে তার হাতে কঠিন একটা ছোঁয়া পেতেই মুখ ঘুরিয়ে দেখল কুড়োন ঘড়িটা তার হাতে ঠেকিয়ে রয়েছে।
”আমি নেব কেন, তুই খেলে পেয়েছিস, এটা তোর জিনিস।”
”না, এটা আপনার। আপনিই তো শট মারা শিখাইছেন, নয়তো গোলটা দিতা পারতাম কি? আমি তো শুধু পেরাকটিস করা গেছি।”
”আচ্ছা কুড়োন,” অনিরুদ্ধর মুখে উৎকণ্ঠা ফুটে উঠল, ”আচ্ছা কুড়োন, দশ বছর পর তোর এসব কথা মনে থাকবে? কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবি তো আমি তোকে শট মারা শিখিয়েছি!”
কুড়োনের ঠোঁটে দেখা দিল ক্ষীণ একটা হাসি, চোখে হালকা অভিমান, ”কী যে কন। দশ বছর কেন, মরণকাল পর্যন্ত বলব কুড়োনরে খেলা শিখাইছে তার মামা।”
”তা হলে দে।” অনিরুদ্ধ কুড়োনের হাত থেকে ঘড়িটা তুলে নিল। ”মামা গুরুজন তার কথা অমান্য করতে নেই।” কুড়োনের শীর্ণ হাতটা টেনে নিয়ে সে ঘড়িটা ওর হাত গলিয়ে ব্যান্ডটা এঁটে দিল। ”তোর মামা এটা তোকে দিল, এটা রেখে দিলে জানব আমাকে তুই মনে করে রাখবি।”
অনিরুদ্ধ এর পর অবাক হয়ে দেখল কুড়োনের চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। আশ্চর্য, কুড়োন কাঁদতেও পারে! তার মনে পড়ল অনেকদিন আগে সে জিজ্ঞেস করেছিল, তুই কখনও কেঁদেছিস? জবাব দিয়েছিল, কেঁদেছি বলে তো মনে পড়ে না। বাবা, মা, দাদু, মারা যেতেও কাঁদেনি, বয়স এত কম ছিল যে মরা কী জিনিস তাই বোঝেনি। বলেছিল ‘কান্না আসবে কী করে?’ তখন সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এখন বুঝিস?’ তাইতে কুড়োন উত্তর দেয়, ‘না। এখন তো কেউ মরে নাই, মরলে বুঝতে পারব।’
অনিরুদ্ধ চমকে উঠল, কে এখন মরল যে কুড়োনের চোখে জল এল? ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে—থাকতে তার মনে হল কুড়োন বড় হয়ে উঠছে, ওর অতীত মরে যাচ্ছে, অনিশ্চিত ভাবটা আর মুখে নেই, তার বদলে ফুটে উঠেছে প্রত্যয়, আত্মবিশ্বাস। কুড়োনকে এবার বাইরের জগতে ঠেলে দেওয়ার সময় এসেছে।
হাওড়া ময়দানের পাশ দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। অলুর হাতে ঘড়িটা পরিয়ে দিয়ে কুড়োন বলল, ”আমার কাছে রাখার জায়গা নাই, এখন এটা তোর কাছে থাক। মাসিমারে দিস, তুলে রাখবে।”
অনিরুদ্ধ বলল, ”অশোকের সঙ্গে কথা হয়েছে, পরশু সকালে তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব, তৈরি থাকিস।”
জীবন অনন্ত
জীবন অনন্ত – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
।। এক ।।
”কাল খবরের কাগজে কী হেডিং বলতে পারিস?”
