অনিরুদ্ধকে সামনে এসে দাঁড়াতে দেখে কুড়োন অভিমানী গলায় বলল, ”মামা, সকলরে সফট ড্রিঙ্কস দেছে আমাদের দেয় নাই।”
”কুড়োন।” অনিরুদ্ধ কঠিন গম্ভীর স্বরে বলল, ”আমি যা বলব এখন একটিও কথা না বলে তুই তাই করবি। জামা খোল। এরা যে জার্সি দিচ্ছে সেটা পর, পরে মাঠে নাম।”
কুড়োন হকচকিয়ে তাকিয়ে রইল।
অনিরুদ্ধ মৃদু স্বরে প্রবোধকে বলল, ‘তাড়াতাড়ি জার্সিটা এনে দিন।”
”মামা, আমারে এখন খেলতে বলছেন?”
”বলছি।”
”কী জইন্য?”
”তোর ওপর আমার বিশ্বাসের সম্মান রাখার জন্য। তুই ইচ্ছে করলে ম্যাচটা বার করে আনতে পারবি, এই আমার বিশ্বাস। পারবি?”
”মামা, এমন কথা কেউ আমারে কোনওদিন কয় নাই।”
কুড়োনের গলা ভারী হয়ে এল, চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল, চোখে বিহ্বল চাহনি।
”পারবি?”
”চেষ্টা করব।”
অনিরুদ্ধ প্রায় ছুটে ডায়াসে চেয়ারে এসে বসল। অশোক ভদ্র জিজ্ঞাসু চোখে ওর দিকে তাকাল। ”নরেনকে কি ওরা বসাচ্ছে?”
”হ্যাঁ। বসাতে বলে এলুম।”
”কাকে নামাবে?”
”কেউ একজন হবে।” অনিরুদ্ধ গা—ছাড়া উত্তর দিল। দু’দলের খেলোয়াড়রা তখন মাঠে নেমে পড়েছে, দর্শকরা সবই স্থানীয়, তারা দেখল নরেনের বদলে অচেনা একটা কিশোরকে। গুঞ্জন উঠল: ‘এ আবার কে!’ ফল তখন এক—এক।
কিক—অফের সঙ্গে সঙ্গে নারিকুল বল পাঠাল চণ্ডীপুরের ডান কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে। রাইট আউট আগেই দৌড় শুরু করেছিল, বলটা ধরে সে লেফট ব্যাককে কাটিয়েই গোলমুখে উঁচু করে পাঠাল। দ্বিধাগ্রস্ত গোলকিপার কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করে বেরোবার আগেই নারিকুলের স্ট্রাইকারের হেড গোলে ঢুকে গেল। তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে গোল। তাজ্জব, মাঠে টুঁ শব্দটি নেই। নারিকুল এক গোলে এগিয়ে গিয়ে মাঝমাঠটা দখল করে নিল।
সি এ সি গোলটার ধাক্কা সামলাতে না পেরে এলোমেলো খেলছে। কুড়োন সামনে উঠেছিল। এতক্ষণ একটা বলও পায়নি। এবার সে নেমে এসে পায়ে বল রেখে নিজের টিমকে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করতে লাগল।
”এই ছেলেটাকে শুরু থেকে খেলায়নি কেন!” অশোক ভদ্র মন্তব্য করল। ঝুঁকে ডায়াসের পাশে দাঁড়ানো একজনকে জিজ্ঞেস করল, ”ছেলেটা কে?”
বিব্রত মুখে লোকটি বলল, ”বলতে পারব না। এখানকার কেউ নয়।” বলেই সে পাশের লোককে জিজ্ঞেস করল, ”চেনেন নাকি?” সেই লোকটিও মাথা নাড়ল।
অনিরুদ্ধ একমনে কুড়োনকে দেখে যাচ্ছিল। বল চেয়েও বল পাচ্ছে না, বল দিয়ে বল ফেরত পাচ্ছে না। মুখে বিরক্তি ফুটে উঠেছে। অবশেষে মাঝমাঠে একটা বল পেয়ে সে সামনে অনেকটা খোলা জমি দেখে বলটা ঠেলে দিয়েই ছুটতে শুরু করল। দু’দিক থেকে দুজন ছুটে এল ওকে বাধা দিতে। একজন বলের দিকে বেপরোয়া পা চালাল পাশ থেকে, কুড়োন টুক করে বলটা সরিয়ে নিয়েই ছুটল, সামনে এসে গেল দ্বিতীয় জন। ছোটার গতি একই রকম রেখে শরীরটা একটু পাশ ফিরিয়ে দ্বিতীয়জনের গা ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়ে তাকে পেছনে ফেলে দিল।
অনিরুদ্ধ সামনে ঝুঁকে টেবল ক্লথ আঁকড়ে ধরে বলে উঠল, ”এবার গোল হবে।”
অশোক ভদ্র আর এস.ডি.ও. তার মুখের দিকে তাকাল।
কুড়োনের সামনে এখন স্টপার। ট্যাকলিংয়ে না গিয়ে স্টপার পিছিয়ে যাচ্ছে, কুড়োনকে কাছে আসতে দিচ্ছে, মোক্ষম সময়ে চূড়ান্তভাবে বাধা দেবে। কুড়োন তার চার হাতের মধ্যে এল, প্রায় মুখোমুখি হয়ে সে শরীরটাকে ডাইনে বাঁয়ে দ্রুত নাড়িয়েই স্টপারের দু’ পায়ের ফাঁক দিয়ে বলটা গলিয়ে দিল।
”আশ্চর্য তো!” এস.ডি.ও.—র মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে এল কথাটা।
”অবিশ্বাস্য, একদৌড়ে তিনজনকে!” অশোক ভদ্র স্তম্ভিত।
স্টপার ঘুরে গিয়ে কুড়োনকে যখন তাড়া করল তখন সে পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়া গোলকিপারের পাশ দিয়ে বলটাকে গোলে ঠেলে দিয়েছে।
সারা মাঠের দর্শকরা হতভম্ব চোখে কুড়োনের কাণ্ড দেখছিল। গোলটা হতেই কয়েকটি ছেলে পাগলের মতো মাঠের মধ্যে ছুটে এসে কুড়োনকে জড়িয়ে টানাহ্যাঁচড়া শুরু করল।
”গোল হবে তুমি জানলে কী করে?” অশোক ভদ্র কৌতূহল মেটাতে জানতে চাইল।
অনিরুদ্ধ ঠোঁট টিপে রহস্যময় হাসি হেসে বলল, ”জ্যোতিষবিদ্যা।”
”তা হলে বলো ম্যাচের রেজাল্ট কী হবে?”
”চণ্ডীপুর জিতবে। ওই কুড়োনই জেতাবে।”
”কুড়োন!” অশোক ভদ্র তাকিয়ে রইল অনিরুদ্ধর মুখের দিকে।
”নামটা জানো, তার মানে ওকে চেনো।”
”চিনি।”
খেলা আবার শুরু হয়ে গেছে। ম্যাচের ফল দুই—দুই। মাঠ ঘিরে ঝোড়ো আওয়াজ ওঠে, যখনই কুড়োন বল ছোঁয়। তাকেই শুধু বল দিতে চায় দলের খেলোয়াড়রা। আর নারিকুলিরা সযত্নে চেষ্টা করে যায় বল নিয়ে সে যেন এক পা—ও না এগোতে পারে। নিজেকে মুক্ত রাখার জন্য কুড়োন অবিরত ঘোরাফেরা করে চলেছে। কিন্তু ছিনে জোঁকের মতো একজন তার সঙ্গে সর্বদা লেগে রয়েছে। চণ্ডীপুরিরা এখন ভীষণ উদ্দীপ্ত হয়ে বাধা দিয়ে চলেছে অবশ্য গোল করার ইচ্ছাটা জাগিয়ে রেখে।
অশোক ভদ্র ঘড়ি দেখে বলল, ”আর চার মিনিট বাকি, মনে হচ্ছে ড্র হবে। তোমার জ্যেতিষবিদ্যা এবার আর কাজ দিল না।”
অনিরুদ্ধ চুপ করে রইল। ঠিক তখনই একটা বল ধরার জন্য কুড়োন ছুটল। তার সঙ্গে লেগে থাকা খেলোয়াড়টি ওর সঙ্গে ছুটতে গিয়ে যখন বুঝল ওকে আর ধরা যাবে না তখন নিরুপায় হয়ে ট্রিপ করে ফেলে দিল পেনাল্টি এলাকার দু’গজ বাইরে।
অবধারিত ফ্রি—কিক দিলেন রেফারি। অনিরুদ্ধ নড়েচড়ে বসে মনে মনে ভগবানকে ডাকল—কুড়োন যেন ফ্রিকিকটা মারে। ভগবান বোধ হয় প্রার্থনাটা শুনলেন এবং মঞ্জুর করলেন। বসানো বলটা থেকে দশ হাত দূরে চারজন নারিকুলি পাঁচিল দিয়ে দাঁড়াল। চণ্ডীপুরের লেফটব্যাক এসেছে শট নিতে। কুড়োন হাত নেড়ে তাকে সরিয়ে কী যেন বলতে সে চারজনের পাঁচিলের গা ঘেঁষে পঞ্চমজন হয়ে দাঁড়াল। গোলকিপার ক্রসবারের এধার—ওধার সরে—সরে বলটাকে দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছে আর চেঁচিয়ে পাঁচিলটাকে সাজিয়ে নিচ্ছে।
