.
খেলা শুরুর তিন মিনিটের মধ্যে নরেন গোল দিল বাঁপায়ের দুর্দান্ত একটা নিচু শটে। নরেনকে পেনাল্টি এলাকার মাথায় রেখে সি এ সি শুরু করে। দু’মিনিটেই নারিকুল প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে সবাই এগিয়ে যায় দু’জনকে ডিফেন্সে রেখে। একটা বল এই সময় ছিটকে আসে নরেনের কাছে। বল নিয়ে গোলের দিকে এগোতে গিয়ে দেখল দু’জন ডিফেন্ডার তার সামনে ও পাশ থেকে ছুটে আসছে। নরেন দেরি না করে পনেরো গজ দূর থেকেই ডান বারপোস্ট ঘেঁষে শট নেয়। ঝাঁপানো গোলকিপারের আঙুলে ছুঁয়ে পোস্টে লেগে বল গোলে ঢোকে।
”খুব প্রম্পট শটটা নিয়েছে, দেরি করলে বলটা পায়ে রাখতে পারত না। ব্রেন কুইক কাজ করেছে।” অশোক ভদ্র ঈষৎ উত্তেজিত স্বরে এস ডি ও—কে নরেনের কৃতিত্বটা ব্যাখ্যা করে দিল। অনিরুদ্ধর ভাল লেগেছে গোল করার ধরনটা।
নারিকুল এবার হঁশিয়ার হয়ে গেল, বিশেষ করে নরেনের পেনাল্টি এলাকায় উঠে থাকাটায় তারা নজর রাখল। বল ধরার জন্য সে একটু দৌড়লেই নারিকুলের স্টপার তেড়ে যাচ্ছে বা বল ধরলেই তাকে কেউ না কেউ ট্যাকল করছে। অনিরুদ্ধ একবার দেখল নরেনকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতেও। উঠে দাঁড়িয়ে সে দু’পা খুঁড়িয়ে হাঁটল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ল।
দশ মিনিটের সময় নারিকুল গোলটা শোধ করে দিল। গোলের সামনে এলোমেলো শট হচিছল, একজনের পায়ে লেগে বল আচমকা গোলে ঢুকে গেল। এরপর দ্বিগুণ উৎসাহে নারিকুল কোণঠাসা করে রাখল সি এ সি—কে। খেলার ধরন আর চালচলন দেখে অনিরুদ্ধ আন্দাজ করেছিল কোন চারজন কলকাতা থেকে এসেছে। সেন্টার স্টপার, গোলকিপার, সেন্ট্রাল স্ট্রাইকার আর একজন মিডফিল্ডারকে সে চিহ্নিত করে ফেলল।
হাফটাইমের পাঁচমিনিট আগে কে একজন কোনাকুনি থ্রু বাড়াল ডান দিকের ফাঁকা জায়গায়। নরেনকে প্রায় পনেরো গজ দৌড়ে বলটা ধরতে হবে। ধরে বল নিয়ে আধা—ঘুরলেই সামনে পড়বে লেফট ব্যাক, তার পেছনে গোলকিপার অথবা বল ধরে গোল লাইনের কাছে ব্যাকটিকে টেনে নিয়ে গিয়ে ব্যাক সেন্টার করতে পারে। অনিরুদ্ধ চেয়ারে সিধে হয়ে বসল, এবার নরেনের আসল পরীক্ষা।
থ্রু—টা ধরার জন্য নরেন ঝটকা দিয়ে ছোটা শুরু করল, পাশাপাশি তার সঙ্গে কয়েক গজ ছুটেই লেফটব্যাক পা বাড়িয়ে দিল বলটা সরিয়ে দিতে। ট্যাকলটা পরিচ্ছন্ন ও বিধিসম্মতভাবে হলেও নরেন পায়ে পা জড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে মাঠে পড়ে গেল। চিত হয়ে সে এ—পাশ ও—পাশ করে দু’বার গড়াগড়ি দিয়েই ডান পায়ের গোছ চেপে ধরে উঠে বসল। ঘটনাটা পেনাল্টি এলাকার মধ্যে ঘটেছে, কলকাতার রেফারি বাঁশি বাজিয়ে পেনাল্টি স্পটের দিকে আঙুল দেখালেন। মাঠ ঘিরে তুমুল উল্লাস।
অনিরুদ্ধ তাকাল অশোক ভদ্র—র দিকে। সে মাথা নেড়ে বলল, ”ভুল দিল।”
”ভুল কেন?” এস ডি ও ক্ষুব্ধ চোখে তাকালেন অশোক ভদ্রের দিকে, ”মেরে ফেলে দিল এ তো পরিষ্কার পেনাল্টি।”
অনিরুদ্ধ মহকুমা শাসককে বোঝাবার চেষ্টা করে শুধু বলল, ‘ছেলেটা আর মাঠে থাকতে পারবে না।”
পেনাল্টি শটটা নিল নরেনই, অবশ্যই বাঁ পায়ে। বাঁ—দিকের পোস্ট ঘেঁষে নিচু শট। গোলকিপার যেন জানতই, ঝাঁপিয়ে গোললাইনের বাইরে ঠেলে দিল।
”নন—কিকিং ফুটে জোর নেই। উচিত হয়নি শটটা নেওয়া।” অনিরুদ্ধ জানাল অশোক ভদ্রকে।
”ইনজুরিটা কি আগেই ছিল?”
অনিরুদ্ধ চুপ করে রইল।
লজ্জায় মাথা নামিয়ে নরেন খোঁড়াতে খোঁড়াতে সাইড লাইনের দিকে চলে গেল। সি এ সি বস্তুত দশ জনে খেলে হাফটাইম পর্যন্ত কয়েকটা মিনিট আটকে রাখল নারিকুলকে।
হাফটাইম হতেই অনিরুদ্ধ ডায়াস থেকে নেমে গিয়ে নির্মল ঘোষের সঙ্গে দেখা করল। অভিযোগের সুরে সে বলল, ”আমি বারণ করেছিলুম ওকে খেলাতে। দেখলেন তো এখন ও মাঠে দাঁড়াতে পারছে না। সাবস্টিটিউট নামান।”
নির্মল ঘোষ পাংশু মুখে বললেন, ”নরেনের জায়গায় নামাবার মতো কোনও ছেলে তো আমাদের নেই। দেখি আমাদের সেক্রেটারি প্রবোধের সঙ্গে কথা বলে।”
খেলোয়াড়রা মাঠের ধারে কেউ বসে কেউ শুয়ে। নির্মল ঘোষ সেই দিকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলেন। অনিরুদ্ধ দেখল তিনি ধুতি শার্ট পরা এক মাঝবয়সীর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। বোধহয় ইনিই প্রবোধ। মাথা নেড়ে প্রবোধ কিছু একটা বোঝাতে চাইছে। অনিরুদ্ধ এগিয়ে গেল।
”আপনাদের কোনও সাবস্টিটিউট প্লেয়ার নেই?” অনিরুদ্ধ যতটা সম্ভব শোভনতা বজায় রেখে ধমকে উঠল।
প্রবোধ বলল, ”আছে গোলকিপার। একজন ফরওয়ার্ড ছিল, মামার বিয়েতে বরযাত্রী গেছে, সকালে ফেরার কথা ছিল, এখনও ফেরেনি। আর একজন রাগ করে মাঠেই আসেনি। তাকে বলেছিলুম পুরো ম্যাচ খেলাতে পারব না, তার প্রেস্টিজে লেগেছে।”
”তা হলে তো আপনাদের দশ জনে খেলতে হবে। খেলা দেখে মনে হচ্ছে আরও গোটা দুই গোল খাবেন।”
”ভাগ্যে থাকলে খাব, কী আর করা যাবে!” প্রবোধ আকাশের দিকে তাকাল।
”একটা কাজ করুন, আমি একটা ছেলে দিচ্ছি তাকে নামান। এমনিই তো দশজন হয়ে গেছেন, একটা প্লেয়ার মাঠে থাকলে লাভ বই ক্ষতি তো হবে না!” অনিরুদ্ধ মরিয়া হয়ে ফাটকা খেলার মতো বলল।
নির্মল ঘোষ অবাক হয়ে বলল, ”কে ছেলে? কোথায়?”
অনিরুদ্ধ পেছন ফিরে দেখল অলুর কোনও কথায় বোধ হয় কুড়োন হাসতে হাসতে কুঁজো হয়ে গেল।
”ওই ছেলেটা। বুট, প্যান্ট লাগবে না শুধু একটা জার্সি দিন।” বলেই কুড়োনের দিকে এগিয়ে গেল।
