”এশিয়ান গেমস, ওলিম্পিক ছাড়া ভারত কি আর কখনও কারুর সঙ্গে খেলেনি?”
”আচ্ছা অনিরুদ্ধদা, আপনি কি মোহনবাগানের সাপোর্টার?”
”না।”
”ইস্টবেঙ্গলের?”
”না।”
লোকটা এবার গঙ্গায় পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগল।
”তা হলে কার সাপোর্টার?”
”ওই দুটো ক্লাবের সাপোর্টার হতেই হবে এমন কোনও কথা আছে কি?”
অনিরুদ্ধর ডান দিকে বসা কুড়োন তখন বলে উঠল, ”উনি স্বামী স্বরূপানন্দ স্কুলটিমের সাপোর্টার।”
”অ।” লোকটা কী বুঝল কে জানে! মাথা কাত করে পেছনে তাকিয়ে বলল, ”আচ্ছা, আপনার ফেভারিট প্লেয়ার কে?”
অনিরুদ্ধর বাঁ দিকে বসা অলু মুখ টিপে বলল, ”কুড়োন মণ্ডল, খুব ফেমাস প্লেয়ার।” একটু থেমে চাপা গলায় বলল, ”হবে।”
কুড়োন হাত বাড়িয়ে অলুর হাঁটুতে চিমটি কাটল।
রবিবার রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কম। ওদের মোটর হাওড়া ব্রিজ পার হয়ে জি টি রোড ধরে এক ঘণ্টায় পৌঁছে গেল চণ্ডীপুরে। নির্মল ঘোষ ওদের প্রথমে নিয়ে গেলেন নিজেদের পৈতৃক বাড়ির বৈঠকখানায়। ওঁরা এখানকার প্রাচীন ধনী পরিবার। ব্যবসা আছে কলকাতার পোস্তায়, ঢালাই লোহার কারখানা সালকিয়ায়। নির্মল ঘোষ থাকেন টালিগঞ্জে নিজের বাড়িতে।
সাই—এর কোচ অশোক ভদ্র তখনও এসে পৌঁছননি। ওরা অপেক্ষা করতে লাগল। অনুষ্ঠান—প্রধান এস ডি ও ঠিক পৌনে তিনটেয় হাজির হলেন, অবাঙালি তরুণ, বাংলা বলতে পারেন। অলু আর কুড়োন কিছুক্ষণ উসখুস করে গুটিগুটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘরে তখন জনাপাঁচেক বাইরের লোক। নির্মল ঘোষ সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন, তখন ধুতি পাঞ্জাবি পরা এক মধ্যবয়সী উদ্বিগ্ন মুখে তাঁকে বাইরে ডাকল। মিনিট তিনেক পর তিনি ফিরে এসে অনিরুদ্ধকে চাপা গলায় বললেন, ”একটা বিপদ হয়ে গেছে, নরেনের পা মচকে গেছে আজ সকালে। বেলপাতা পাড়তে গাছে উঠেছিল। পিঁপড়ে কামড়ায় হাতে, জ্বালা করে উঠতেই চুলকোতে গিয়ে ডাল থেকে হাত স্লিপ করে মাটিতে পড়ে যায়, ডান পায়ের গোছটা মচকায়। পাশের বাড়ির ফ্রিজ থেকে সঙ্গে সঙ্গে বরফ এনে লাগায় কিন্তু ফুলে উঠেছে, অল্প অল্প যন্ত্রণাও রয়ে গেছে। কী যে এখন করা যায়! ছেলেটা বলছে বটে, ও কিছু নয় আমি ঠিক খেলে দেব। কী মুশকিলে পড়া গেল বলো তো?”
নির্মল ঘোষ অসহায় ভাবে তাকিয়ে রইলেন অনিরুদ্ধর মুখের দিকে, তাঁর চোখে পরামর্শ পাওয়ার জন্য আবেদন। অনিরুদ্ধ বলল, ”খেলাবেন না নির্মলদা, একদম খেলাবেন না। ও খেলতে তো পারবেই না, তার থেকেও মারাত্মক, এই চোট ওর অনেক ক্ষতি করে দেবে।”
”কিন্তু নরেন নিজে খেলতে চায়। ও জানে অশোক ভদ্র আজ ওর খেলা দেখবে। তা ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই যাকে নরেনের জায়গায় নামানো যায়,” কথাগুলো নির্মল ঘোষ বিপন্ন মুখে বললেন। ”খেলা শুরুর তো সময় হয়ে গেল, চলো এবার মাঠে যাওয়া যাক, আসুন সার।” এস ডি ও—কে নিয়ে তিনি রওনা হলেন, বাড়ি থেকে মাঠ হেঁটে চার মিনিট। মাঠে ওরা সবে পৌঁছেছে তখনই আর একটা অ্যাম্বাসাডার এসে থামল, নামল অশোক ভদ্র। অনিরুদ্ধকে দেখে সে বলল, ”চিনতে পারো?”
অনিরুদ্ধ মুখটা মনে করার চেষ্টা করল। চিনতে পারছে না বুঝে অশোক বলল, ”রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামে ষোলো বছর আগে শিল্ডের ফার্স্ট রাউন্ডে লাল কার্ড দেখেছিলে আমার মুখে ঘুসি মেরে।” বলেই হো হো করে হেসে উঠল সে।
অনিরুদ্ধর মুখে রক্ত ছুটে এল। ঢোক গিলল। তখন সবে নাম করেছে, বড় ক্লাবে অফার আসছে, খেলার মধ্যে কিছু কিছু অভব্যতা করেছে ছোট টিমের সঙ্গে। এবার মনে পড়ল ম্যাচটা ছিল এরিয়ানের সঙ্গে বর্ধমান ডিস্ট্রিক্টের, সে তখন ছিল এরিয়ানে।
”তোমার এখনও মনে আছে?”
”থাকাই তো উচিত। বড় গোলকিপারের ঘুসি, সেটা কি ভোলা যায়?”
দু’জনে খুব একচোট হেসে এগিয়ে গেল টেবলপাতা মঞ্চের দিকে। মঞ্চের দু’ধারে গণ্যমান্যদের জন্য চেয়ার। অন্য একটা টেবলে ঢাউস একটা শিল্ড, রানার্সের জন্য বড় একটা কাপ, বেস্ট প্লেয়ারের কাপ আর বাইশজন খেলোয়াড়, রেফারি, লাইন্সম্যানদের জন্য তোয়ালে, ওয়াটারবটল, ছোট কিটব্যাগ।প্রাইজের জিনিসগুলো দেখে অনিরুদ্ধ মনে মনে বলল : ”কিছুই বদলায়নি, এইসব জিনিস আমিও পেতাম টুর্নামেন্ট খেলে। এর থেকে বরং প্রত্যেককে ফুটবল আইনের বই একটা করে দিলে ভাল হত। বেশিরভাগ ছেলেই তো আইন না জেনে খেলে।
অনিরুদ্ধর মনে পড়ে গেল একতা সঙ্ঘের মাঠে টিভি শুটিংয়ের জন্য সাজানো ম্যাচটার কথা। প্রায় একই রকম লাগছে। সেই কাপ—শিল্ড, বেস্ট প্লেয়ারের কাপ, প্রাইজ, তোয়ালে, সেই প্রাইজ দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট, চিফ গেস্ট, মাঠ ঘিরে উপচে পড়া ভিড় আর মাইকে ঘোষণা। মাঠের মাঝে সার দিয়ে থাকা দুটো টিমের সঙ্গে পরিচয় আর হ্যান্ডশেক করা। তফাত শুধু সেটা ছিল নকল আর এটা আসল। মাঠ থেকে ফিরে এসে ডায়াসে ওঠার সময় দেখতে পেল সামনেই দুটো স্টিলের চেয়ারে অলু আর কুড়োন পাশাপাশি বসে।
মাঠে খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময় তারা নিজেদের নাম বলছিল। একটি ছেলে হ্যান্ডশেক করে বলল, ”নরেন বেরা।” শুনেই ভ্রূ কুঁচকে অনিরুদ্ধ তার ডান পায়ের দিকে একবার তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। যদি নিজে মনে করে খেলতে পারবে তা হলে খেলুক। নারিকেল স্পোর্টিং নাকি চারজন ফার্স্ট ডিভিশন প্লেয়ার খেলাচ্ছে! তাদের ট্যাকলিং নরেনকে সামলাতে হবে।
