”কুড়োন, তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।” প্র্যাকটিস শেষে অনিরুদ্ধ কুড়োনকে ডাকল।
”কী মামা?”
”তুই এখন থাকবি, খাবি কোথায়?”
”কেন, যেখানে আছি সেখানেই থাকব! দাদুর চাকরিটা পেলি খাওয়াও আমার চলে যাবে।” কুড়োন নিশ্চিতভাবে বলল।
”তুই যদি আমাদের বাড়িতে থাকতে চাস তা হলে থাকতে পারিস, খাওয়াও আমাদের ওখানে।” কথাটা বলে অনিরুদ্ধ ওর মুখভাব লক্ষ করল। কুড়োনের চোখে প্রথমে একটা ঝিলিক দিল, তারপর হাসি ছড়িয়ে পড়ল সারামুখে।
”না মামা, আমি কোথাও যাব না, ওই ঘরেই থাকব, কোনও অসুবিধা হবে না।”
অনিরুদ্ধ ওর সংক্ষিপ্ত, দৃঢ় গলার স্বরে বুঝে গেল এই ব্যাপারে আর কথা বলে লাভ নেই। তার মনে পড়ল হারুদার কথাটা, ‘এই ছেলেটাকে এবার ছেড়ে দে। আরও কঠিন জায়গায় গিয়ে ও নিজেকে তুলে ধরুক।’
অনিরুদ্ধ শুধু বলল, ”তোর যখন যা দরকার পড়বে আমাকে বলবি।”
”বলব।”
অনিরুদ্ধ ওর চোখে নরম আলো ফুটে উঠতে দেখল। কুড়োন মৃদু চাপা স্বরে বলল, ”মামা রাইগ করলান?”
”না রে, রাগ করব কেন, নিজে নিজে বড় হওয়াই তো আসল বড় হওয়া। খুব চেষ্টা কর, নিশ্চয় বড় হবি।”
.
ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার নিয়ে যারা সুদের টাকা দিচ্ছে না তাদের তালিকা তৈরি করছিল অনিরুদ্ধ, এমন সময় নির্মল ঘোষ টেবলের পাশে এসে দাঁড়ালেন। শান্ত নিরীহ মধ্যবয়সী, কখনও কাজে ফাঁকি দেন না, সহকর্মীদের সবসময় সাহায্য করেন, সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে। ঝুঁকে অনিরুদ্ধর কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ”একটা অনুরোধ করব, রাখবে?”
অনিরুদ্ধ সিধে হয়ে বসল, ”বলুন নির্মলদা, সাধ্যের মধ্যে হলে নিশ্চয় রাখব।”
”সাধ্যের মধ্যেই এটা। আমাদের গ্রামে ঠাকুর্দার নামে একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট হয় গণপতি চ্যালেঞ্জ শিল্ড আর ঠাকুমার নামে রানার্স কাপ। চল্লিশ বছরের টুর্নামেন্ট। জেলার তা বটেই, কলকাতারও বহু নামকরা প্লেয়াররা খেলে গেছে। এবারও অনেকে খেলেছে। রবিবার পনেরো তারিখে ফাইনাল। এবার তুমি যদি ফাইনালে বিশেষ প্রধান অতিথি হও, তা হলে অর্গানাইজারদের বলে দেব।” নির্মল ঘোষ প্রার্থীর মতো মুখ করে তাকিয়ে রইলেন।
অনিরুদ্ধ ফাঁপরে পড়ল। জীবনে সে দুটি কি তিনটি ফুটবল ফাইনালে পুরস্কার দিয়েছে, দু—তিন মিনিটের বক্তৃতা কোনওক্রমে দিয়েই চেয়ারে বসে পড়েছে। এই একটি জিনিস সে মনেপ্রাণে অপছন্দ করে—বক্তৃতা দেওয়া। খেলোয়াড়রা ক্লান্ত, দর্শকরা যখন উল্লসিত বা বিমর্ষ, তখন বক্তৃতা কারও মাথায় ঢোকে না। কিন্তু উদ্যোক্তারা চান একটা লম্বা বক্তৃতা, যা কেউ শোনে না অন্তত সে নিজে কখনও শুনত না। ফুটবল ম্যাচ দেখতে বা পুরস্কার হাতে তুলে দিতে তার ভালই লাগে, শুধু ওই বক্তৃতাটি ছাড়া।
অনিরুদ্ধকে দ্বিধাগ্রস্ত হতে দেখে নির্মল ঘোষ বললেন, ”আমাদের চণ্ডীপুরকে খুব ছোট ভেবো না, দুটো ফুটবল টিম শুধু আমাদেরই গ্রামে আছে, আগের বছর সুবোধ ব্যানার্জি, তার আগের বছর কল্যাণ সেন সবাই ওলিম্পিয়ান, তারও আগে কাল্টু ভট্টাচার্য, বিশু গুঁই—রা প্রধান অতিথি হয়ে গেছে। সভাপতি বরাবরই হয়েছে এস ডি ও বা এম এল এ। আজেবাজে লোককে আমরা ডায়াসে তুলি না।”
”বিশেষ প্রধান অতিথি মানে একজন অবিশেষ প্রধান অতিথিও আছেন, তিনি কে?”
”অশোক ভদ্র, সল্ট লেকে সাই—এর ফুটবল কোচ। আমাদের সি এ সি, মানে চণ্ডীপুর অ্যাথলেটিক ক্লাবের নরেন বেরা নামে একটা ছেলে দারুণ খেলে, ওর খেলা অশোক ভদ্রকে দেখাবার জন্যই ওকে আনা হচ্ছে। পছন্দ হলে সাই—এর স্কুলে নরেনকে নিয়ে নিতে পারে, ওকে চেনো নাকি?”
”না, চিনি না; নির্মলদা, সি এ সি কি ফাইনালে খেলছে? অন্যদিকে কে?”
”সি এ সি—র অপোনেন্ট নারিকুল স্পোর্টিং। ওদের টিমে চারটে ফার্স্ট ডিভিশন প্লেয়ার আছে। জুনিয়ার বেঙ্গলে খেলেছে। অনিরুদ্ধ তা হলে অর্গানাইজারদের জানিয়ে দিই তুমি আসছ, কার্ডে নামটা ছাপাতে হবে তো। তোমাকে গাড়ি করে নিয়ে যাবে, পৌঁছেও দেবে।”
”নির্মলদা, একটা কথা, বক্তৃতা আমি দিতে পারি না, দেবও না।”
”ও ঠিক আছে, দু—চারটে কথা বললেই হবে। দুপুর একটায় গাড়ি যাবে, তিনটেয় খেলা আরম্ভ।”
অনিরুদ্ধ ঠিক করল, রবিবার অলু আর কুড়োনকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাবে, খেলা দেখা হবে আর বেড়ানোও হবে। আসল গ্রাম দেখার সুযোগ তো ওদের হয় না, তা ছাড়া যাতায়াত মোটরে, স্বচ্ছন্দে যাবে আসবে। ওদের দু’জনকে সে বলে রাখল একটার সময় যেন রেডি হয়ে থাকে। কুড়োনের জামা—জুতোর সমস্যাটা মিটিয়ে দিল অমলা। অলুর হাওয়াই শার্ট আর কালো হাফপ্যান্ট ফিট করে গেল, জুতোটা কপিল ঘোষের দেওয়া।
একটা—দশে পুরনো একটা অ্যাম্বাসাডার এল। ড্রাইভারের সঙ্গে একটা লোক।
”বাড়ি চিনে বার করতে অসুবিধে হয়নি তো?” মোটরে মিনিট পনেরো যাওয়ার পর অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করল।
এতক্ষণ চুপ করে থাকা লোকটি একগাল হেসে বিগলিত ভাবে বলল, ”একদম নয়। আপনার বাড়ির কাছের মোড়ে এক দোকানদারকে আপনার নাম বলতেই দেখিয়ে দিল বাড়িটা। আপনার মতো ফেমাস লোকের বাড়ি চিনে বার করা এ আর কী এমন শক্ত! আচ্ছা অনিরুদ্ধদা, আপনি এশিয়ান গেমসে খেলেছেন?”
”না।”
”ওলিম্পিকে খেলেছেন?”
মোটর তখন হাওড়া ব্রিজ দিয়ে গঙ্গা পার হচ্ছে।
”না।”
”তা হলে!” লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল এমনভাবে, যেন অনিরুদ্ধ তাকে হাওড়া ব্রিজ থেকে গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলে দেবে বলল। ”আপনি ইন্ডিয়া খেলেননি?”
