”রাখালদা তোমার প্রেসক্রিপশনটা আমায় দাও, আমি মাসে মাসে তোমায় কিনে দিয়ে যাব। কিন্তু রোজ তোমায় খেতে হবে।” কথাটা বলে রাখালের বিহ্বল কৃতজ্ঞ দুটি ঘোলাটে চোখের দিকে তাকিয়ে অনিরুদ্ধ অত্যন্ত তৃপ্ত বোধ করল। তারপর বলল, ”কুড়োনকে বোলো ওর বইখাতা যা লাগবে আমাকে যেন বলে।”
পরের দিনই অনিরুদ্ধ অফিস ফেরত গড়িয়াহাট থেকে রাখালের এক মাসের ওষুধ কিনে হাজির হল রাখালের ঘরে। ধুতি—শার্ট পরা এক অল্পবয়সী ছেলের সঙ্গে রাখাল তখন কথা বলছিল। পলিথিনের ঠোঙায় ভরা ট্যাবলেটের পাতাগুলো রাখালের হাতে দিয়ে বলল, ”সামনের মাসে আবার দিয়ে যাব, মনে করে খাবে কিন্তু!”
”খুব ভাল করলা এগুলো কিনা দিয়া। এই দ্যাখো আমার বড় বোনের নাতি আইছে আমারে নিয়্যা যাইতে, অর বোনের বিয়া। পাশের গেরাম চরখেরিতে ছেলের বাড়ি, ছেলেডা মাছ ধরে; আজ পনেরো—বিশ বছর বোনরে দেখি না, ভাবতাছি এই উপলক্ষে বোনডারে দেখে আসি। যাওয়া কি কম ধকলের ব্যাপার, সকালে বাইরালে সেই বিকালে পৌঁছানো—বাস, লঞ্চ, টেম্পো, তারপর পাঁচ মাইল হাঁটা!”
”ওষুধগুলো সঙ্গে নিয়ে যেও।”
”তা আর বলতে! দশ মাইলের মধ্যে ডাক্তারবদ্যি নাই, ওষুধের দোকান নাই।”
”কুড়োনও সঙ্গে যাচ্ছে?”
”নাঃ।” রাখাল হতাশা মেশানো বিরক্তি নিয়ে বলল। ”ওর নাকি পড়ায় বিঘ্ন হবে। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাতের এটাই তো সুযোগ, তা হতচ্ছাড়ার কাছে পড়াটাই নাকি বড় কাজ। ও নিজে রেঁধেবেড়ে খাবে, বললুম কত করে, শুনলই না।”
অনিরুদ্ধর সঙ্গে রাখালের এটাই শেষ কথাবার্তা। সাতদিনের ছুটির দরখাস্ত ভবাকে দিয়ে লিখিয়ে শুক্রবার সকাল দশটায় হেডমাস্টারমশাইয়ের হাতে সেটা দিয়েই রাখাল তার বোনের নাতির সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে। গত পঁয়তাল্লিশ বছরে রাখাল সাতদিনের ছুটি তিন—চারবারের বেশি নেয়নি। দরখাস্তটা যে মঞ্জুর হয়ে যাবে, এই ব্যাপারে সে নিশ্চিত ছিল।
পরদিন শনিবার বিকেলেই রাখালের বোনের সেই নাতি এবং সঙ্গে আর একটি লোক বন্যায় ডোবা একতলা বাড়ির চালে বসে থাকা মানুষের মতো মুখ করে স্কুলে এসে হাজির। ভবা তখন ঘরে ঘরে তালা লাগাচ্ছিল। সেই প্রথম দুঃসংবাদটা শুনল—রাখাল কাল বিকেলেই টেম্পো থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে মাইল তিনেক যাওয়ার পরই রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। মুখে জল দেওয়ার বা কানে হরিনাম জপ করার সুযোগও কেউ পায়নি। ”ডেডবডি এখনও রাখা আছে। কুড়োন গিয়ে মুখে আগুন দিলে তবেই দাহ করা হবে,” বলল সঙ্গের লোকটি।
কুড়োন তখন একতা সঙ্ঘের মাঠে। ভবা ওই দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে আসে।
”জানো মামা, আমরাও শুনলুম ওর সঙ্গে।” অলু সন্ধ্যাবেলায় অনিরুদ্ধকে বলে ব্যাঙ্ক থেকে ফিরে আসামাত্র। ”ভেবেছিলুম ও কেঁদে উঠবে হাউহাউ করে। কিছুই করল না। মুখখানা কেমন শক্ত হয়ে গেল। শুধু বলল, ‘আমারে কি এখন যাইতে হইব?’ তারপর একটা কথাও না বলে ওদের সঙ্গে চলে গেল।”
শুনে গুম হয়ে অনিরুদ্ধ অনেকক্ষণ শুয়ে রইল, কিছু খেলও না। তার শুধু চোখের সামনে দিয়ে সার বেঁধে চলেছে স্কুলজীবন এবং রাখাল। টুকরো টুকরো ঘটনা আর রাখালের গলার স্বর। এত বছর এখানে রইল অথচ কথার ভাষা আর উচ্চচারণ একদম পালটাল না। স্কুলের সামান্য মাইনেতে নিজেরই দু’ বেলা ভাল করে খাওয়া জোটে না তবু ভাইয়ের নাতিকে কাছে এনে রাখল। তা না হলে কুড়োন কোথায় ভেসে যেত কে জানে! রাখালই ছিল কুড়োনের একমাত্র আশ্রয়, সেই রাখালের মৃত্যুসংবাদ শুনেও কুড়োনের চোখে জল এল না! একবারও মনে এল না এবার ওর কী হবে, কোথায় থাকবে, কী খাবে!
রাত্রে সে শিবেনবাবুর কাছে গিয়ে কথা বলল। তিনি বললেন, ”ভবা আমায় সবই বলেছে, রাখাল যে ঘরটায় থাকত সেখানেই কুড়োন থাকুক আর রাখাল যে কাজ করত, দুপুরে সেটাই করুক। ওর পড়াটা সকালে যেরকম চলছে চলুক। আপাতত জরুরি ভিত্তিতে ওকে নিয়োগ তো করা যায়, মনে হয় না কমিটি তাতে আপত্তি করবে। ছেলেটাকে তো খেয়েপরে বাঁচতে হবে, তবে ওর ফুটবলে সময় কমে যাবে।”
ফিরে এসে অনিরুদ্ধ দিদিকে জানাল শিবেনবাবুর সঙ্গে যা—যা কথা হয়েছে। শুনে অমলা বলল, ”ছেলেটাকে আমাদের বাড়িতে এনে রাখ না! নীচে তো ঘর পড়ে রয়েছে, একটা লোক বাড়লে এমন কিছু খরচও বাড়বে না।”
অমলার প্রস্তাবটা অনিরুদ্ধর মনে ধরল। সে ঠিক করল কুড়োন ফিরে এলে তাকে এই বাড়িতে থাকার কথা বলবে। সোমবার স্কুলে হাফছুটি দেওয়া হল, শোকসভাও হল। মাস্টারমশাইদের অনেকেই রাখাল সম্পর্কে দু—চার কথা বললেন। কুড়োন মুখাগ্নি করে রবিবার রাতেই ফিরে এসেছিল। শোকসভায় সে ঘরভর্তি ছাত্রদের পেছনে দাঁড়িয়ে পাথরের মতো মুখ করে বক্তৃতা শুনে যায়।
পরদিন সকালে কুড়োন ছেলেদের সঙ্গে চাঁদানদীর পোল পর্যন্ত ছুটে ফিরে এল একতার মাঠে। অনিরুদ্ধ লক্ষ করল অন্যান্য দিনের মতোই কুড়োন মনপ্রাণ ঢেলে শুটিং ট্র্যাপিং হেডিং করে গেল এমনভাবে, যেন ওর মরণবাঁচন নির্ভর করছে এই প্র্যাকটিসের ওপর। একসময় সে বলল, ”মামা প্ল্যান্টি মারা পেরাকটিস করব। এখন তো খুব ট্রাইবেকার হয়।”
দু’দিন আগে দাদুর মুখে আগুন দিয়ে এসেছে যে, পেনাল্টি কিক নেওয়ার কৌশল শেখার জন্য তার আগ্রহ অনিরুদ্ধের মনের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করল। তার মনে হল, এইটুকু ছেলের পক্ষে খুবই বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে এই কঠিন হয়ে ওঠাটা। অনিরুদ্ধ সাতটি ছেলেকে দিয়ে পেনাল্টি কিক নেওয়াল, প্রত্যেকে মারল পাঁচটি করে। পালা করে তিনজন গোলে দাঁড়াল। কুড়োনের তিনটে শট বারপোস্ট ঘেঁষে গোলে ঢুকল, বাকি দুটো অলুর কাঁধের পাশ দিয়ে জালে গিয়ে লাগল। পাঁচটাতে গোল পাঁচটাই। ওর মুখে ফুটে উঠল তৃপ্তির হাসি।
