স্কুলের প্রাথমিক বিভাগের ক্লাস চলছে। একঝাঁক বোলতার গুনগুনানির মতো শব্দ হয়ে চলেছে। সন্তর্পণে ফটক ঠেলে অনিরুদ্ধ ঢুকল। কিছুটা হেঁটে গিয়ে দাওয়ায় একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে এক চোখ দিয়ে লক্ষ করতে লাগল কুড়োনকে। ঠিক সেই সময় টিচার্স রুম থেকে অল্পবয়সী এক দিদিমণি বেরোলেন। একটি অচেনা লোককে থামের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে প্রায় চোরের মতো তাকাতে দেখে তাঁর চোখ কুঁচকে উঠল।
”কে আপনি? এখানে কী করছেন?”
অনিরুদ্ধ থতমত হয়ে বলল, ”ওকে দেখছি।” আঙুল দিয়ে সে দূরে বসা কুড়োনকে দেখিয়ে বলল, ”ওকে চেনেন?”
কুড়োনের দিকে না তাকিয়ে দিদিমণি বললেন, ”কুড়োন, আমরা সবাই ওকে চিনি।”
”ও কী করছে বলুন তো ওখানে বসে?”
”লেখাপড়া করছে।”
কেউ যদি এখন অনিরুদ্ধকে বলে শতাব্দীর সেরা ভারতীয় গোলকিপার তুমি, তা হলে সে এতটা চমকে উঠবে না যতটা চমকাল এখন। কুড়োন এবং লেখাপড়া! সে দুটোকে মেলাতে না পেরে বলল, ”ওখানে বসে কেন?”
”ক্লাসে ছোটদের সঙ্গে বসতে লজ্জা করে বলে বাইরে বসে।”
”ওটা কোন ক্লাস?”
”ক্লাস টু, তবে সামনের মাসেই ওর পরীক্ষা নিয়ে ক্লাস থ্রি—তে তুলে দেওয়া হবে।” দিদিমণির স্বরে চাপা কৌতুক আর গর্ব। ”দারুণ মাথা আর পরিশ্রম করে।”
”এভাবে ইচেছমতো পরীক্ষা নিয়ে কাউকে ক্লাসে তুলে দেওয়া যায়?” অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে জানতে চাইল।
”যে ছেলে ক্লাস থ্রি—র যোগ্য, ক্লাস টু—য়ে অযথা তাকে একটা বছর আটকে রেখে লাভ কী? ও তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাক, এটাই আমরা চাই।” দিদিমণি চটি ফটফটিয়ে একটা ঘরে ঢুকে গেলেন।
এইসময় টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে এসে রাখাল পিরিয়ড শেষ হওয়া জানান দিতে তারে ঝোলানো ঘড়িতে কাঠের হাতুড়ি দিয়ে একটা ঘা দিল। অনিরুদ্ধ চটপট স্কুল থেকে বেরিয়ে এল। কুড়োন কেন যে ”মামা বাজে কয়টা?”—জিজ্ঞেস করত, সেই রহস্যটা এখন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। যে ছেলে চোদ্দ গজ দূর থেকে টিভি—তে খেলা দেখার জন্য গাছে উঠতে পারে, তার পক্ষে ঘরের দরজায় বসে ব্ল্যাকবোর্ড দেখা বা দিদিমণিদের কথা শোনা তো অতি সামান্য ব্যাপার।
বাড়ি ফিরে অনিরুদ্ধ দিদিকে কুড়োনের লেখাপড়া শেখার অভিনব পদ্ধতির বিবরণ দিয়ে বলল, ”আমার মনে হয় যেদিন হেডমাস্টারমশাই ট্রেনিংয়ের জন্য কুড়িজনের নাম বললেন তাতে কুড়োনের নাম ছিল না। ও পরে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কেন তার নাম নেই, অলু ওকে বলে এটা শুধু স্কুলের ছাত্রদের জন্য তাই তোর নাম নেই। ও বলে আমাকে ছাত্র করে নিন। অলু বলে তুই অ আ ক খ—ই তো জানিস না, ছাত্র হবি কী করে? তাইতে কুড়োন ওর ট্রেডমার্ক উত্তর দিয়েছিল— পেরাকটিস করলাই শিখা লওয়া যায়।
”দিদি, আমার মনে হয় সেই মুহূর্তেই কুড়োন ঠিক করে ছাত্র হবে। নিজের ওপর কী অগাধ বিশ্বাস—প্র্যাকটিস করলেই শিখে নেওয়া যায়। আর সত্যি সত্যিই শিখে নিল! ঠিকমতো শুরু করলে এখন তো ওর অলুর সঙ্গে পড়ার কথা। অবশ্য ওয়ান, টু—র পড়া যদিও সামান্য তা হলেও এই ক’ মাসেই হজম করে এখন থ্রি—তে উঠতে যাচ্ছে। অবাক করার মতো নয়? তার মানে কী প্রচণ্ড খেটেছে ভাবো! মনে হয় কেউ ওকে নিশ্চয় হেলপ করেছে।”
অফিস থেকে ফিরে সকালে চোখ বুলিয়ে যাওয়া খবরের কাগজটা ভাল করে পড়ে অনিরুদ্ধ (অলু পড়ছে তাই সে টিভি চালায় না)। বাড়ি থেকে সন্ধ্যায় বেরোল, উদ্দেশ্য, রাখালের কাছ থেকে কুড়োনের খবর নেওয়া। চৌকিতে শুয়েছিল রাখাল, উঠে বসল অনিরুদ্ধকে দেখে। কোনও ভূমিকা না করে সে জিজ্ঞেস করল, ”কুড়োনকে পড়ায় কে রাখালদা?”
প্রশ্নটা ঠিকমতো বুঝতে পারল না রাখাল। বলল ”পড়ায় কে মানে?”
”কুড়োন সকালে প্রাইমারি স্কুলে পড়ছে এটা তুমি জানো। ওকে তুমিই ভর্তি করিয়েছ, তাই তো?”
”না। আমি করাইনি, প্রথমে আমি তো জানতামই না।”
”তা হলে ও ভর্তি হল কী করে?”
”ভবা অরে ভর্তি করাইছে।”
অনিরুদ্ধর ভ্রূ কুঁচকে উঠল। ঘরে চোখ বুলিয়ে তার চোখে পড়ল মুকুল গণিত, কিশলয় নামে দুটো বই আর দু—তিনটে খাতা টিনের একটা বাক্সের ওপর। অঙ্কের বইটা তুলে নিয়ে খুলে দেখল কে এক অভিজিৎ ঘোষালের নাম লেখা, বইটা পুরনো।
”ভবাই অরে পড়ায়। অর দেশের বাড়ি তো আমাদের গেরামের কাছেই লাইরিপুরে। তালদির হস্টেলে থেইকে মাধ্যমিক পাশ করেছে। অর কথাবার্তার ধরন দেখে বোঝো না লেখাপড়া করা ছেলে, কুড়োনরে ভাইয়ের মতো দেখে। পাইমারির বড়দিরে বলে অই তো কুড়োনরে ভর্তি করাইছে, অই তো পুরানা বই জোগাড় করে দেছে। কুড়োন রোজ সন্ধ্যায় অর কাছে পড়তি যায়, ঘরে এসে অনেক রাইত অবদি পড়ে, দুপুরেও পড়ে। খাতাকলমও ভবা দিচ্ছে।”
অনিরুদ্ধ আর কোনও প্রশ্ন না করে অন্য প্রসঙ্গে এল। ”তোমার বুকের ব্যথাটা এখন কেমন, আর অজ্ঞান—টজ্ঞান হওনি তো? ওষুধ ঠিকমতো খাচ্ছ?”
”ব্যথা তো লাগে নিচু হয়া কিছু তুললে, জোরে হাঁটলি ব্যথা হয়, হাঁপ ধরে। ওষুদ খাওয়া কি সোজা কথা! ডাক্তারবাবু যা লিখা দেছে তাতে তো মাসে দুইশো টাকা করে পড়ে। অত টাকা পাব কোথা? মাসে তাই অর্ধেক দিন খাই।” রাখাল করুণ চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। অনিরুদ্ধের বন্ধু তরুণ হাসপাতালে রাখালের ইলেকট্রো কার্ডিওগ্রাম করিয়েছিল। পরে অনিরুদ্ধ তরুণের কাছে জেনে নিয়েছিল, ধমনী দিয়ে হৃৎপিণ্ডে রক্ত পৌঁছচ্ছে খুবই কম। ফলে রাখালের হার্ট দুর্বল হয়ে গেছে। বেশি পরিশ্রম যেন না করে। ওষুধ ওকে নিয়মিত আজীবন খেয়ে যেতে হবে।
