রেফারির কানের পাশটা ফুলে ওঠায় বরফ ঘষা হল, শিবেনবাবু তাঁকে অনুরোধ করলেন পেনাল্টি সিদ্ধান্ত থেকে তিনি যেন সরে না আসেন। অলুকে বললেন গোলে গিয়ে দাঁড়াতে। মাঠের মধ্য থেকে লোকজন বেরিয়ে যেতে চাঁদপানা হাই স্কুলের ব্যাক পেনাল্টি শট নিয়ে গোল দেয়।
শিমুলহাটি ফেরার বাসে সামনের দিকে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিবেনবাবু। পেছনের দিকে ছিল কুড়োন এবং সাত—আটজন ছেলে। কেউই বসার জায়গা পায়নি। বাকি ছেলেরা কাছাকাছি থাকে, তাই বাসে ওঠেনি, হেঁটেই বাড়ি যাবে। বাসে সারাক্ষণ বকবক করে কুড়োন।
”ওটা কিছুতেই প্লান্টি ছিল না, দেবু তো ইচ্ছা করে বল আটকায় নাই, তাইলে কোন আইনে প্লান্টি দিল? এই দেবু কসনা তুই কি ইচ্ছা কইরা বলে হাত দিছিস?”
দেবু জবাব না দিয়ে ফিকে হাসল, শিবেনবাবু কুড়োনকে দেখার চেষ্টা করে ভিড়ের জন্য দেখতে পেলেন না।
কুড়োন কথা বলেই চলেছে। ”রেফারিটা ওইখানকার, চাঁদপানায় বাড়ি। নিঘঘাৎ ঘুস খাইছে।”
শিবেনবাবু গম্ভীর স্বরে ধমকে উঠলেন, ”কুড়োন এবার চুপ কর।”
এর পর আর কুড়োনের গলা শোনা যায়নি। বাস থেকে নেমে ছেলেরা যে যার বাড়ির দিকে রওনা হয়ে যায়, কুড়োন থলি—পিঠে শিবেনবাবুকে এড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে স্কুলের দিকে।
”কুড়োন শোন।” থমথমে মুখে শিবেনবাবু ডাকলেন। কুড়োন কাছে এল। ”এবার থেকে স্কুলের খেলা থাকলে তুই সঙ্গে যাবি না। রেফারিকে মারলি কেন? তোর ভাগ্যি ভাল কেউ তোকে গ্লাস দিয়ে মারতে দেখেনি, দেখলে গোটা টিম ওখানে মার খেত, আমিও খেতুম। ছি ছি ছি, স্কুলের বদনাম তো হতই, আমাদের টিমের সঙ্গেও আর কেউ খেলতে চাইত না, শুধু তোর জন্য।”
রাগে কাঁপছিলেন শিবেনবাবু। কুড়োন হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে।
”এরকম একটা অসভ্য ছেলে টিমের সঙ্গে থাকলে সেই টিম কখনও সুনাম পায় না। কেন মারলি রেফারিকে?”
কুড়োন চোখ নামিয়ে নিচুস্বরে বলল, ”আমরা হাইরে যাব ভাবতেই মাথাটা কেমন যেন গরম হইয়ে গেল।”
”রেফারিকে মারলে কি জিতে যেতুম?”
কুড়োন চুপ রইল। শিবেনবাবু কয়েক সেকেন্ড উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে বললেন, ”যা বললাম, আর কখনও টিমের সঙ্গে যাবি না।”
কুড়োনের রেফারিকে মারার কথা শিবেনবাবু কাউকে বলেননি, এমনকী অনিরুদ্ধকেও নয়। শুধু ভবতোষকে বলেছেন, ”এবার থেকে তুমি যাবে খেলার থলিটা নিয়ে।”
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা সাবডিভিশনাল স্কুল ফুটবল চ্যাম্পিয়ানশিপে স্বরূপানন্দ স্কুল খেলার জন্য নাম দেবে কিনা শিবেনবাবু জানতে চাইলেন অনিরুদ্ধর কাছে। সকালে ট্রেনিংয়ের পর ওরা বাড়ি ফিরছিল।
অনিরুদ্ধ বলল, ”না সার, স্বরূপানন্দ এখনও চ্যাম্পিয়ানশিপ খেলার মতো তৈরি হয়নি। যে তিনটে ফ্রেন্ডলি খেলল তারা খুব ভাল টিম নয়, আমরা একটামাত্র ম্যাচ জিতেছি, তাও অফসাইড থেকে উইনিং গোলটা দেয় শুভেন্দু। জেলায় অনেক স্কুলটিম আছে যারা আমাদের গোলের মালা পরিয়ে দিতে পারে। সমস্যাটা কী জানেন সার, অনেক স্কুল বাইরের ছেলে খেলায় যাদের বয়স অন্তত কুড়ি বছরের ওপর।”
শিবেনবাবু কৌতূহলী হলেন, ”কীভাবে খেলায়? বাইরের ছেলে মানে তো ছাত্র নয়!”
”হ্যাঁ, ছাত্র নয়। কিন্তু স্কুলের খাতায় ছাত্র হিসাবে নাম লেখানো আছে। থাকে হয়তো স্কুল থেকে দশ—পনেরো মাইল দূরে, কোনওদিন স্কুলেও আসে না কিন্তু খেলে স্কুলের হয়ে। এরা একটু বেশি বয়সীই হয়। এদের সঙ্গে যথার্থ ঠিক বয়সীরা পেরে উঠবে কী করে! তাই বলছিলুম প্রথমেই ধাক্কা খেয়ে বিশ্রী একটা অভিজ্ঞতা পেলে সেটার ফল ভাল নাও হতে পারে, বরং আর একটু তৈরি হয়ে মাঠে নামুক, আরও দু—চারটে ফ্রেন্ডলি খেলুক।”
”আমারও মনে হয়েছে ছেলেরা কাঁচা রয়েছে। তবে জলে ঠেলে না দিলে সাঁতারটা শিখবে কেমন করে, ভয়টা তো প্রথমে ভাঙানো চাই। এই দ্যাখো না কুড়োনকে, ভয়ডর বা জড়তা বলে কিছু নেই, অপোনেন্ট যেই হোক তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেব, সবসময় ওর এই মনোভাব। এটা একদিক দিয়ে ভাল।”
”ভাল কথা সার, কুড়োন কিন্তু বেশ কিছুদিন সকালে ট্রেনিংয়ে আসছে না! খেলাপাগল ছেলে, কখনও তো কামাই করেনি। অসুখবিসুখ করল কিনা… খোঁজ নিতে হবে।” অনিরুদ্ধকে চিন্তিত দেখাল।
বাড়ি ফেরার জন্য স্কুলের ফটকের সামনে দিয়ে অনিরুদ্ধকে আসতে হয়। প্রতিবারই সে ফটকের গরাদের ফাঁক দিয়ে স্কুল—মাঠটা দেখার জন্য দাঁড়ায়। দেবেন গায়েনের কথাটা এখন মনে পড়ে।—’মাঠটাকে আমি ইডেনের মাঠ করে ছাড়ব।’ মিথ্যে জাঁক করেনি দেবেন গায়েন, সবুজ মখমল যেন বিছিয়ে রাখা হয়েছে। বাড়ির বারান্দা থেকে অনিরুদ্ধ অনেকদিন শুনেছে কেউ মাঠের ধার দিয়ে হাঁটলেও রাখাল চিৎকার করে, ”হেই গোরু মাঠে নামছিস ক্যান, ঘাস খাবি বলে?” বুট পরে ছোটাছুটির ধকল নেওয়ার মতো জোর ঘাসগুলোর এখনও হয়নি, গোড়াগুলো আরও একটু চেপে বসা দরকার।
অনিরুদ্ধ মুগ্ধ হয়ে মাঠটা দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ল স্কুলের টানা দাওয়ায় একটা ক্লাসঘরের বাইরে দরজার পাশে কুড়োন বসে। হাতে খাতা আর ডটপেন, পাশে একটা কী দুটো বই। মাথাটা ঝুঁকিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ক্লাসঘরের ভেতরে তাকিয়ে খাতায় কী যেন লিখল। তারপর দেয়ালে ঠেস দিয়ে আঙুলের কর গুনে বিড়বিড় করে আবার খাতায় লিখে ঝুঁকে ক্লাসঘরের মধ্যে কিছু একটা দেখল আর মুখে হাসি ফুটল।
