অনিরুদ্ধ চলে যাওয়া রিকশার দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল হারুদার কথাগুলো।
বাদামতলায় কুড়োন বিব্রত মুখে শিল্ডটা মাথার ওপর তুলে ধরে, ক্যামেরার চোখ তার মুখের দিকে তাকিয়ে, কপিল ঘোষ বলে যাচ্ছে, ”বার করো, চোখ দিয়ে জল বার করো। আহহ, এই সামান্য কাজটা তুমি করতে পারছ না।”
ক্যামেরাম্যান বলল, ”কপিলদা, চোখে গ্লিসারিন দিয়ে জল বার করান।”
”গ্লিসারিন দরকার হবে জানলে সঙ্গে করে আনতুম, এখন কোথায় পাই।” কপিল অসহায়ভাবে এপাশ—ওপাশ তাকিয়ে অনিরুদ্ধকে এগিয়ে আসতে দেখে ব্যস্ত হয়ে বলল, ”এই যে মশাই, আপনার চেলার চোখ দিয়ে জল বার করান তো, জল আমার চাই। এই চোখের জলের মধ্য দিয়ে নায়কের দুঃখকষ্টের ছেলেবেলাটা বেরিয়ে আসবে দর্শকদের চোখের সামনে।”
অনিরুদ্ধ তাকাল কুড়োনের মুখের দিকে। তার মনে হল, ওর দ্বারা কান্না এখন সম্ভব নয়। তবু কপিল ঘোষকে খুশি করার জন্য বলল, ”কুড়োন পারবি না? দ্যাখ না চেষ্টা করে! মনে—মনে কষ্টের কথা দুঃখের কথা ভাবতে থাক।” এর পর সে কপিল ঘোষকে বলল হালকা অনুযোগের সুরে, ”আপনাকেও বলিহারি যাই, যে কাজটা অভিনেতার করার কথা সেটা কিনা একটা ফুটবলারকে করতে বলছেন? এইটুকু ছেলের পক্ষে কি বলামাত্র চোখের জল বার করা সম্ভব? দুঃখকষ্ট বোঝাতে হয়তো অন্যভাবে করে দেখান।”
আমতা আমতা করে কপিল ঘোষ বলল, ”ঠিক আছে, পরে ওকে স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে গ্লিসারিন দিয়ে টেক করব।” কুড়োনকে আর স্টুডিও নিয়ে যাওয়া হয়নি, কেননা গল্পটার ধাঁচ এর পর বদলে ফেলা হয়। বাতিল হয়ে যায় চোখের জল।
দলবল নিয়ে কপিল ঘোষ চলে যাওয়ার পর অনিরুদ্ধ আর কুড়োন বাড়ির পথ ধরল।
”হ্যাঁ রে কুড়োন, তুই কখনও কেঁদেছিস?”
প্রশ্নটা তাকে অবাক করলেও জবাব দিল সঙ্গে সঙ্গে। ”না মামা কেঁদেছি বলে তো মনে পড়ে না।”
”বাবা মারা যেতে, মা মারা যেতে, দাদু মারা যেতে কাঁদিসনি?”
”আরে তখন তো আমি অ্যাত্তোটুকু, মরা কী জিনিস তাই আমি বুঝি না, কান্না আসবে কী করে।”
”এখন বুঝিস?”
”না। এখন তো কেউ মরে নাই, মরলে বুঝতে পারব।”
অনিরুদ্ধ এবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৌতূহল চাপতে না পেরে বলে ফেলল, ”ধর তোর বড়দাদু রাখাল যদি মারা যায় তা হলে কাঁদবি?”
শুনেই কুড়োন থমকে দাঁড়াল। মুখ থেকে রক্ত সরে গেছে। কথা না বলে মাথা নিচু করে অনিরুদ্ধর পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
.
সকালের ট্রেনিংয়ের মাঝে কুড়োন বহুদিনই জিজ্ঞেস করে ”মামা বাজে কয়টা?” অনিরুদ্ধ ঘড়ি দেখে যদি বলে ”পৌনে সাতটা”, কুড়োন তখন বলে, ”অহন চলি, দরকার আছে।”
ব্যাপার কী? অনিরুদ্ধ একদিন জিজ্ঞেস করেও ফেলল, ”তুই রোজ রোজ সাতটার আগেই চলে যাস কেন রে? কী এমন দরকার?”
কুড়োন সপ্রতিভভাবে জবাব দেয়, ”ঘরে গিয়া উনান ধরাতে হয়। ডাক্তার কইছে, ঠিক সাড়ে সাতটায় গরমজল দিয়া দাদুরে চান করাতে হবে। তাইতে বুক ভাল থাকবে।”
বুক ভাল থাকার এমন দাওয়াইয়ের কথা অনিরুদ্ধ জীবনে শোনেনি। লোকে কত কী যে বিশ্বাস করে এটাও হয়তো তাই, এই ভেবে সে কুড়োনকে আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
স্কুলের জন্য একটা ফুটবল টিম মোটামুটি দাঁড় করানো গেছে। এবার টিমটাকে পরীক্ষা করা দরকার। তিনটি রবিবারে স্বরূপানন্দ স্কুল তিনটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলল দুটি ক্লাব ও একটি স্কুলের সঙ্গে। খেলাগুলি হল দু—তিন মাইলের মধ্যে। দলের সঙ্গে গেছল অনিরুদ্ধ এবং একটি খেলায় যান শিবেনবাবুও। কুড়োনকে দলে রাখা হয়নি যেহেতু সে স্কুলছাত্র নয়, তবে দলের সঙ্গে সে গেছে। বহু বছর আগে রাখাল যে কাজটা করত, সেই খেলার বল, বালতি, গ্লাস, মেডিক্যাল বক্স ইত্যাদি বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ কুড়োন যেচে নিয়েছিল। ছেলেরা বাড়ি থেকে ড্রেস করে বেরোত। ওদের সঙ্গেই সে সবুজ গেঞ্জিটা পরে থলিটা পিঠে ঝুলিয়ে বাসে উঠত।
নলপুকুর সবুজসাথীর সঙ্গে ম্যাচটায় তারা দু’ গোলে হারে, কলাইখোলা প্রগতি সঙ্ঘকে তিন—দুই গোলে হারায়, শুধু চাঁদপানা হাই স্কুলের সঙ্গে খেলাটি শেষ মিনিটে ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় দাঁড়ায় একটা পেনাল্টিকে কেন্দ্র করে। ম্যাচ তখন প্রায় শেষ মিনিটে, কোনও গোল হয়নি। বল দুই প্রান্তে দ্রুত যাতায়াত করছে, যে—কোনও সময় যে—কোনও দল গোল খেয়ে যেতে পারে। উত্তেজনায় মাঠভরা দর্শকরা ফুটছে। এমন সময় স্বরূপানন্দর বিরুদ্ধে পেনাল্টি।
পেনাল্টি এরিয়ার মধ্যে বলে দুই পক্ষের খেলোয়াড়রা এলোমেলো শট নিতে নিতে চাঁদপানার একজন গোলে দ্রুত জোরে শট নেয়, দেবু ছিল পোস্ট ঘেঁষে গোললাইনে দাঁড়িয়ে, পা বাড়িয়ে বলটা আটকাতে গিয়ে বল তার কনুইয়ে লেগে ছিটকে গোললাইনের বাইরে যায়। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে বাঁশি বাজিয়ে পেনাল্টি স্পটের দিকে আঙুল দেখান।
শুরু হয়ে যায় তুলকালাম হট্টগোল। কিছু লোক মাঠে নেমে পড়ে রেফারিকে ঘিরে বলতে থাকে, ‘হ্যান্ডবলটা ইচ্ছে করে করেনি, এটা পেনাল্টি নয়।’ আর—এক দলের দাবি, রেফারি ঠিক কাজ করেছেন। কুড়োন তখন উন্মাদের মতো একটা প্লাস্টিকের গ্লাস হাতে ছুটে গেছল। ভিড়ের মধ্যে গ্লাসটা দিয়ে সে রেফারির কানের পাশে বেশ জোরেই মারে, রেফারি কান চেপে ধরে বসে পড়েন। ঘিরে ধরা জনতা থতমত হয়ে পিছিয়ে আসে। তারা ভাবেনি কেউ রেফারিকে মারবে। সেই ফাঁকে কুড়োন ভিড়ের মধ্য দিয়ে ঠেলেঠুলে বেরিয়ে আসে। কেউ তাকে লক্ষ না করলেও শিবেনবাবুর নজর সে এড়াতে পারেনি।
