একটা ভাল নাটক যেমন ধাপে ধাপে উত্তেজনার চুড়োয় ওঠে, কুড়োন মাঠে নামার পর থেকেই খেলাটা নাটকীয় ভাবে জমে উঠল। দীপকের সঙ্গে অনিরুদ্ধও মাঠে ছুটে এসেছে। অনিরুদ্ধ কুড়োনের পেটে মালিশ করতে করতে শুনল দীপক দাঁত কিড়মিড় করে দেবুকে বলছে, ”ফের যদি এইসব করিস তা হলে লাথি মেরে কালীতলা থেকে বার করে দেব। সারাজীবন তপস্যা করেও ওর মতো তো খেলতে পারবি না।” তারপর উদ্বেগ নিয়ে দীপক তাকাল কুড়োনের দিকে। ”খুব লেগেছে? আর একটা, যেমন করে হোক আর একটা, পারবি না?”
কুড়োন গেঞ্জিটা প্যান্টের মধ্যে গুঁজতে গুঁজতে বলল, ”হ। পারব।”
কুড়োনের ‘পারব’ যে কী ব্যাপার সেটা ম্যাচের শেষ মিনিটে দেখা গেল। তার আগে কপিল ঘোষ মরিয়ার মতো অনিরুদ্ধর মুখের কাছে হাত নেড়ে বলল, ”হ্যাঁ মশাই খুব তো টাকা খরচ করিয়ে দিলেন, ম্যাচটা এবার জিতুন।”
অনিরুদ্ধ মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল, ”এবার দেখুন ওদিকে।”
মাঝমাঠে কুড়োন একজনকে কাটিয়ে আর একজনকে টলিয়ে দিয়ে জমিতে ফেলে, তৃতীয়জনকে পেছনে রেখে শুভেন্দুর সামনে পৌঁছে গেছে। দু’ হাত পাশে ছড়িয়ে কুঁজো হয়ে শুভেন্দু পা চালাল কুড়োনের গোড়ালি লক্ষ্য করে। চকিতে পা সরিয়ে কুড়োন বল নিয়ে শুভেন্দুর পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। দেবু তেড়ে এল। কুড়োন শরীরটা ডাইনে—বাঁয়ে করে দেবুর দু’ পায়ের ফাঁক দিয়ে বল গলিয়ে ওর পাশ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে আবার বলটা ধরল।
এবার শুভেন্দু যোগ দিল দেবুর সঙ্গে। কুড়োন সাহায্যকারীর আশায় দু’ ধারে তাকাল। সাত—আট গজ দূরে বাদল।
কবজি তুলে ঘড়ি দেখে দীপক অধৈর্য হয়ে অনিরুদ্ধকে বলল, ”কুড়োনটা করছে কী! আর তো তিরিশ পঁয়ত্রিশ সেকেন্ড বাকি।”
”শোধ না নিয়ে ছাড়বে না।” অনুত্তেজিত গলায় বলল অনিরুদ্ধ।
বলটা বাদলের দিকে ঠেলেই কুড়োন দু’জনের মাঝ দিয়ে তিরবেগে ছুটে গেল। বাদল না থামিয়েই পাসটা সামনে বাড়িয়ে দিল। চলন্ত বলেই কুড়োন দ্বিতীয় গোলটার মতো শট নিল। অলু পায়ের ওপর ঝাঁপাবার জন্য এগিয়ে এসেছিল। শটটা তার মাথার উপর দিয়ে জালে আটকাল। গোলের বাঁশি বাজিয়ে রেফারি খেলা সমাপ্তির বাঁশিও বাজালেন।
”উফফফ, বুকে হাত দিয়ে দেখুন এখনও ধুকপুক করছে।” কপিল ঘোষ অনিরুদ্ধর হাতটা টেনে নিয়ে বুকে রাখল।
”আপনি যা চেয়েছিলেন তা পেয়েছেন তো?”
কপিল ঘোষ শুধু একগাল হাসল। খেলোয়াড়রা বেরিয়ে আসছে। জনতা স্বতস্ফূর্তভাবে কুড়োনকে কাঁধে তুলে নিয়েছে। ক্যামেরা ছবি তুলছে। মানুষজন ছুটে যাচ্ছে ট্রফি রাখা টেবলের দিকে।
বিজয়ী আর বিজিত দলের অধিনায়কদের হাতে শিল্ড ও কাপ তুলে দেওয়ার পর দেবেন গায়েন যখন ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় কুড়োন মণ্ডলের নাম ঘোষণা করল তখন তুমুল হাততালি পড়ল।
কপিল ঘোষ অনিরুদ্ধকে কানে কানে বলল, ”কাপটা মাথার ওপর যখন তুলে ধরবে তখন যেন চোখ দিয়ে জল গড়ায়, এটা তো ওর জীবনের প্রথম প্রাইজ পাওয়া। যান যান, বলুন গিয়ে।”
ভিড় ঠেলে অনিরুদ্ধ যাওয়ার আগেই কুড়োনের হাতে কাপ এবং সেটি সে মাথার ওপর তুলে সবক’টি দাঁত বার করে হাসছে।
”চোখের জলের শটটা নেওয়া হল না। ঠিক আছে, লোকজন চলে গেলে পরে নিয়ে নিচ্ছি।”
কপিল ঘোষ নাছোড়বান্দা, চোখের জল তার চাইই। গল্পে আছে প্রথমবার হাতে ট্রফি পেয়ে বাচ্চচা নায়কের মনে পড়বে তার মৃত ফুটবল গুরুর কথা আর তখনই গাল বেয়ে নেমে আসবে চোখের জল। কিন্তু এই কুড়োন ছেলেটা চোখের জল বার করার বদলে কিনা দাঁত বার করল!
দেবেন গায়েন হাতছানি দিয়ে অনিরুদ্ধকে ডাকল, ”আমার তো একটা বক্তৃতা থাকা দরকার, নয়তো অনুষ্ঠানটা সর্বাঙ্গসুন্দর হবে না, কী বলো?”
অনিরুদ্ধ দেখল ট্রফি বিতরণ শেষ হতেই লোকজনেরা মাঠ ফাঁকা করে চলে যাচ্ছে। মাচা থেকে ক্যামেরাম্যান শেষবারের মতো ঘরে ফেরা দর্শকদের শট নিচ্ছে। একদল ছেলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দু’হাত তুলে নাচানাচি করে স্লোগান দিচ্ছে, ”জিতল কে…শিমুলহাটি আবার কে।” ”সেরা প্লেয়ার হল কে…কুড়োন মণ্ডল আবার কে।”
অনিরুদ্ধ চারধার দেখে দেবেন গায়েনকে বলল, ”প্রাইজ দেওয়ার আগে বক্তৃতা দিলে শোনার লোক পাওয়া যেত, এখন তো শোনার লোক বিশেষ নেই।”
দেবেন গায়েনও চারদিক দেখে বলল, ”তা হলে বক্তৃতা থাক। আচ্ছা অনিরুদ্ধ, তোমার ওই ডিরেক্টর বাদাম গাছটার নীচে কুড়োনের সঙ্গে কী কথা বলছে, সঙ্গে ক্যামেরাম্যানও রয়েছে! আলাদা ছবি টবি তুলছে নাকি?”
শিবেনবাবু আগাগোড়া চুপচাপ ছিলেন, এইবার মন্তব্য করলেন, ”প্রথমে ম্যাচটা সাজানো ছিল, পরে কিন্তু সত্যিকারের হয়ে গেল।”
হারাধন দত্ত লাঠি হাতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ”অনি, যাওয়ার ব্যবস্থা কর।”
”করাই আছে হারুদা।” অনিরুদ্ধ হাতছানি দিয়ে অপেক্ষমাণ সাইকেল রিকশাটাকে কাছে আসতে বলল। তিনি রিকশায় উঠে বসতে প্রণাম করে অনিরুদ্ধ বলল, ”কেমন দেখলেন ছেলেটাকে?”
”তোকে আমি এই ছোট জায়গায় আটকে না রেখে ছেড়ে দিয়েছিলুম, না দিলে তুই বাড়তে পারতিস না। এই ছেলেটাকে এবার ছেড়ে দে, আরও কঠিন জায়গায় গিয়ে ও নিজেকে তুলে ধরুক। শুধু স্কিল দিয়েই বড় হওয়া যায় না, আরও অনেক কিছু জানতে বুঝতে শিখতে হয়।” হারাধন দত্ত থেমে থেমে কথা বলে রিকশাওলাকে তাড়া দিলেন, ”চল রে।”
