সোফায় বসে দেবেন গায়েনের দু’পাশে শিবেনবাবু আর বৃদ্ধ হারাধন দত্ত। ক্যামেরা ঘাড়ে নিয়ে মাঠের মধ্যে একজন, আর একজন তিনপায়া স্ট্যান্ডে ক্যামেরা বসিয়ে গোলের পেছনের মাচায়। টস করে কিক—অফ হল। মাঠের মধ্যে যে ক্যামেরাম্যান ছিল সে এইবার মাঠের ধারে সরে এসে ছবি তুলতে লাগল। মাচার লোকটিও ক্যামেরা চালিয়ে দিল। দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল বল, চারটে ফাউলও হয়ে গেল এবং প্ল্যানমতো লাল গেঞ্জির দেবু পাঁচ মিনেটেই প্রথম গোলটা তিরিশ গজের উঁচু শটে দিয়ে দিল। গোলকিপার মিলন বারপোস্টে হতাশায় মাথা ঠুকে কিছু দর্শকের সহানুভূতি আদায় করল। জনা চারেকের সঙ্গে দু’ হাত তুলে দেবুর হাই ফাইভ করা ক্যামেরা ধরে রাখল।
দ্বিতীয় গোলটি করল শুভেন্দু পেনাল্টি থেকে। ব্যাক খেলছে যে দু’ হাত দিয়ে বলটা মাথার ওপর ধরে নেয়। কিক নেওয়ার আগে চোখের ইশারায় সে দেখায় ডান দিকে মারব। মিলন বাঁ দিকে ঝাঁপাল। দু’গোলে কলকাতার টিম এগিয়ে যেতে মাঠ জুড়ে উত্তেজনা। বিদ্রূপ আর ধিক্কার বর্ষণ শুরু হল শিমুলহাটির সবুজ গেঞ্জির ওপর।
”পাবলিক রিঅ্যাকশনটা দারুণ হচ্ছে। আমরা কথাবার্তা রেকর্ড করছি।” কপিল ঘোষ পাশে দাঁড়ানো অনিরুদ্ধকে বলল।
”আরও হবে, থার্ড গোলটা খাক।” অনিরুদ্ধ ঠোঁট টিপে বলল। ”ক্লাইম্যাক্সে ধাপে ধাপে উঠতে হবে তো।”
হাফ টাইমে দু’ গোলই রইল। দীপক হাত—পা নেড়ে প্লেয়ারদের নির্দেশ দিচ্ছে, সেটা ক্যামেরা—বন্দি হল। ইতিমধ্যে দু’ দলের একজন করে ইয়োলো কার্ড দেখে ফেলেছে। খেলা আবার শুরু হল।
”কুড়োন কখন নামবে?” কপিল ঘোষ অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।
”ব্যস্ত হচ্ছেন কেন।” অনিরুদ্ধ ঠাণ্ডা গলায় বলল, ”সাধন এর পর আর একটা ইয়োলো কার্ড দেখে মাঠ থেকে বেরোবে, সবুজ গেঞ্জির একটা ছেলে কমে যাবে। সাপোর্টররা তখন হতাশ হয়ে বলবে, ‘জেতার আর কোনও চান্স নেই। অবধারিত হার।’ ওই কোণে ক্যামেরা নিয়ে এখুনি চলে যান, দেখবেন কয়েকটা ছেলে কপাল চাপড়াবে, হতাশায় মাথা নাড়বে। দেখেননি গায়করা অভিনেতারা হলে লোক রাখে হাততালি দেওয়ার জন্য? সেইরকম আর কি।” অনিরুদ্ধ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ক্যামেরাকে কোথায় যেতে হবে। কপিল ঘোষ ছুটে গেল সেই দিকে।
তৃতীয় গোলটিও করল শুভেন্দু। বলটা তুলে মেরেছিল শ্যামল, ধরার বদলে মিলন চাপড়ে ফেলল শুভেন্দুর পায়ে, সে শুধু বলটা গোলের মধ্যে ঠেলে দিল। তিন গোলে শিমুলহাটি পিছিয়ে, জেতার আর কোনও আশা নেই।
ক্যামেরা দেবেন গায়েনের মুখের সামনে, পাশে টেপ রেকর্ডার। হাতের ঘড়ি দেখে সে পাশে বসা শিবেনবাবুর দিকে ঝুঁকে বলল, ”আর তো মাত্র বারো মিনিট বাকি। আপনার কি মনে হয়ে শিমুলহাটি পারবে শিল্ড জিততে?”
শিবেনবাবু বললেন, ”দেখুন না এখনও তো বারো মিনিট বাকি রয়েছে, ফুটবলে মিরাকল তো ঘটে থাকে।”
”কাট।” কপিল ঘোষ বলে উঠল।
এর ঠিক দু’ মিনিট পর শিমুলহাটির স্ট্রাইকার বাদল মাঝমাঠে বল ধরে বুলেটসের গোল লক্ষ্য করে দৌড় শুরু করতেই তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিল নিমাই। বাদল হুমড়ি খেয়ে পড়ে একটু বেশিই ছটফটাতে লাগল। মাঠের মধ্যে ছুটে এল দীপক ও ক্যামেরাম্যান। দেখা গেল বাদলকে পাঁজাকোলা করে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হল আর তার বদলে মাঠে নামল কুড়োন।
বাদলকে ফাউল করার জন্য ফ্রিকিক পেয়েছে শিমুলহাটি। কুড়োন পেনাল্টি এলাকার ভেতরে গোল থেকে পনেরো গজ দূরে দাঁড়িয়ে, তার পাশে ও পেছনে দু’জন লাল জার্সি। অরুণের মারা ফ্রি কিকটা উঁচু হয়ে এসে পড়ছে কুড়োনের পাঁচ গজ সামনে, সে ছুটে গিয়ে পড়ন্ত বলটা বুক দিয়ে ধরেই পাশে একটু ঠেলে দিল। তারপর শরীরটা হেলিয়ে দিয়ে জমির সঙ্গে শরীরটাকে প্রায় সমান্তরাল করে বাঁ পায়ে ভলি মেরেই জমিতে পড়ে গেল। অলুর বাড়ানো হাতের আঙুল ছুঁয়ে বল গোলে ঢুকল।
মাঠের চারধারে শাবাশ জানানো শব্দ উঠল। অনিরুদ্ধ কপিলকে বলল, ”গোলটা অসাধারণ, শটটায় কী কন্ট্রোল ছিল দেখলেন? আর কী বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে গিয়ে মারল!”
কপিল ঘোষ বিজ্ঞের মতো বলল, ”এটাই তো বড় প্লেয়ারের লক্ষণ। এটা আমি দু’বার দেখাব।”
সেন্টার হল। বলটা দুটো পা ঘুরে পেয়ে গেল বাদল। কুড়োনকে সে বাড়িয়ে দিল। বলটা না থামিয়ে সে অরুণকে ঠেলে দিয়েই ফাঁকা জমিতে ছুটে গেল। অরুণ পাসটা দিল কুড়োনের চার হাত সামনে। ছুটতে ছুটতেই সে শট নিল গোল লক্ষ্য করে। বলটা কলার মতো বাঁক নিয়ে বার আর পোস্টের কোণ ছুঁয়ে গোলে ঢুকল। অলু শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
দর্শকরা এবার বুঝেছে সত্যিকারের খেলা তারা দেখছে আর সেটা বুঝে এবার নাড়া খেয়ে চিৎকার শুরু করে দিল। তিন—দুইটা যে তিন—তিন হয়ে যেতে পারে সেই আশায় তারা ”কুড়োন কুড়োন” বলে মাঠটাকে আকাশে তুলে দিল।
কুড়োন দু’ মিনিট পরই তিন—তিন করে দিল হেডে গোল দিয়ে। অরুণের কর্নার কিকটা রামধনুর মতো বেঁকে গোল এরিয়ায় নেমে আসছে। অলু বেরিয়ে এসে ধরবে কি ধরবে না ইতস্তত করল। কুড়োনের হাতটা ধরে আছে দেবু। ঝাঁকুনি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে হেড করতে লাফাল, বলটা মাথায় সবে ছুঁইয়েছে আর তখনই দেবু ওর পেটে ঘুসি মারল। দু’ হাতে পেট চেপে ধরে কুড়োন মাঠে গড়িয়ে পড়ল। ঘটনাটা দর্শকরা দেখতে পায়নি কিন্তু অনিরুদ্ধ আর দীপক ঠিকই দেখেছে।
