”হ, ঠিক কথাই তো। অলুরে চাইর গোল মারা কি সোজা কথা, আমার দ্বারা কি সম্বব।”
অনিরুদ্ধর একটা বড় সমস্যা মিটল। সে জানে দু—তিনজনকে কাটানোটা কুড়োনের কাছে জলভাত। সুতরাং আর কাউকে আলগা খেলার জন্য কিছু না বললেও হবে। কপিল ঘোষ ছবি তুলে তার দরকারমতো কাটছাঁট করে সাজিয়ে নেবে। মোদ্দা কথা, এই খেলাটার উদ্দেশ্য হচ্ছে কুড়োনের কেরামতি দেখানো।
”চল, তোরে পেরাকটিস করাই।” অলুর পিঠে ঠেলা দিল কুড়োন।
ছেলেরা গোলে বল মারা, পাসিং ট্র্যাপিং—এ ব্যস্ত ছিল। গোলকিপার গোল ছেড়ে দিল, ছেলেরা সরে এল গোলের সামনে থেকে। অলু গোলে দাঁড়াল, আঠারো গজ দূরে বল বসালো কুড়োন। জোরে শট নিল সোজা অলুকে লক্ষ্য করে, বলটা বুকের কাছে সে ধরল, দুই তালুতে আটকে রইল আঠার মতো। বলটা ফিরিয়ে দিল। কুড়োন এবার ডান পায়ে অলুর পাঁচ হাত বাঁ দিকে জমি ঘেঁষে বল মারল। অলু ঝাঁপিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল বলটা। সাফল্যে উত্তেজিত মুখে সে হাসি নিয়ে বলল, ”ঠিক করে মার।”
এবার কুড়োন ডান পায়ের পাতার বাইরে দিয়ে মারল। গোলের মাঝে দাঁড়ানো অলুর মুখের চার হাত সামনে এসে ডান দিকে বলটা বেঁকে গোলে ঢুকে গেল।
”কী হল! ধরলি না ক্যান, ঠিক কইরা মারা হয় নাই?” নিরীহ মুখে কুড়োন জিজ্ঞেস করল।
অলু মুখ লাল করে ঠোঁট কামড়ে বলল, ”আবার মার।”
সে কুঁজো হয়ে তৈরি হয়ে দাঁড়াল। এবারের শটটা একই ভাবে এল, তবে বেঁকে গেল অলুর বাঁ দিকে এবং সে অপ্রস্তুত মুখে বলের গোলে ঢোকা দেখল। এক পর কুড়োন বলটা বাঁ পায়ের পাতায় তুলে দু’বার নাচিয়ে মাথার চার হাত ওপরে তুলে দিয়েই চিৎ হয়ে মাটিতে পড়তে পড়তে বাইসাইকল কিক নিল।
বলটা ক্রসবারে লাগল, বল বারে ধাক্কা খেয়ে মাঠে ফিরে আসছে, কুড়োন স্প্রিংয়ের মতো জমি থেকে লাফিয়ে উঠে বলটাকে বুক দিয়ে থামাল। বল জমিতে পড়ার আগেই সে ভলি মারল, অলুর মাথার পাশ দিয়ে বল গোলে ঢুকল।
অনিরুদ্ধ অস্ফুটে ”শাবাশ” বলেই দৌড়ে গেল কুড়োনের কাছে, জড়িয়ে ধরে বলল, ”তুই এসব শিখলি কখন?”
”আপনি য্যামনটা দেখায়ে দিছেন সেইভাবে রোজ বিকালে পেরাকটিস কইরে গেছি দেয়ালে মাইরে মাইরে।”
”দেয়ালে মেরে কেন? মাঠে এসে তো সবার সঙ্গে প্র্যাকটিস করতে পারিস।”
”এতগুলান ছেলে, একা একা মারনের জন্যি বলই তো পাওয়া যায় না।”
”বলটা তুই পেলি কোথায়?”
”ভবাদা দেছে। মাস্টারমশায়েদের বসার ঘরে আলমারির মাথা থিকে একদিন পুরনো খাতা নামাইতে গিয়া ভবাদা বলটা পাইছিল।” কথা শেষ করেই কুড়োন ব্যস্ত হয়ে অনিরুদ্ধকে জিজ্ঞেস করল, ”মামা বাজে কয়ডা?”
ঘড়ি দেখে অনিরুদ্ধ বলল, ”পৌনে সাতটা।”
”ইঃ, লেট হইয়া গেল।” বলেই কুড়োন ছুট দিল।
অনিরুদ্ধ একটু অবাক হল ওকে এভাবে মাঠ ছেড়ে চলে যেতে দেখে। অলুকে বলল, ”গেল কোথায় বল তো? ও তো সবাই চলে গেলেও একা একা বল নিয়ে ছোটাছুটি করে!” তারপর বলল, ”কুড়োনের সঙ্গে প্র্যাকটিস করতে তোকে কেন বলেছিলাম এবার সেটা বুঝতে পারলি তো? যে গোলগুলো দিল তাতে আমারও অবস্থা তোর মতো হত, তোর লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই।”
অলু শুকনো হেসে বলল, ”আমাকে আর অভিনয় করে গোল খেতে হবে না।”
বিকেলে শিবেনবাবু ম্যাচটা কীভাবে খেলা হবে শুভেন্দু, জ্যোতিদের তা বুঝিয়ে দিলেন। শেষ দশ মিনিটে কুড়োন চারটে গোল দেবে শুনে ওরা চোখ আর ভুরু কোঁচকাল, কিন্তু অলুর মতো আপত্তি তুলল না। শুধু বলল, ”ঠিক আছে।”
শনিবার এসে গেল।
সকাল থেকে শিমুলহাটিতে সাজ—সাজ রব। উৎসাহ বেশি মেয়েদের। টিভি সিরিয়ালে যদি একঝলক নিজের মুখ দেখানো যায় এই আশায় দলে দলে বাচ্চচা—বুড়ো একতা সঙ্ঘের মাঠের দিকে রওনা হল দুপুর হতে—না—হতেই। দুটো মোটরগাড়িতে কপিল ঘোষ কয়েকজন লোক, ক্যামেরা যন্ত্রপাতি নিয়ে হাজির। তারা মাঠ আর মাচাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখল। ক্যামেরা ঘাড়ে নিয়ে বা বসিয়ে কোথা থেকে এবং কীভাবে ছবি তুলবে, নিজেদের মধ্যে কথা বলে ঠিক করতে লাগল।
টেবলে রাখা গুপ্ত ব্রাদার্সের পাঠানো দুটো ট্রফির সঙ্গে ধীরেশ্বরের দেওয়া ছোট্ট দুটো কাপও। সে নিজে থেকেই পকেটে করে এনেছে। তার পাশে রয়েছে কিছু তোয়ালে আর নাইলনের ব্যাগ। দেবেন গায়েন এগুলো নিজে বুদ্ধি করে বাজার থেকে কিনে আনিয়েছে। অনিরুদ্ধ মাথা চুলকে বলল, ”এসব তো আমার মনে ছিল না।” দেবেন মুচকি হেসে বলল, ”প্রাইজ দিতে কত জায়গায় তো যেতে হয়, দেখেছি তো!”
একতা সঙ্ঘের ক্লাবঘরে ছেলেরা ড্রেস করে মাঠে নেমে গোলে বল মারছে। তখন দেবেন গায়েন ডাকল অনিরুদ্ধকে। ”প্লেয়ারদের ইনট্রোডিউস করাবে না সভাপতির সঙ্গে?”
”নিশ্চয় করাব।” বলেই অনিরুদ্ধ ছুটে গেল কপিল ঘোষের দিকে।
মাঠের মাঝে রেফারি ও লাইন্সম্যানদের সঙ্গে খেলোয়াড়রা লাইন দিয়ে দাঁড়াল। গরদের পাঞ্জাবি আর পাট করা মটকার চাদর কাঁধে রাখা দেবেন গায়েন প্রত্যেকের সঙ্গে শেকহ্যান্ড করল ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে।
অনিরুদ্ধ ফিসফিস করে কপিল ঘোষকে বলল, ”এটা কিন্তু ভাল করে দেখাবেন।”
”হ্যাঁ, পাঁচ সেকেন্ড।”
পুরস্কারের টেবলের পাশে মাইক্রোফোন। তাতে অনিরুদ্ধর লিখে দেওয়া কাগজ দেখে বলে চলেছে ধীরেশ্বর, ”দু’ সপ্তাহব্যাপী স্বরূপানন্দ ফুটবল চ্যালেঞ্জ শিল্ড প্রতিযোগিতার আজ শেষ দিন। ফাইনালে খেলছে শিমুলহাটির বালক সঙ্ঘ—সবুজ গেঞ্জি, আর কলকাতার সেভেন বুলেটস—লাল গেঞ্জি। খেলার পর পুরস্কার বিতরণ করবেন প্রখ্যাত ক্রীড়াপ্রেমী শ্রী দেবেন গায়েন, প্রধান অতিথি অতীত দিনের বিখ্যাত গোলকিপার…।”
