জ্যোতি চাপা গলায় গজগজ করল, ”কলুর বলদের মতো রোজ মাঠে একঘেয়ে পাক দেওয়া, ভাল্লাগে না।”
ব্যায়াম করার পর অনিরুদ্ধ বল বায়ে রেখে কী ভাবে দৌড়তে হয় দেখাল। সবার থেকে ভালভাবে করে দেখাল কুড়োন। শিবেনবাবু এজন্য সবার সামনে ওকে প্রশংসা করলেন না। শুধু বললেন, ”ঠিক আছে।”
এর পর অনিরুদ্ধ বলল, ”এবার তোমাদের খেলার একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বলব—পাসিং আর রিসিভিং। তোমার টিভি—তে নিশ্চয় দেখেছ বড় বড় টিম চমৎকার মুভ করে গোলের দিকে এগোচ্ছে, খুব ভাল জায়গায় দাঁড়ানো প্লেয়ারকে বল দিল কিন্তু এমন বাজে ভাবে যে, সেই প্লেয়ার বলটার নাগাল পেল না, ফলে খেটেখুটে তৈরি করা মুভটাই মাটি হয়ে গেল। আবার উলটোভাবে, কেউ একজন দারুণ সুন্দর একটা পাস দিল, যেটা ধরে গোল করা যায়, কিন্তু পাসটা যাকে দেওয়া হল সে ভাল করে বাগে রাখতে পারল না পা থেকে বেরিয়ে গেল, ফলে একটা গোলের মোক্ষম সুযোগ নষ্ট হল। পাস দেওয়া আর নেওয়া শুনলে মনে হয় খুব সাধারণ ব্যাপার কিন্তু মোটেই তা নয়। পৃথিবীর বড় বড় প্লেয়াররা রোজ এই দুটো প্র্যাকটিস করে শান দিয়ে রাখে।” ছোটখাট বক্তৃতা দিয়ে ফেলল অনিরুদ্ধ। লক্ষ করল ছেলেরা গভীর মনোযোগে শুনল। সে একটি ছেলেকে ডেকে বলল, ”আমি পাস দিচ্ছি, তুমি পা দিয়ে ধরো। সবাই লক্ষ করো।”
এইভাবে শুরু হল স্বামী স্বরূপানন্দ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল দল গড়ার কাজ, তাদের পূর্ব গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য। অনিরুদ্ধ বাড়ি ফিরে শুনল কপিল ঘোষ ফোন করেছিল এবং ফোন নম্বর দিয়ে বলেছে ন’টার মধ্যে তাকে ফোন করতে। অনিরুদ্ধ তখনই ফোন করল। অন্যপ্রান্তে কপিল ঘোষ বলল, ”আমি রেডি, আপনি কি রেডি? মানে দুটো টিম, প্রাইজ, মাইক, সভাপতি ইত্যাদি আর কুড়োন এই সব।”
অনিরুদ্ধ বলল, ”সব ঠিক আছে, শুধু চব্বিশ ঘণ্টা আগে বলবেন।”
কপিল ঘোষ বলল, ”সামনের শনিবার দুপুরে শুটিং করব। চারদিন আগে জানালুম। গেঞ্জিগুলো তখনই নিয়ে যাব আর কুড়োনের জন্য বুটও, আপনি চিন্তা করবেন না। কুড়োনের একটা—দুটো ডায়লগ থাকবে, বলতে পারবে তো?”
”হ। পারবে।”
”হ, মানে?” কপিল ঘোষ থমকে গেল।
”হ, মানে হ্যাঁ, এটাই কুড়োনের ডায়লগ।”
টিভি সিরিয়ালের জন্য দুটো টিম করার মতো চোদ্দটা ছেলে স্কুল থেকে পাওয়া যাবে না অনিরুদ্ধ সেটা বুঝে গেছে। তাকে কালীতলা স্পোর্টিংয়ের কাছ থেকে কয়েকজন ফুটবলার চাইতেই হবে। সকালে সে কালীতলার মাঠে গিয়ে দীপকের সঙ্গে দেখা করে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল।
”দিপুদা, এটা স্কুলকে সাহায্য করার জন্য বলছি।”
”অবশ্যই সাহায্য করব।” দীপক উদার ভঙ্গিতে দু’হাত ছড়িয়ে বলল। সে জানে টিভি মানে তার ট্রেনিং সেন্টারের বিরাট পাবলিসিটি, আরও ছেলে পাওয়া যাবে। তার মানে আরও টাকা। ”তুই চোদ্দটা ছেলেই আমার এখান থেকে নিতে পারিস।”
”না, না, তার দরকার হবে না। এটা তো একটা সাজানো ম্যাচ টিভি শুটিংয়ের জন্য খেলা হবে। তুমি বরং হোম টিমের কোচ হও।” দীপকের মুখ দেখে অনিরুদ্ধ বুঝল খুশি হয়েছে।
”হ্যাঁ রে অনি, তোদের কোচিং তো শুধু স্কুলের ছেলেদের জন্য, তা হলে ওই কুড়োন ছেলেটা কী করে কোচিং নিচ্ছে?”
”ওটা হেডমাস্টারমশাইয়ের নিজস্ব ব্যাপার, স্কুল কর্মচারীর নাতি বলে কুড়োনকে উনি ছাত্রদের সঙ্গে রেখেছেন।”
এর পর অনিরুদ্ধ দেখা করল দেবেন গায়েনের সঙ্গে। মাঠে গণ্যমান্যদের বসার জন্য বাড়ি থেকে তিনি সোফা পাঠাবেন এবং দর্শক জড়ো করার জন্য সাইকেল রিকশায় মাইক দিয়ে প্রচার চালাবেন বলে কথা দিলেন এবং মনে করিয়ে দিলেন ক্যামেরা বসাবার জন্য মাঠের দু’ ধারে আর গোলপোস্টের পেছনে মাচা তৈরি করা দরকার। ইটাখালি স্কুলে পড়ান সি আর এ রেফারি হর্ষ গুহ, তাঁকে খবর দেওয়া হল। গুপ্ত ব্রাদার্স জানাল শিল্ড ও কাপ শুটিংয়ের আগেই পৌঁছে যাবে। অনিরুদ্ধর বড় কাজ এখনও বাকি, খেলোয়াড়দের শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরি করে রাখা। পরদিন সকালে সে অলু আর কুড়োনকে মাঠের একধারে নিয়ে গিয়ে বুঝিয়ে বলল, একটা দল তিন গোলে হারছে তাদের একজনের বদলি প্লেয়ার হয়ে যখন কুড়োন নামবে, তখন খেলা শেষ হতে দশ মিনিট বাকি, তারপর দশ মিনিটে কুড়োন চারটে গোল দিয়ে তার দলকে জেতাবে। এই হল ঘটনা, এরই ওপর ভিত্তি করে খেলাটা হবে। অলুকে বলল, ”তোকে কিন্তু চারটে গোল খেতে হবে।”
শুনেই কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল অলুর মুখও, ”না মামা, না। অত গোল খেলে স্কুলে আমায় আওয়াজ দেবে।”
কুড়োন সহানুভূতির স্বরে বলল, ”চারটা গোল খাওয়ার মতো গোলকিপার অলু নয়, একটা কমায়ে দেন মামা।”
অলু প্রায় আঁতকে উঠল। ”তিনটে? না না, আমাকে বরং তুমি বাদ দাও।”
অনিরুদ্ধ বোঝাতে লাগল, ”আরে বোকা এটা সাজানো খেলা সবাই তা জানে, এ ম্যাচে গোল খেলে তোর সম্মান নষ্ট হবে না। কত ভাল সৎ লোক সিনেমায় ভিলেনের পার্টে দারুণ অভিনয় করে অ্যাওয়ার্ড পায়। তুইও অভিনয় করে গোল খাবি।”
কুড়োন বলল, ”মামা দুটো প্লান্টি বসায়ে দেন, আমি মারব অলু দুডাই আটকাবে, অর সম্মান তাইলে বাড়বে।”
শেষমেষ স্থির হল অলু চার গোলই খাবে তবে কুড়োনকে সবার কাছে স্বীকার করতে হবে অলু অভিনয় করেছে, নয়তো ওকে গোল দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই।
