রবিবার সকালে স্কুলমাঠের দু’দিকে গোলপোস্টের মাথায় ক্রসবার বসানোর কাজ ভিড় করে দেখল স্কুলের বহু ছেলের সঙ্গে শিবেনবাবু ও অনিরুদ্ধ। ছেলেরা অবশ্য এসেছিল স্কুল টিম গড়ার জন্য ট্রায়ালের নোটিস পেয়ে। আট থেকে বারো ক্লাস পর্যন্ত ছাত্রদের থেকে এসেছে চল্লিশজন। তাদের মধ্যে রয়েছে কালীতলার দীপকের কাছে কোচিং নিচ্ছে এমন পাঁচজন—শুভেন্দু, দেবু, জ্যোতি, শ্যামল আর অলু।
অনিরুদ্ধ সবাইকেই সোমবার সকাল ছ’টায় একতার মাঠে আসতে বলল। প্রথমে দুটো দলে ভাগ করে তাদের খেলাবে এবং তখনই বুঝে নেবে কাদের বাদ দিয়ে কাদের রাখবে। কুড়িটা ছেলে বেছে নিয়ে সে সকালে প্রাথমিক স্কিলগুলো, যা কলকাতার সুপার ডিভিশনের বেশিরভাগ ফুটবলারের আয়ত্তে ঠিকমতো নেই, সেইগুলোর অনুশীলন করাবে। শিবেনবাবু বলেছেন বিকেলে তিনি দল করে খেলাবেন এবং কীভাবে খেলতে হবে সেটা বলে দেবেন। সকাল—বিকেল দু’ বেলাই কুড়োন থাকবে ছাত্রদের সঙ্গে।
এই শেষের কথাটা শুনে ইলেভেন ক্লাসের শুভেন্দুর মুখ থমথমে হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে পাশে দাঁড়ানো দেবু আর জ্যোতিকে কী যেন বলল। তারপর অনিরুদ্ধকে জানাল, ”আমি সকালে আসতে পারব না, আমায় ট্রেনিং নিতে যেতে হবে দিপুদার কাছে। তা ছাড়া বিকেলে আসতে হলে ওর পারমিশান নিতে হবে।”
একই কথা বলল দেবু জ্যোতি শ্যামল, চুপ করে রইল অলু। অনিরুদ্ধ বলল, ”ঠিক আছে, সকালে দিপুদার কাছেই কোচিং নিও, কিন্তু বিকেলে দল করে খেলাটা হবে স্কুলটিম গড়ার জন্য। এখানে স্কুলের ছাত্র হিসেবে তোমাদের থাকাটা দরকার, বোঝাপড়াটা নয়তো গড়ে উঠবে কী করে?”
দেবু চোখ পিটপিট করে বলল, ”আচ্ছা অনিদা, ট্রেনিং তো হবে স্কুলটিম গড়ার জন্য, তা হলে কুড়োন কেন এতে থাকবে?”
অনিরুদ্ধ তাকাল শিবেনবাবুর দিকে। তিনি একবার ভ্রূ কুঁচকে তারপর মুখে হাসি এনে সহজ গলায় বললেন, ”সবাই তো আর দু’বেলাই আসতে পারবে না, লোক ঠিকই কম পড়বে, তখন ওকে সাহায্যের জন্য দরকার হবে ভেবে আমি রেখেছি। এতে কি তোমার আপত্তি আছে?”
শুনে দেবু ঢোক গিলল। ‘আমি রেখেছি’ শব্দ দুটো যথেষ্ট ভয়ঙ্কর মনে হল তার কাছে। আর ক’মাস পরে টেস্ট পরীক্ষা, আটকে যাওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা ইংরেজি আর লাইফ সায়ান্সে। সে আমতা—আমতা করে বলল, ”না সার, আপত্তি কেন হবে, কুড়োন খেলুক না আমাদের সঙ্গে, ভালই তো খেলে।”
সোমবার ঠিক ছ’টায় একতার মাঠ ভরে গেল ছাত্রদের ভিড়ে। ন’জনের দল করে পনেরো মিনিটের দুটি ম্যাচ খেলা হল। অলু বাদে দিপুদার কোচিংয়ের কেউ আসেনি। অনিরুদ্ধ আর শিবেনবাবু নিজেদের মধ্যে কথা বলে ঠিক করে নেন, ছেলেদের কাছে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা তারা আশা করবেন না শুধু দেখবেন ফুটবল—বোধ কতটা রয়েছে আর শরীরটা কেমন। তাঁরা মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে ওদের খেলা শুধু দেখে গেলেন। দেখেই বুঝে গেলেন অর্ধেকের বেশিকে বাদ দেওয়া যায়।
কুড়িজনকে শিবেনবাবু বলে দিলেন, ”কাল ভোর পাঁচটায় এই মাঠে আসবে, আমার সঙ্গে তোমরা দৌড়বে, শিমুলহাটি, মোটাবেড়িয়া পেরিয়ে চাঁদা নদীর পোল পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে আসব। তারপর ব্যায়াম, তারপর বেসিক স্কিলের ট্রেনিং করাবেন অনিদা। সাড়ে সাতটায় বাড়ি ফিরে পড়াশোনায় বসে যাবে। যারা রেগুলার আসবে না তারা কিন্তু বাদ যাবে।”
যারা বাদ গেল তাদের তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ”তোমরা নিশ্চয় চাও স্কুলের টিমটা ভাল হোক। তোমাদের থেকে ওরা একটু এগিয়ে রয়েছে তাই ওদের আসতে বললুম। ভেবো না তোমরা একেবারে বাদ গেলে, রোজ আসবে, দেখবে, দরকার হলে মাঠেও নামবে। কাল তোমরাও দৌড়তে আসবে, ব্যায়ামও করবে একসঙ্গে, এটায় কিন্তু কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।”
ছাত্রদের থেকে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে কুড়োন সব শুনছিল। অনিরুদ্ধ আর অলু যখন বাড়ি ফিরছে, কুড়োন তাদের পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ”মামা, আমারে তো হেডমাস্টারমশায় আসতে কইলেন না!”
”হেডমাস্টারমশাই বললেন না স্কুলের টিম করার জন্য এই ট্রেনিং হবে। স্কুলটিমে তো ছাত্ররাই খেলবে, তুই তো ছাত্র নোস।”
কুড়োনের মুখে চিন্তার ছায়া পড়ল। মিনিটখানেক পর সে বলল, ”মামা, আমি যদি ছাত্তর হই তাইলে আমারে নেবে?”
”হ্যাঁ নেবে।”
”তাইলে আমারে ছাত্তর কইরা লন।”
এবার অলু বলল, ”তুই ছাত্র হবি কী, অ আ ক খ—ই তো জানিস না।”
গম্ভীর মুখে কুড়োন বলল, ”জানি না তো কী হইছে, পেরাকটিস করলাই তো শিখা লওয়া যায়।”
অনিরুদ্ধ বলল, ”তা হলে পেরাকটিস শুরু কর।”
আর কথা না বলে কুড়োন পাশের রাস্তা ধরে হনহনিয়ে চলে গেল। মামা—ভাগ্নে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হেসে উঠল।
পরের দিন একঝাঁক ছেলে নিয়ে শিবেনবাবু দৌড় শুরু করলেন। মোচাবেড়িয়া পর্যন্ত রাস্তাটা বেশ ভাল, তারপরই খানাখন্দ আর ভাঙা ইট রাস্তাটাকে চাঁদানদীর কাঠের পোল পর্যন্ত দৌড়বার পক্ষে যন্ত্রণাকর করে রাখায় ওরা পোল পর্যন্ত গেল না। ফিরে আসার সময় কালীতলার মাঠের পাশ দিয়ে যখন আসছে তখন জনা পনেরো ছেলে কালীতলার মাঠটাকে পাক দিয়ে জগ করছিল। দীপক মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে। স্কুলের অত ছেলেকে দেখে ওরা দাঁড়িয়ে পড়ল।
দেবু বলল, ”ওদের সঙ্গে দেখছি কুড়োনটাও রয়েছে।”
দীপক চেঁচিয়ে বলল, ”দাঁড়ালি কেন, ছোট ছোট। কুড়ি পাক এখনও হয়নি।”
