শুনে অবাক হয়ে গেল অনিরুদ্ধ। এই খবরটা তো তার জানা ছিল না! তার সময়ে ফুটবলার শিক্ষক ছিলেন প্রতাপ চাটুজ্জে, তিনি ডিস্ট্রিক্ট টিমে খেলেছেন, তারপর এই আর একজন শিক্ষককে সে দেখছে।
”আপনি রোজ ভোরে দৌড়তে বেরোন, শরীরটাও রেখেছেন ফুটবলারের মতো, দেখে আমার বোঝা উচিত ছিল একসময় খেলতেন। দেখেছি তো, খেলা ছাড়ার পর বেশিরভাগই আর ডিসিপ্লিনড থাকে না। থলথলে হয়ে যায়।”
শিবেনবাবু নিজের খেলার প্রসঙ্গে না গিয়ে অন্য কথা পাড়লেন।
”ভাবছি ইন্টার—ক্লাস ম্যাচ আবার শুরু করলে কেমন হয়!”
”মনে মনে আমি কিন্তু ওটাই ভেবে রেখেছি। মুশকিল হল, অফিস থেকে ফিরতে ছ’টা—সাড়ে ছ’টা হয়ে যায়। আমার পক্ষে তো ছুটির দিন ছাড়া সাহায্য করা সম্ভব হবে না।”
”ঠিক আছে, আমিই শুরু করে দেব, আগে মাটিটা পড়ুক।”
.
দু’দিন পরই স্কুলমাঠে মাটি পড়ল। দেবেন গায়েন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দু’ লরি মাটি মাঠের উঁচু—নীচু এবং গর্ত হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোয় ফেলিয়ে সমানভাবে চারিয়ে দিয়ে মিউনিসিপ্যালিটির হাতে টানা ভারী রোলার চালিয়ে সমান করে বলে দিল, ”এখন এর ওপর খেলাধুলো দাপাদাপি একদম বন্ধ। এখন আষাঢ় মাসের শেষ, বর্ষার জলে আগে মাটি বসুক ভাল করে, ঘাস গজাক, তারপর পুজোর পর খেলা যা করার করবে। ততদিন স্কুলের ফুটবল হবে একতার মাঠে।” তারপর হেডমাস্টারের ঘরে এসে বলল, ”আপনি ক্লাসে ক্লাসে নোটিস পাঠিয়ে জানিয়ে দিন খেলাধুলো তো দূরের কথা, মাঠে হাঁটাচলাও বন্ধ। মাঠটাকে আমি ইডেনের মাঠ করে ছাড়ব। স্কুলের ছেলেরা চিরকাল মনে রাখবে দেবেন গায়েনকে, খেলাধুলার প্রসারের জন্য একটা আসল কাজ করে দিয়ে গেছে!”
শিবেনবাবু দ্বিধাভরে বললেন, ”একতার মাঠে ফুটবল খেলা হবে কী করে, ওখানে তো ক্রিকেট খেলা হয়!”
দেবেন রেগে উঠে বলল চড়া স্বরে, ”ফুটবলটাকে তুলে দিল এই ক্রিকেট। আরে বাবা, বাঙালির প্রাণের খেলা হল ফুটবল, আর সেই ফুটবলকে গোল্লায় দিয়ে ক্রিকেট নিয়ে নাচানাচি, তাও কিনা একদিনের ক্রিকেট? একসময় একতার ফুটবল টিম ছিল, এখন নেই। তবু ফুটবল টিমটাকে কালীতলা ধরে রেখেছে, সে ওই বুড়ো হারাধন দত্তর জন্য আর দিপুর ট্রেনিং সেন্টারের জন্য। ক্রিকেটে আর টাকা ঢালব না আমি, আবার একতার ফুটবল টিম করব, অনিরুদ্ধ তুমি দায়িত্ব নেবে?”
হঠাৎ তার ঘাড়ে দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধটা এসে যাওয়ায় অনিরুদ্ধ বিব্রত হয়ে পড়ল। দেবেন গায়েনকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নেওয়ার আছে, তার মধ্যে একটা বড় কাজ তো সত্যি সত্যি করে দিল—স্কুলমাঠটাকে তৈরি করে দেওয়া। এবার ওটার নিয়মিত পরিচর্যা দরকার এবং তা করার সামর্থ্য স্কুলের নেই, ওটা দেবেন গায়েনকে দিয়েই করাতে হবে। তা ছাড়া সিরিয়ালের শুটিংয়ের জন্যও লোকটির সাহায্য দরকার। কুড়োনকে নিয়মিত খেলাতে হবে, সেজন্য একটা ক্লাব চাই। স্কুলে পড়ে না সুতরাং স্কুল টিমে খেলার প্রশ্নই নেই, কালীতলা স্পোর্টিংয়ে দিপুদা যতদিন আছে কুড়োন ওখানে জায়গা পাবে না, ওকে খেলাতে হবে একতা সঙ্ঘে।
অনিরুদ্ধ বলল, ”আপনি পাশে থাকলে যথাসাধ্য আমি করব।”
দেবেন আশ্বস্ত করে বলল, ”ব্যস ব্যস, তা হলেই হবে। আমি একতার জন্য জার্সি করে দেব, মোজা কিনে দেব, তাই পরে ছেলেরা এখানে—ওখানে টুর্নামেন্ট খেলবে, শিমুলহাটির নামটা লোকে জানবে। ক্রিকেট দেখার জন্য মাঠে সারাদিন লোক বসে থাকে না, তাদের কাজকম্মো আছে। ফুটবলই ক্লাবকে পপুলার করে। কালীতলা তো কোথাও খেলতে—টেলতে বিশেষ যায় না, টাকা কোথায় যে যাবে? হেডমাস্টারমশাই, অনিরুদ্ধ, আজ স্বীকার করছি ছেলেবেলায় আমার বিশেষ ইচ্ছে ছিল, জার্নাল সিং—এর মতো দাপুটে প্লেয়ার হব, ঠাণ্ডা করে দেব ফরওয়ার্ডদের, হল না ইচ্ছেপূরণ, সেটা এখন পূরণ করতে চাই।”
অনিরুদ্ধ ক্রমশ আবিষ্কার করছে এই লোকটির চরিত্রের অন্য আর—একটা দিক। মনে মনে সে দেবেনের পাবলিসিটি পাওয়ার জন্য দুর্বলতাকে নিয়ে মজা পেয়েছে, লোকটিকে এতদিন ভেবেছে মোটা মাথার টাকাসর্বস্ব একটা ব্যবসায়ী। এবার সে সমীহ করতে শুরু করল।
কপিল ঘোষকে তিনদিন সময় দিয়েছিল অনিরুদ্ধ। সাতদিন পর সে অনিরুদ্ধকে তার ব্যাঙ্কের অফিসে টেলিফোন করে দেরি হওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে বলল, ”সোনার খাঁচার শুটিংয়ে খুব ব্যস্ত ছিলুম, সিরিয়ালটা এখন শেষের দিকে। আপনার কথামতো গেঞ্জি, চারটে বল, কুড়োনের বুট হয়ে যাবে। বলছিলুম কী, খেলবে তো স্কুলের ছোট ছোট ছেলে, ওদের তো ছোট গোলপোস্ট আর বার হলেই চলে যাবে, বড় ফুল সাইজ গোলের কি দরকার আছে?”
অনিরুদ্ধ গম্ভীর গলায় বলল, ”আছে। এখনকার স্কুলের ছেলেদের চেহারা কেমন জানেন কি? তাদের হাইট কত জানেন কি? আমার ভাগ্নে এইটে পড়ে, গোলকিপার হতে চায়। ও লাফিয়ে আট ফুট উঁচু বারে হাত লাগায়। শুনুন কপিলবাবু, গোলপোস্টের সাইজ এক ইঞ্চিও কমানো যাবে না, আট ফুট বাই চব্বিশ ফুট রাখতেই হবে। খরচ বাঁচানোর কথা চিন্তা করলে চলবে না। তা করলে কিন্তু কুড়োনের বদলে জুড়োন!”
”না না না, ফুলসাইজ গোলেই হবে, আপনি মেপে নেবেনে। রবিবার সকালে লোহার টিউব আর বল নিয়ে লোক যাবে। আপনি থাকবেন তো?”
”অবশ্যই থাকব।”
