”তুমি জানলে কেমন করে, আমি খেলাধুলো ভালবাসি?” মিটমিটি হেসে দেবেন গায়েন বুঝিয়ে দিল খেলার প্রসঙ্গে কথা বলতে সে উৎসাহী।
”আপনি পাঁচ মাইল রোড রেসে প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউট করেছিলেন, যোগাসন কম্পিটিশনে সংগঠক সমিতির চেয়ারম্যান ছিলেন, এসব কথা লোকে ভুলে গেলেও আমি ভুলিনি, আর সেজন্যই প্রথমে মনে পড়ল আপনার কথা। স্কুল থেকে ফুটবল খেলা তো উঠে গেছে, মাঠের অবস্থাটা দেখেছেন?”
”দেখব না কেন, খারাপ খুব খারাপ।” দেবেন গায়েন মাথা নাড়ল খেদ জানাতে।
”সামান্য একটু মাটি ফেলে মাঠটা কিন্তু সমান করা যায়।” অনিরুদ্ধ তীক্ষ্ন নজরে লক্ষ করল শ্রোতার মুখ। কোনও ভাবান্তর দেবেন গায়েনের মুখে দেখতে পেল না।
”টিভি সিরিয়ালের ডিরেক্টর কপিল ঘোষ আজ এসেছিল ধীরুদার কাছে, বীরেশ্বর ঘোষকে চেনেন তো?”
”চিনি না? কালীতলা তো ওকে ভাগিয়ে তোমাকে নিল। তারপর এল আমার কাছে, একতায় খেলার জন্য তদ্বির করতে। অবশ্য খেলতে দিয়েছিলুম। তা সেই ডিরেক্টর ওর কাছে কেন?”
”ওর বন্ধু হয়। কপিল ঘোষ সিরিয়াল করবে একজন ফুটবলারকে নায়ক করে। সেই নায়কের ছোটবেলার ভূমিকায় নামাবার জন্য একটা ছেলে খুঁজছে। ধীরুদা ওকে গছিয়ে দিল আমার কাছে। আমি বললুম একটা ফুটবল ফাইনাল দেখান, সেই খেলায় আপনার ছোট নায়ককে খেলান। সে গোল দিয়ে টিমকে জেতাবে। ট্রফি নেবে বিশাল জনতার সামনে অনুষ্ঠানের প্রেসিডেন্টের হাত থেকে। কপিল ঘোষ রাজি হয়ে গেল। ওকে বললুম ফাইনালটা আমাদের এখানেই হোক। প্লেয়ার, প্রেসিডেন্ট, জনতা সবই এখানকার, মাঠটাও হবে এখানকার। উনি বললেন এতসব পাবেন কী করে? আমি বললুম, এই শিমুলহাটিতে এমন একজন লোক আছেন যিনি খেলাধুলো প্রসারের জন্য ইচ্ছে করলেই তুড়ি মেরে সব ব্যবস্থা একঘণ্টায় করে দিতে পারেন, এমনকী, স্কুলের মাঠটা মাটি ফেলে সমানও করে দিতে পারেন।”
দেবেন গায়েন হাসি হাসি মুখে শুনে যাচ্ছিল। এবার ভ্রূ কুঁচকে গম্ভীর হয়ে বলল, ”লোকটা কে, সুরথ নাকি?”
সুরথ চাটুজ্জে মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান দেবেন গায়েনের প্রতিপক্ষ দলের নেতা। অনিরুদ্ধ জানে এই দু’জনের মধ্যে রয়েছে প্রবল রেষারেষি। সুরথের আছে দলের জোর, দেবেনের আছে টাকার জোর। কিন্তু অনিরুদ্ধর দরকার এমন টাকার জোরকে, যা দিয়ে সে স্কুলের মাঠ, স্কুল ফুটবল দল এবং কুড়োনকে তৈরি করার কাজ শুরু করতে পারবে।
দেবেন গায়েনের মুখভাবটা দেখে নিয়ে অনিরুদ্ধ বলল, ”আপনি ভাল করে আমার কথাটা বোধ হয় শোনেননি। আমি বললুম এমন একজনের কথা যিনি খেলাধুলা প্রসারের জন্য ইচ্ছে করলেই তুড়ি মেরে…।” অনিরুদ্ধ থেমে গেল।
বাইরের দু’জনের একজন তখন বলল, ”এমন লোক তো একজনই আছে এ তল্লাটে, দেবেনবাবু।” বলেই লোকটি হেঁ হেঁ করে হাসল।
অন্যজন বলল, ”বটেই তো!”
অনিরুদ্ধ মনে মনে কৃতজ্ঞ বোধ করল লোক দুটির প্রতি। দেবেনকে ভজাবার কাজটা ওই দু’জন অনেকটা এগিয়ে দিল। খুশিতে আপ্লুত দেবেন বলল, ”বলো আমায় কী করতে হবে।”
”আপনাকে পুরস্কার দিতে হবে।” অনিরুদ্ধ এবার তার ব্রহ্মাস্ত্রটি প্রয়োগ করল। ”বললুম না টিভি সিরিয়ালে একটা ফাইনাল খেলা হবে, সেই খেলার পর তো পুরস্কার দেওয়ার ব্যাপার আছে। আপনাকে ছাড়া আর কারুর কথা আমি ভাবতে পারছি না।”
”মানে আমাকে টিভি—তে দেখা যাবে! আমি ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারছ না! শুনলে তো তোমরা, অতবড় গোলকিপার বলল আমি ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারছে না। তখন কী যেন বললে, স্কুলের মাঠটায় মাটি ফেলতে হবে? কবে দরকার? চন্দনপুরে রাস্তা তৈরির জন্য মাটি কাটার কাজ চলছে, কালই দু’ লরি মাটি স্কুলের মাঠে ফেলিয়ে দেব। তোমার সিরিয়ালের ফুটবল ম্যাচটা কবে? দু’দিন আগে আমায় বোলো, আমি শিমুলহাটির মোড়ে মোড়ে পোস্টার লাগিয়ে দেব। টিভি সিরিয়ালের শুটিং বলে কথা!”
অনিরুদ্ধ এতটা সফল হবে, ভাবেনি। এ তো ট্রাইব্রেকারে তিনটে কিক আটকে দেওয়ার মতো ব্যাপার হয়ে গেল। ভরসা পেয়ে এবার সে বলল, ”ম্যাচটা কিন্তু হবে একতার মাঠে, ব্যবস্থাটা আপনাকে করে দিতে হবে।”
”ও নিয়ে ভাবতে হবে না, মাঠ তুমি পেয়ে যাবে। চা খাবে?”
অনিরুদ্ধ না বলতে গিয়েও বলল না। চা খেয়ে বেরিয়ে এসে সে আবার গেল হেডমাস্টার শিবেনবাবুর কাছে। তাকে সে কপিল ঘোষ ও দেবেন গায়েনের সঙ্গে যেসব কথা হয়েছে, সবিস্তারে জানাল। শুনতে শুনতে শিবেনবাবু খুব হাসলেন। বললেন, ”কুড়োন দেখছি স্কুলের একটা সম্পদ হয়ে উঠল। ওকে ভাঙিয়ে এত যে কিছু করা হতে যাচ্ছে, তা কি ও জানে?”
”কিচ্ছু জানে না আর জানার দরকারও নেই। আপনি এবার স্কুলে একটা নোটিস দিন। স্কুল ফুটবল টিম গড়ার জন্য ট্রায়াল হবে, যারা ট্রায়ালে যোগ দিতে চায় তারা যেন সামনের রবিবার সকাল আটটায় স্কুলের মাঠে হাজির হয়ে অনিরুদ্ধ চক্রবর্তীর সঙ্গে দেখা করে। আপনিও সার তখন কিন্তু থাকবেন, তা হলে ব্যাপারটা গুরুত্ব পাবে।”
”অবশ্যই থাকব। চাই কি তোমাকে সাহায্যও করতে পারি ট্রেনিংয়ে।” শিবেনবাবু এর পর হাসতে হাসতে বললেন, ”কলকাতায় এম.এ পড়ার সময় দু’ বছর ফুটবল খেলেছি ফার্স্ট ডিভিশনে চন্দ্র মেমোরিয়ালের হয়ে। তেমন কিছু ছিলাম না, কাগজে কখনও নাম ওঠেনি।”
