কপিল ঘোষকে নিয়ে অনিরুদ্ধ স্কুলবাড়ির পশ্চিমদিকে এসে কুড়োনকে পেল। সবুজ ঢলঢলে গেঞ্জি আর কেডস পরা কুড়োন এই অসময়ে অনিরুদ্ধ আর একটা লোককে দেখে অবাক হয়ে তাকাল। তারপরই মুখে ভয় ফুটে উঠল।
নিচু গলায় অনিরুদ্ধ বলল, ”এই ছেলেটার কথাই বলেছিলুম।”
কপিল ঘোষ তীক্ষ্ন চোখে কুড়োনের মুখের দিকে তাকিয়ে মাথাটা অনুমোদকের ভঙ্গিতে হেলিয়ে বললেন, ”চলবে। খেলে কেমন?”
”আপনি কখনও একটু—আধটু ফুটবল খেলেছেন?”
”ছোটবেলায় পাড়ার গলিতে খেলেছি।”
”আপনার দিকে ও বল নিয়ে এগোবে। যেভাবে পারেন ওকে আটকাবেন, হাত দিয়ে পা দিয়ে যেভাবে হোক।”
কুড়োনকে ডেকে অনিরুদ্ধ ফিসফিস করে বলল, ”লোকটাকে কাটিয়ে বল নিয়ে বেরোতে পারবি?”
কুড়োন একনজর কপিল ঘোষকে দেখে নিয়ে বলল, ”ওই কুমড়োটারে!” সে আর কিছু বলল না। বলে একটা টোকা দিয়ে এগোল কুঁজো হয়ে দু’ পাশে হাত ছড়ানো কপিল ঘোষের দিকে। তার একগজের মধ্যে এসে কুড়োন শরীরটাকে ডাইনে ঝুঁকিয়েই বাঁয়ে হেলিয়ে আবার ডাইনে ঝোঁকাল। কপিল ঘোষ টলে পড়ে যাচ্ছিল, অনিরুদ্ধ তাকে ধরে নিল। বল পায়ে কপিল ঘোষের বাঁ দিক দিয়ে পেছনে গিয়ে কুড়োন একগাল হাসল।
”ভাগ্যিস ধরলেন”, কপিল ঘোষ শুকনো মুখে হেসে উঠল, ”অনেকদিন খেলি না তো, আচ্ছা আর একবার করুক।”
অনিরুদ্ধ ইশারা করল কুড়োনকে। এবারও একই ব্যাপার ঘটল। ডান দিক দিয়ে যাবার সময় কপিল ঘোষ টলে পড়তে পড়তে হাত দিয়ে কুড়োনকে ধরার চেষ্টা করেও পারল না। বিদ্যুৎ ঝলকের মতো কুড়োন বেরিয়ে গেল।
হতভম্ব কপিল ঘোষ বলল, ”অদ্ভুত তো! আচ্ছা, মারাদোনার মতো বল নাচাতে পারে?”
অনিরুদ্ধ ডাকল কুড়োনকে। ”টিভি—তে সেদিন মারাদোনার যে বলের খেলা দেখাল, সেটা করে দেখাতে পারবি?”
”হ।” কুড়োনের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
বলটা নিয়ে সে ডান এবং বাঁ পায়ের পাতার ওপরে নাচাতে নাচাতে তুলে দিল ডান ঊরুর ওপর, তারপর বাঁ উরুতে এইভাবে ডান—বাঁ করতে করতে মাথার ওপর তুলে কপাল দিয়ে বার দশেক নাচিয়ে কপালের ওপরই স্থির করে রেখে তারপর পিঠের ওপর দিয়ে গড়িয়ে দিল। বলটা জমির দিকে নামছে, সে বাঁ পায়ের গোড়ালি দিয়ে টুক করে মাথার ওপর দিয়ে বলটা তুলে সামনের দিকে এনে ডান পা সামনে বাড়িয়ে ধরে নিয়ে পাতার ওপর বলটাকে স্থির করে বসিয়ে রেখে একগাল হাসল।
কপিল ঘোষ দমবন্ধ করে এতক্ষণ দেখছিল, এবার শ্বাস ফেলল, ”অদ্ভুত তো! প্রায় চার মিনিট বলটাকে জমিতে পড়তে দেয়নি। অনিরুদ্ধবাবু ছেলেটাকে আমার চাই।”
”আমাদেরও কিছু চাই। লোহার টিউবের গোলপোস্ট অর ক্রসবার, নম্বর দেওয়া রঙিন গেঞ্জি চোদ্দটা, চারটে বল আর কুড়োনের একজোড়া বুট।”
কপিল ঘোষ ভয়ে ভয়ে বলল, ”কত পড়বে এজন্য?”
”বলতে পারব না লোহার টিউবের দাম না জেনে। তবু আন্দাজে বলছি হাজার কুড়ি টাকা।”
আঁতকে উঠল কপিল ঘোষ। ”ওরে বাবা আমি মরে যাব। লোহার বদলে কাঠের গোলপোস্ট করলে হয় না?”
অনিরুদ্ধ হালকা চালে বলল, ”হবে না কেন, তা হলে কুড়োনের বদলে জুড়োনকে নিয়ে আপনাকে শুটিং করতে হবে। কপিলবাবু, আপনি একটা সাজানো ফাইনাল ম্যাচ পাবেন, আপনাকে নামী অভিনেতা—অভিনেত্রীর জন্য টাকা খরচ করতে হবে না, সেট সাজাবার খরচটাও বেঁচে যাবে, এই সব সুবিধে পেয়েও হাজার কুড়ি শুনে আঁতকে উঠছেন? কুড়োন যা দেখাল তাইতে আপনি অবাক হলেন, আপনার দর্শকরাও অবাক হবে, সেটা কি আপনি চান না? আমি টাকা চাইনি, জিনিস চেয়েছি। তাও নিজের জন্য নয়। যদি রাজি থাকেন তা হলে বলুন নয়তো—”
”না না না, জুড়োন নয়, কুড়োনকেই চাই। হাজার কুড়ির মধ্যেই হবে তো? ঠিক করে বলুন।” কপিল ঘোষ ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল।
”আমি আন্দাজে বললুম। বেশি হতে পারে, কমও হতে পারে, যদি রাজি থাকেন তা হলে তিনদিনের মধ্যে আমাকে জানান। ওই যে দেখছেন বাড়িটা,” অনিরুদ্ধ আঙুল তুলে বটগাছের পেছনের বাড়িটা দেখাল, ”ওটায় আমি থাকি। ছেলে জোগাড় করা, মাঠের ব্যবস্থা করা, সভাপতি, প্রধান অতিথি ঠিক করা, এটা কিন্তু আমি ঠিক করব। এজন্য আপনাকে খরচ করতে হবে না। আর দেখুন ধীরুদা যে বলল দুটো কাপ ওর কাছে আছে, তার হাইট দেখলে আপনার দর্শকরা হাসবে, পাঁচ ইঞ্চি লম্বা! গলির ফুটবলেও ওরকম ট্রফি দেয় না। গুপ্ত ব্রাদার্সকে বলে একটা শিল্ড আর একটা বড় কাপ ধার করে আনব। শুটিংয়ের আগেই গোলপোস্ট, বল আর বুট চাই, নইলে কিন্তু জুড়োন।” অনিরুদ্ধ কঠিন স্বরে জানিয়ে দিল। কাজ উদ্ধার হয়ে গেলে এইসব লোকেদের আর টিকি দেখা যাবে না, নিজের খেলার অভিজ্ঞতা থেকে সে এটা জানে।
”আপনার বাড়ি আর অফিসের ফোন নাম্বারটা দিন।” বলে কপিল ঘোষ পকেট থেকে নোটবই বার করল।
দুটো ফোন নম্বর বলে কপিল ঘোষকে ধীরেশ্বরের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে অনিরুদ্ধ দেবেন গায়েনের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। বাড়ির বৈঠকখানায় দেবেন দুটি লোকের সঙ্গে ব্যবসার কথাবার্তা চালাচ্ছিল, দু’জনের বসার ধরনে মনে হল ওরা অনুগ্রহপ্রার্থী। অনিরুদ্ধকে দেখে অবাক হয়ে দেবেন বলল, ”অনিরুদ্ধ! কী সৌভাগ্য! হঠাৎ তুমি?”
”দু—একটা কথা ছিল স্কুলের খেলাধুলোর ব্যাপার নিয়ে। আপনি তো ম্যানেজিং কমিটির একজন প্রভাবশালী মেম্বার। আপনার কথাতেই তো কমিটি চলে, খেলাধুলো ভালবাসেন তাই আপনারই দ্বারস্থ হলুম।” বিনীত ভাবে কথাগুলো বলে অনিরুদ্ধ দেখল, দেবেন গায়েনের মুখচোখ ঝকমক করে উঠল আর বাইরের লোক দুটির বসার ভঙ্গিতে ফুটে উঠল সম্ভ্রম। প্রচুর অর্থ রোজগার করলেও কেউ মান্যগণ্য বা অভিজাত বলে তাকে স্বীকার করে না, এটা দেবেন গায়েন এবং অনিরুদ্ধও জানে।
