ধীরেশ্বর বলল, ”জানিস কপিল, অনির গোলকিপার হওয়ার পেছনে কিন্তু সবচেয়ে বড় অবদান আমার। কালীতলা স্পোর্টিংয়ে ট্রায়াল দিতে এসে এমন বাজে খেলল অনি যে, ওকে বাদই দিয়ে দেওয়া হয়। ও একতা সঙ্ঘে যাবে বলে ঠিক করল। তখন আমিই হারাধন দত্তকে বলি ছেলেটার মধ্যে বিরাট সম্ভাবনা আছে, রেখে দিন। আমি ওকে তৈরি করে নোব। তখন আমি কালীতলার ফার্স্ট গোলকিপার। অনি হল সেকেন্ড গোলকিপার, সেই ওর শুরু, তারপর তো বিরাট নাম করল।” বলেই ধীরেশ্বর বড়দার মতো অনিরুদ্ধর কাঁধে হাত রেখে একগাল হাসল।
ধীরেশ্বরের কথা শুনে অনিরুদ্ধ অবাক হল না, রাগলও না। সে ওর স্বভাবটা জানে। নিজেকে বড় করে দেখাবার জন্য নির্লজ্জের মতো মিথ্যা বলে যেতে পারে। অনিরুদ্ধ আলতোভাবে কাঁধ থেকে হাতটা নামিয়ে দিয়ে সামান্য সরে দাঁড়িয়ে কপিল ঘোষকে জিজ্ঞেস করল, ”কীরকম ছেলে চান, তাকে কী করতে হবে?”
দু’হাত নেড়ে কপিল ঘোষ বলল, ”নায়কের ছোটবেলার খেলার কয়েকটা শট নেব, দশ থেকে চোদ্দ বছর বয়স হলেই হবে, দু—চারটে কথা বলবে আর বল নিয়ে একটু খেলা করবে, ব্যস। তবে খেলাটা দেখে যেন বোঝা যায় ভবিষ্যতে ছেলেটা বড় প্লেয়ার হবে। আর ছেলেটাকে দেখতে যেন একটু ভাল হয়। নায়কের মুখের সঙ্গে মিল থাকলে তো খুবই ভাল।”
অনিরুদ্ধর মাথার মধ্যে ঝলসে উঠল কুড়োন। সে বলল, ”ছেলে একটা আছে, যেমন চাইছেন তেমনই, দেখতেও ভাল। তবে কথা বললেই মুশকিল, লোকে হেসে ফেলবে, গ্রাম্য উচ্চচারণ।”
কপিল ঘোষ হাতপাখার মতো তালু নেড়ে বলল, ”ও কিছু নয়, ও কিছু নয়, ডাব করে নেব। অন্য একটা ছেলের গলা ওর গলায় বসিয়ে দেব। বয়স কত?”
”বছর চোদ্দ। ছেলেটার খেলা দেখতে হলে তো তা হলে একটা ম্যাচ খেলাতে হবে।”
”তা তো হবেই।” কপিল ঘোষের বলার ধরন দেখে অনিরুদ্ধর মনে হল, ম্যাচের কথাটা বোধ হয় আগে ওর মাথায় ছিল না।
”সেই ম্যাচটা কি আমাকেই অ্যারেঞ্জ করতে হবে? অন্তত গোটা পনেরো—ষোলো ছেলে চাই।”
”করে দিলে তো খুবই ভাল হয়।” কপিল ঘোষের গলায় কৃতজ্ঞ থাকার আগাম প্রতিশ্রুতি ঝরে পড়ল।
অনিরুদ্ধ দ্রুত চিন্তা করে নিল, তাকে এখন টাকার জোগাড় করতে হবে। এই লোকটা বা ওর প্রোডিউসার সিরিয়াল নাম দিয়ে ব্যবসা করে টাকা রোজগার করবে। ওর ব্যবসায় বা টাকা রোজগারে আমি সাহায্য করব কেন? যদি স্কুলের ফুটবলের জন্য টাকা দেয় তা হলে করব, নয়তো নয়।
”দেখুন একটা সাজানো ফুটবল ম্যাচকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা খুব সোজা কাজ নয়। বাংলা সিরিয়ালে আর সিনেমায় তো দেখেছি ফুটবল খেলা দেখে বাড়ির মেয়েরাও হাসে।”
কপিল ঘোষের মুখের হাসি হাসি ভাবটা মিলিয়ে গেল। ঢোক গিলে বলল, ”কম টাকার মধ্যে সিরিয়াল করতে গেলে হাসির ছবি হবে না তো কী হবে?”
অনিরুদ্ধ এবার স্বর বদলে একটু কঠিন স্বরে বলল, ”লোকে এখন বিশ্বকাপের খেলা দেখছে, ফুটবল খেলাটা সম্পর্কে একটা ধারণা তারা গড়ে তুলছে। তাদের আপনি হাস্যকর ফুটবল দেখিয়ে নিজের নাম খারাপ করবেন কেন?”
নাম খারাপের কথা শুনে কপিল ঘোষের আত্মমর্যাদায় বোধ হয় আঘাত লাগল। টান হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ”নাম খারাপের প্রশ্ন উঠছে কেন? ম্যাচটা তো আপনি অ্যারেঞ্জ করবেন। বাস্তবসম্মত হবে বলেই তো আপনাকে পেতে চাই। যেভাবে যা দরকার বলবেন সেইভাবে করব।”
”আপনার গল্পে দরকার একটা ছোটদের ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচ, তা হলে ব্যাপারটা জমবে। সাতজন করে দুটো টিম খেলবে, চাঁদোয়ার নীচে ডায়াস, তাতে কাপ শিল্ড সাজানো, সভাপতি, প্রধান অতিথি বসে, ম্যাচ শেষে বিজয়ী নায়ক দু’হাতে ট্রফি তুলে হাসছে, কেমন হবে?” অনিরুদ্ধ এমনভাবে বলল, যেন চোখের সামনে সে ব্যাপারটা দেখতে পাচ্ছে।
কপিল ঘোষ চোখ বুজে দৃশ্যটা কল্পনায় দেখছিল। একগাল হেসে চোখ খুলে বলল, ”ফাইন। তবে চাঁদোয়া আর ডায়াসটা বাদ দিন, খরচ বেড়ে যাবে, আর কাপ শিল্ড টিল্ড জোগাড় করতে হবে। আর কী দরকার?”
ধীরেশ্বর এতক্ষণ মুখ বন্ধ রেখে দু’জনের কথা শুনে যাচ্ছিল। আর থাকতে না পেরে বলল, ”কাপ শিল্ডের কথা ভাবতে হবে না। ধবধবি আর খড়দায় খেলে দুটো কাপ পেয়েছিলুম, তোলা আছে আলমারিতে, ঝেড়ে মুছে নিলে চলে যাবে।”
অনিরুদ্ধ বলল, ”দুটো টিমের জন্য চোদ্দোটা জার্সি আর বল চাই। মাঠ নয় কালীতলা কি একতার সঙ্গে ব্যবস্থা করে নেব। ছেলেরা নিজেদের বুট পরে খেলবে। একজন রেফারি আর প্রাইজ দেওয়ার জন্য একজন সভাপতি চাই। শুটিং হচ্ছে শুনলে মাঠে দর্শক আপনা থেকেই হয়ে যাবে। আসলে আপনার দরকার তো বাচ্চচা নায়কের কেরামতি দেখানো?”
”হ্যাঁ।” চিন্তিত মুখে কপিল ঘোষ বলল, ”দুটো টিমের জন্য দু’ সেট জার্সি! ওরে বাবা সে তো অনেক খরচ! আচ্ছা, সাদা কি লাল গেঞ্জি পরিয়ে খেলিয়ে দিলে হয় না?”
অনিরুদ্ধ বলল, ”এই তো হাসার মতো কথা বললেন। একই জামা পরে দু’ দল খেললে সব তো গুলিয়ে যাবে।”
”কেন, একদল সাদা, অন্য দল লাল গেঞ্জি পরবে।” ধীরেশ্বর ফোড়ন কাটল।
হাতঘড়ি দেখে কপিল ঘোষ ব্যস্ত হয়ে বলল, ”জরুরি একটা কাজ আছে, আপনার সঙ্গে পরে কথা বলব। এখন ছেলেটাকে একবার দেখাতে পারেন?”
”এখন!”
অনিরুদ্ধ ফাঁপরে পড়ল। কুড়োন এই মুহূর্তে কোথায় আছে কে জানে! রাখালের কাছে খোঁজ নিলে হয়তো জানা যাবে। কপিল ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে সে রাখালের ঘরের দিকে এগোল। স্কুলের গেটের কাছে পৌঁছেই পরিচিত শব্দটা তার কানে এল, দেয়ালে বল মারার শব্দ। রবিবার স্কুল বন্ধ, তাই একা একা কুড়োনের ‘পেরাকটিস’ চলেছে সকাল থেকেই।
