বলতে বলতে অনিরুদ্ধ লক্ষ করছিল শিবেনবাবুর মুখ, মন দিয়ে শুনছেন আর ভেবে চলেছেন। সে আবার শুরু করল, ”তখনকার মাস্টারমশাইরা রিটায়ার করে গেলেন, কেউ কেউ মারা গেলেন, স্কুল থেকে ফুটবলের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার উৎসাহটাও ধীরে ধীরে শুকিয়ে গেল, এখন একেবারেই চড়া পড়ে গেছে। খেলার স্রোতটা আবার ফিরিয়ে আনা দরকার। এ—ব্যাপারে স্কুল যে সাহায্য আমার কাছে চাইবে তা আমি দেব।”
শিবেনবাবুর মুখের পাতলা হাসিটা এবার মিলিয়ে গিয়ে গম্ভীর হয়ে গেল। বললেন, ”স্কুলের সমস্যাটা কী জানো, টাকা নেই। বেঞ্চ চেয়ার ভেঙে রয়েছে, দেয়ালের প্লাস্টার খসে খসে পড়ছে, খাওয়ার জলের ট্যাঙ্ক ভেঙে গেছে, এর পর খেলার জন্য টাকা দেওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার হয়ে উঠবে।”
ভবা ট্রে—তে করে দু’কাপ চা নিয়ে এল, সঙ্গে বিস্কুট। নীরবে তারা চায়ে চুমুক দিতে থাকল। অনিরুদ্ধ এইটুকু বুঝেছে, শিবেনবাবু ফুটবলের বিরুদ্ধে নন, বরং পক্ষেই। যদি টাকা থাকত তা হলে এখনই হ্যাঁ বলে দিতেন। খালি কাপ নামিয়ে অনিরুদ্ধ একটা বিস্কুট তুলে নিয়ে বলল, ”খরচ খুব বেশি নয়। আপাতত দরকার গোটাচারেক বল, একটা মাঠ, যেখানে দু’বেলা প্র্যাকটিস করতে পারবে। স্কুলের মাঠটায় মাটি ফেলে লেভেল করা দরকার, খেলার অযোগ্য হয়ে রয়েছে। গোল পোস্ট, বারও করাতে হবে।”
চিন্তিত মুখে শিবেনবাবু বললেন, ”সকালে প্রাইমারি স্কুল বসে, ক্লাসের গায়েই মাঠ। সকালে তো মাঠে খেলা যাবে না, তা হলে স্কুলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। অবশ্য বিকেলে খেলা যাবে।”
এও এক সমস্যা। সকালের প্র্যাকটিসটা খুবই দরকার। স্কুলের মাঠ না হলে অন্য কোনও মাঠে। দুটো মাঠ আছে শিমুলহাটিতে, কালীতলার আর একতার। কালীতলায় সকালে কোচিং করায় দিপুদা, ওরা স্কুলকে মাঠ ছাড়বে না। একতার নাম কা ওয়াস্তে ফুটবল টিম আছে বটে, তবে ওরা জোর দিয়েছে ক্রিকেটে। সকালে মাঠটা পড়েই থাকে। টাকা দিয়ে একতা চালায় দেবেন গায়েন, মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার, মাছের ভেড়ি, আর ধানজমি থেকে আয় ছাড়াও জমি কিনে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি করে বিক্রির ব্যবসাও আছে। টিভি—র আর ওষুধের দোকান দিয়েছে, এখন বিউটি পার্লার খোলার তোড়জোড় করছে। যথেষ্ট ধনী লোক। স্বরূপানন্দ স্কুল ম্যানেজিং কমিটির মেম্বার। অনিরুদ্ধ মনে মনে ঠিক করে ফেলল, দেবেন গায়েনকে ধরতে হবে একতার মাঠটা পাওয়ার জন্য।
”মাঠ আছে একতা সঙ্ঘের। দেবেন গায়েন পেট্রন ইন চিফ, ওকে একবার বলে দেখতে পারি। স্কুলমাঠে মাটি ফেলার খরচটা যদি উনি দেন, সেজন্য যদি একটু তোয়াজ করে কথা বলতে হয়—।” কথা অসম্পূর্ণ রেখে অনিরুদ্ধ হাসল।
”স্কুলের জন্য প্রাক্তন ছাত্রের কিছু একটা করার ইচ্ছা দেখে খুব ভাল লাগছে। যেচে এভাবে কাউকে এগিয়ে আসতে দেখিনি। তুমি কাজ শুরু করো, আমি আছি।” শিবেনবাবু গম্ভীরস্বরে বললেন।
অনিরুদ্ধ মনে মনে বলল, স্কুল নয়, আসলে কুড়োনের জন্যই নাড়া খেয়ে উদ্যোগী হয়েছি। ছেলেটাকে তৈরি করে দিতে পারলে কাজের মতো একটা কাজ করা হবে। মুখে সে বলল, ”সার, বহু প্রাক্তন ছাত্র স্কুলের জন্য কিছু একটা করতে পারলে ধন্য বোধ করবে। কেউ যদি উদ্যোগী হয়ে তাদের কাছে সাহায্য চায় তা হলে অবশ্যই তারা হাত বাড়িয়ে দেবে। এই উদ্যোগটাই কেউ নেয়নি এতকাল। স্কুলের ফুটবল টিম আমি করবই। আপনি শুধু দেখুন ছেলেরা যেন নিয়মিত মাঠে আসে, ট্রেনিং কোচিং যা দেওয়ার আমিই দেব।”
শিবেনবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে অনিরুদ্ধ ভাবল, একবার পার্থর কাছে যাই। পার্থ মুখুজ্জে তার সঙ্গেই পড়েছে, একসঙ্গে তারা স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়েছে। পার্থ এখন যাদবপুরে ফিজিকস পড়ায়। খেলাধুলো করত না কিন্তু সাহায্য চাইলে নিশ্চয় বিমুখ করবে না। অনিরুদ্ধ হাঁটতে হাঁটতে দেখল বাড়ির লোহার গেটের সামনে একজন বেঁটে, গোলগাল, শ্যামবর্ণ, পাজামা আর প্রায় গোড়ালি ছোঁয়া পাঞ্জাবি পরা লোকের সঙ্গে কথা বলছে ধীরুদা অর্থাৎ তাদের ক্লাসের বীরেশ্বরের দাদা ধীরেশ্বর, যে একদিন অনিরুদ্ধকে কালীতলার মাঠে গোলপোস্টের মাঝে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘শিখে কী করবি…তুই বরং একতার মাঠে গিয়ে খেলা শেখ।’ ধীরেশ্বরকে দেখলেই কথাগুলো তার মনে পড়ে আর মনে মনে হেসে ওঠে।
”এই অনি শোন, শোন, এদিকে আয়।” ধীরেশ্বর মাতব্বরি ঢঙে হাত নেড়ে ডাকল। অনিরুদ্ধ অনিচ্ছুক পায়ে এগিয়ে গেল।
”তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই, ইনি কপিল ঘোষ আমার বন্ধু, সিরিয়াল ডিরেক্টর, এখন ওর একটা সিরিয়াল চলছে টিভি—তে, আটশো পর্ব পেরিয়ে গেছে, কী যেন নাম?”
ডিরেক্টর বলল, ”সোনার খাঁচা।”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, সোনার খাঁচা। এর পরের সিরিয়ালটা করবে খেলা নিয়ে। গল্পটল্প সব রেডি, কাজও শুরু হয়ে গেছে। একজন ফুটবলারের উত্থান—পতন, আবার উত্থান নিয়ে গল্পটা। কপিল আমার কাছে এসেছে আমার জানা কোনও ছেলেটেলে আছে কিনা খোঁজ নিতে। ভাল কথা কপিল, তোর সঙ্গে এর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি। এ হচ্ছে অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী, বিখ্যাত গোলকিপার, ইন্ডিয়া টিমে খেলেছে।”
কপিল ঘোষ যেন বাড়ির উঠোনে মোহর ভর্তি একটা ঘড়া দেখতে পেয়েছে এমন একটা ভাব তার চোখেমুখে ফুটিয়ে বলল, ”আপনিই অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী! কী আশ্চর্য, আপনার অনেক খেলা আমি দেখেছি। বছর দশেক মাঠে যাই না, তখনই শেষ আপনাকে দেখেছি।”
