ফাইনাল ম্যাচ শুরুর আগে অনিরুদ্ধ অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ দুই বালককে বলল, ”বিশ্বকাপ ফুটবল কী জিনিস এই বাজ্জিওকে দেখে বুঝতে পেরেছিস?”
অলু বলল, ”শুধু বাজ্জিও কেন, ওদিকে রোমারিও, সেই বা কম কীসে?”
”ঠিক। সেমিফাইনালে দেখেছিস ডান দিক থেকে আসা ক্রসটায় কীভাবে হেড করে সুইডেনকে গোলটা দিল?”
কুড়োন বলে উঠল, ”দুটো লোকের মদ্যিখান থেকে লাফিয়ে উঠে যে হেডটা করল, সেইটা? খুব বড় পেলেয়ার!”
অনিরুদ্ধ বুঝল, রোমারিওর হেড করার দৃশ্যটা কুড়োনের মনে ছবির মতো ছাপা হয়ে গেছে, যেমন ব্র্যাঙ্কোর ফ্রিকিকের আউট সুইঙ্গারটা। এইসব টুকরো টুকরো স্কিলগুলোই ছেনির মতো ঠুকে ঠুকে মনের মধ্যে খোদাই করে ফুটবলের মূর্তি গড়ে দেয়।
প্রচণ্ড চমক তিনজনের জন্য অপেক্ষা করছিল ফাইনাল ম্যাচের শেষ মুহূর্তে। নব্বই মিনিট খেলায় গোল হল না। অতিরিক্ত সময়ের কুড়ি মিনিটে গোলের এক গজ দূর থেকে রোমারিও যখন পোস্টের বাইরে বল মারল, কুড়োন তখন ঝুঁকে কপাল মেঝেয় ঠুকে বলে উঠল, ”মামা, আমাদের দেবুও তো ওখান থেকে গোল দিয়া দিত। ইসস।” কুড়োনের ধারণা, দেবু আর একটা রামছাগল একই রকম ফুটবল খেলবে।
খেলা গড়াল টাই ব্রেকারে। ব্রাজিলের প্রথম চারটি পেনাল্টি কিকের তিনটিতে গোল হল, একটি বাঁচাল গোলকিপার। ইতালির দুটি কিকে গোল হল, একটি গেল বারের ওপর দিয়ে, চতুর্থটি আটকাল গোলকিপার। ব্রাজিল ৩—২ গোলে এগিয়ে। ইতালির পঞ্চম কিক নেবে বাজ্জিও। অলু আর কুড়োন তো বটেই, অনিরুদ্ধও টানটান হয়ে বসল। কী হয়, কী হয় ভাব, তিনজনের বুকের ধকধকানি ঢাক বাজাচ্ছে। গোল দিলে ৩—৩ হবে, দিতে না পারলে ইতালি ২—৩ হেরে যাবে।
বাজ্জিও কিক নিল। বাঁ দিকের পোস্ট আর ক্রসবারের ওপর দিয়ে বলটা চলে গেল। তিনজন পাথরের মতো বসে রইল। ম্যাচটা এইভাবে শেষ হবে, কেউ কল্পনাই করতে পারেনি।
অনিরুদ্ধ বলল, ”লাক, ব্যাড লাক। টায়ার্ড শরীর, টায়ার্ড ব্রেন, আগের ম্যাচে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট, তার ওপর শেষ কিক নেওয়ার প্রেসার। এত বছরের এত পরিশ্রম আর বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন একটা বাজে কিকে চুরমার হয়ে গেল, একেই বলে নিয়তি!”
অলু বলল, ”টাইব্রেকারটা অনেকটা লটারির মতো। একটা ভাল টিমও হেরে যেতে পারে, যেমন আজ হল।”
কুড়োন বলল, ”দুই দুইডা প্লান্টি মিস করল তারে ভাল টিম বলব? হ্যাঁ মামা, আপনি বলেন, ভাল টিম?”
অনিরুদ্ধ চুপ করে রইল। অলু যা বলল তাতে যুক্তি আছে, কুড়োনের কথাও যুক্তিহীন নয়। দু’জনের মাঝামাঝি একটা রাস্তায় সে হাঁটল। ”এবার থেকে তোরা প্লান্টি কিক পেরাকটিস কর। কুড়োন গোল দেবে আর অলু গোল বাঁচাবে।”
.
হেডমাস্টার শিবেনবাবুর ভাড়াবাড়ি স্কুল থেকে হেঁটে মিনিট তিনেক দূরে। আগে ছিলেন কোলাঘাটের একটি স্কুলে। দেড় বছর আগে এসেছেন স্বামী স্বরূপানন্দে। পরিবারবর্গ রয়েছে মেচেদায় পৈতৃক বাড়িতে। শিবেনবাবুর বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ছিপছিপে গড়ন। অনিরুদ্ধ শুনেছে, খুব ভোরে হাফপ্যান্ট আর কেডস পরে রোজ জগ করেন শিমুলহাটিকে চক্কর দিয়ে। কিন্তু ধবধবে ধুতি—পাঞ্জাবি ছাড়া ওঁকে স্কুলে কেউ দেখেনি। কথা কম বলেন এবং বলেন ধীর গম্ভীর স্বরে। অনিরুদ্ধর সঙ্গে আগের হেডমাস্টারমশাই নারায়ণবাবুর আলাপ ছিল। নিপাট ভালমানুষ, সাতেপাঁচে থাকতেন না। ভারত বিশ্বকাপ ক্রিকেট জেতায় তিনি একদিন স্কুল ছুটি দিয়ে ছাত্রদের নিয়ে মিছিল করে ‘ক্রীড়াপ্রেমিক’ খেতাব পান। তাঁর সময়েই স্কুলের ফুটবল টিমটা উঠে যায় অর্থের ও উৎসাহের অভাবে।
রবিবার সকাল সাতটায় অনিরুদ্ধ হাজির হল শিবেনবাবুর বাড়ি। একতলা, দু’খানি ঘর। একটা ছোট বারান্দা, সেটাই বসার জায়গা। দরজায় টোকা দিতে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল ধুতি আর গেঞ্জিপরা একটি ছেলে। অনিরুদ্ধ একে চেনে না। মনে হল বাড়ির কাজের লোক, বছর কুড়ি বয়স।
”হেডমাস্টারমশাই আছেন?”
”আছেন।”
”বলো—।”
”অনিরুদ্ধ চক্কোত্তি দেখা করতে এসেছেন। আপনাকে চেনে না, এই শিমুলহাটিতে এমন লোক আছে নাকি? বসুন, উনি চান কচ্ছেন, একটু আগে দৌড়ে এলেন।’
”তোমার নাম কী?” অনিরুদ্ধ কৌতূহল বোধ করল ওর কথা শুনে। বলার ধরনে মনে হল মুখ্যু কাজের লোক নয়, লেখাপড়া করেছে।
”ভবতোষ… সবাই ডাকে ভবা বলে। হেডমাস্টারমশাইয়ের বেয়ারা। আমি এখানেই থাকি, সারের সব কাজকম্মো করি।”
ভবা ভেতরে চলে গেল। মিনিট তিনেক পর একটা সাদা কালো চেক লুঙ্গির ওপর খদ্দরের পাঞ্জাবি চাপিয়ে শিবেন ঘোষ বেরিয়ে এলেন। অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বলল, ”আমি আপনার স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র, নাম—।”
”শুনেছি শুনেছি, ভবা বলেছে। বসুন, চা খাবেন?”
সকালের চা খেয়েই অনিরুদ্ধ বেরিয়েছে। তার মনে হল খাব না বললে উনি ভাবতে পারেন ওজন দেখাচ্ছে।
”হ্যাঁ খাব।”
শিবেনবাবু ভেতরে গেলেন। দু’মিনিট পর ফিরে এসে বসলেন।
”প্রথমেই একটা কথা নিবেদন করি, আপনি নয়—তুমি বলবেন।”
শিবেনবাবু ভ্রূ তুলে কয়েক সেকেন্ড মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বললেন, ”তাই বলব। বয়সে বড়, তার ওপর হেডমাস্টার; বলো তোমার আগমনের কারণ।”
”এই স্কুলেই আমার গোলকিপিংয়ের হাতেখড়ি। তখন নিয়মিত ইন্টার—ক্লাস ম্যাচ খেলা হত স্কুলমাঠে। গেমস টিচার প্রতাপবাবু টিম করতেন, খেলাতেন। স্কুলের ফুটবল টিম ছিল, আমরা সাবডিভিশনাল, ডিস্ট্রিক্ট স্কুল টুর্নামেন্টে খেলতুম, চ্যাম্পিয়ানও হয়েছি। এই স্কুল থেকেই দু’জন বেঙ্গল টিমে খেলেছি অল ইন্ডিয়া স্কুল চ্যাম্পিয়ানশিপে কুড়ি বছর আগে। এই স্কুলের চারজন কলকাতায় ফার্স্ট ডিভিশনে খেলেছে। ফুটবলের একটা ঐতিহ্য ছিল স্বরূপানন্দ স্কুলের, সেটা এখন আর নেই।”
