”নেমে আয়, নেমে আয়।” হাত নেড়ে অমলা বলল।
”কী কত্তে গাছে উঠেছিস?” জানতে চাইল অনিরুদ্ধ।
”খেলা দেখব বোলে।” মিনমিনে অপরাধী গলায় কুড়োন বলল।
”কী বললি? খেলা দেখব বোলে? এইভাবে খেলা দেখা? নাম, নাম, শিগগির নাম।” অনিরুদ্ধ হাসবে না রাগবে ঠিক করতে পারছে না।
পাঁচিল থেকে দু’হাত ওপরে ঝুলছে কুড়োন, অনিরুদ্ধর কথায় ডাল থেকে হাত ছেড়ে দিয়ে জোড়াপায়ে পাঁচিলে পা ঠেকিয়েই ছ’ফুট উঁচু থেকে লাফিয়ে নামল উঠোনে। অনিরুদ্ধ একতলায় নেমে গিয়ে আলো জ্বালল। কান ধরে কুড়োনকে টেনে নিয়ে দোতলায় এল।
ওকে দেখেই অমলা বলল, ”এই বাঁদর, গাছে ঝুলে ফুটবল খেলা দেখা, তাও মাঝরাত্তিরে! অনি, ওর কানটা ছিঁড়ে দে তো! যদি পড়ে যেতিস তা হলে তো মরে যেতিস, নয়তো হাত—পা ভেঙে চিরকাল নুলো খোঁড়া হয়ে থাকতিস।”
”কার খেলা দেখতে গাছে উঠেছিলি?” অনিরুদ্ধ কৌতূহলী হয়ে জেরা শুরু করল।
চোখ নামিয়ে কুড়োন চুপ।
অনিরুদ্ধ খোলা দরজা দিয়ে ঘরের টিভি সেট আর বটগাছের দিকে তাকিয়ে দূরত্বটা মাপল, প্রায় বারো—চোদ্দো গজ তো হবেই। অত দূর থেকে কি টিভিতে খেলা দেখা যায়?
”বল তো ক’টা গোল হয়েছে?” অনিরুদ্ধ পরীক্ষা করার জন্য বলল।
”পাঁচটা।” কুড়োন কিছুটা ভরসা পেয়ে সহজ গলায় বলল।
”শেষ গোলটা দেখেছিস? বল তো কী করে হল?”
”লোকগুলো লাইন করে দাঁড়াল, তাদের মদ্যি দিয়া শট লইয়া চালায়ে দিল বলটা।” কুড়োনের গলায় উদ্দীপনার ছোঁয়া লাগল।
কী ভেবে অনিরুদ্ধ বলল, ”তুই পারবি অমন শট করতে?”
কুড়োন চুপ করে রইল পাঁচ—ছ’ সেকেন্ড, তারপর বলল, ”শিখিয়ে দিলে পেরাকটিস করব।”
ওরা তিনজন মুখ—চাওয়াচাওয়ি করল। অনিরুদ্ধ আশা করেনি এমন একটা উত্তর পাবে, মনে মনে সে খুশি হল। ছেলেটা ‘পারব না’ বলেনি।
”কবে থেকে গাছে উঠছিস?” অমলা বলল।
”পেরথমদিন থেকে।”
অমলার মুখ থেকে একটা ‘উউউ’—এর মতো আওয়াজ বেরিয়ে এল বিস্ময় চাপতে গিয়ে, ”কুড়ি—পঁচিশদিন ধরে রোজ গাছে উঠছিস খেলা দেখার জন্য! অনি, এটা তো পাগল।”
অনিরুদ্ধ বলল, ”খেলা দেখবি তো বললেই পারতিস, অলুকে তো চিনিস, ওকে বললি না কেন খেলা দেখব।”
কুড়োন দু’বার অলুর দিকে তাকিয়ে বলল, ”ওরা আমায় খেলতে নেয় না, টিভি দেখতে দেবে?”
”হ্যাঁ দেবে।” অনিরুদ্ধ বলল, ”কাল থেকে তুই এই ঘরে বসে খেলা দেখবি, এখন যা। তোর দাদু কেমন আছে?”
”ভালা আছে।”
কুড়োন নীচে নেমে গেল, তার সঙ্গে অলু, সদর দরজায় খিল দেওয়ার জন্য। নামতে নামতে অলু বলল, ”তুই মামাকে বলতে গেলি কেন খেলতে নেয় না? আমি নেওয়া না—নেওয়ার কে? দিপুদা আর দেবুই তো নাটের গুরু।”
ভ্রূ কুঁচকে কুড়োন বলল, ”এখন তো এই কথা বলছ, তখন তো কিছু বলো নাই, পতিবাদ করো নাই।”
”করলে আমাকেও বার করে দিত।”
”দিত তো দিত। খেলতে জানলি তুমি সব কেলাবে চান্স পাবে।” ঠোঁট ওলটাল কুড়োন তাচ্ছিল্যভরে।
অমলা তখন অনিরুদ্ধকে বলছে, ”এরকম পাগল ছেলে আর কাউকে কখনও দেখেছিস?”
মাথা নেড়ে অনিরুদ্ধ বলল, ”না দেখিনি। তবে সুযোগ পেলে এরকম পাগলামি কিন্তু অনেকেই দেখাবে, কুড়োন সুযোগ পেয়েছে তাই দেখাচ্ছে। ওর পাগলামিটাকে এবার ঠিক রাস্তায় নিয়ে যেতে হবে।”
”ছেলেটার আছে কে? মুখখানি বেশ মিষ্টি, দেখলে মায়া হয়।”
”ওর মায়ের জ্যাঠা রাখাল। সে ছাড়া কুড়োনের আর কেউ আছে বলে জানি না। দাদামশাইকে সাপে কেটেছে, বাবাকে বাঘে নিয়ে গেছে, মাকে কুমিরে, ছেলেকে নিয়েছে ফুটবলের ভূতে, ভাবছি এবার ওকে নেব আমি।”
পরদিন থেকে কুড়োন খেলা দেখতে আসতে লাগল। ধীরে ধীরে সে সহজ হয়ে গেল এই বাড়ির লোকেদের সঙ্গে, অনিরুদ্ধকে সে অলুর মতোই মামা বলে ডাকতে শুরু করল, অমলাকে মাসিমা। দেয়ালে ঠেস দিয়ে মেঝেয় টিভি সেটের মুখোমুখি হয়ে খেলা দেখে, খাটে অনিরুদ্ধ আর অলু।
”অলু, গোলকিপারকে দ্যাখ দ্যাখ, গোল খাবে এবার…আহহ বাইরে মারল।” খেলার সঙ্গে অনিরুদ্ধর ব্যাখ্যাও চলে। ”তুই কী করতিস অলু? ওইভাবে গোললাইনে দাঁড়িয়ে থাকতিস ব্যাক পাস করছে দেখে?”
”হ্যাঁ থাকতুম।” বেশ জোর দিয়েই অলু বলল, ”অপোনেন্টের দুটো ফরওয়ার্ড সামনে। ব্যাক পাসটা কে পাবে জানি না। হুড়মুড় করে বেরিয়ে পাসটা ধরে ফেলতে যদি না পারি তা হলে কী হবে? তার থেকে বরং গোলে দাঁড়িয়ে এসপার—ওসপার একটা চেষ্টা করা যায়।”
”এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাটা, কখন কোথায় বেরোব কি বেরোব না, আমার খুব ভাল ছিল না।” অনিরুদ্ধ স্বীকার করে নিয়ে বলল, ”দু—তিন সেকেন্ডের মধ্যেই তোকে ঠিক করে নিতে হবে কী করব…আরে আরে কী স্পিডের ওপর বলটা না থামিয়েই ঘুরিয়ে পাসটা করে দিল, দেখেছিস কুড়োন?
দেয়ালে ঠেস দেওয়া কুড়োন তখন সিধে হয়ে বসে দু’চোখ দিয়ে সেটটাকে গিলছিল। শুধু বলল, ”হ।”
”পারবি ওভাবে পাস দিতে?”
সেট থেকে চোখ না সরিয়ে কুড়োন বলল, ”পেরাকটিস করতে হবে।”
চব্বিশ বছর পর ফাইনালে উঠল ব্রাজিল, অন্যদিক থেকে ইতালি এবার নিয়ে পঞ্চমবার। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে অনিরুদ্ধ খুঁটিয়ে খবরের কাগজ পড়েছে, লক্ষ রেখেছে নামীরা কে কেমন ফর্মে রয়েছে। ইতালির সেরা স্ট্রাইকার রোবার্তো বাজ্জিও প্রথম রাউন্ডে খোঁড়াচ্ছিল, ডান গোড়ালিটা ফুলে রয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে সে ঝকমক করে উঠল। নকআউট পর্যায়ের তিনটি ম্যাচে পাঁচটি গোল দিয়ে এই লোকটি ইতালিকে প্রি—কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে টেনে এনেছে ফাইনালে। অনিরুদ্ধ দেখেছে কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যাচের শেষ মিনিটে জয়সূচক গোলটি দেওয়ার পর রোবার্তো ক্লান্তিতে টলে পড়ে যাচ্ছিল, দু’হাত তুলে উচ্ছ্বাস জানাবার মতো জোরও ছিল না শরীরে।
