রাতের খাওয়া চুকিয়ে অমলা আর অলু টিভির সামনে দেয়াল ঘেঁষে দুটো চেয়ারে বসল, খাটে অনিরুদ্ধ। ওপেনিং সেরিমনি শেষ হতেই অমলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল; স্কুলে যাওয়ার জন্য সাড়ে আটটায় তাকে বেরোতে হয়, তাই ভোরে ঘুম থেকে ওঠার জন্য তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়াটা খুব জরুরি। প্রতি রাতে দুটি করে ম্যাচ, দ্বিতীয়টি শেষ হতে হতে রাত আড়াইটে বেজে যাবে, সুতরাং অলু দ্বিতীয় ম্যাচ দেখবে না, পরদিন তার স্কুল আছে। তবে মামাকে ধরে মায়ের কাছ থেকে সে দ্বিতীয় ম্যাচ দেখার জন্য অনুমতি নিয়ে রেখেছে, অবশ্য যদি জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেন্তিনা, ইতালি বা হল্যান্ড তাতে খেলে। অনিরুদ্ধ দিদিকে বুঝিয়েছিল এই বলে—”সারা পৃথিবীর ছাঁকা ছাঁকা সেরা প্লেয়াররা খেলতে আসবে। ওদের খেলা দেখাটাও অলুর কাছে শিক্ষার ব্যাপার। তা ছাড়া পৃথিবীর ফুটবল এখন কোন জায়গায় রয়েছে বা পৌঁছতে যাচ্ছে তার আন্দাজ পাবে, কীভাবে খেলাটা হচ্ছে সেটা ওর বোঝা দরকার, শুধু কলকাতা আর শিমুলহাটির ফুটবল দেখে ও তো এক পাও এগোতে পারবে না। দিদি ওকে দেখতে দাও, ক’টা দিন মাত্র তো খেলা হবে, তারপর তো আবার চার বছর বিশ্বকাপের জন্য অপেক্ষা করা!” গজগজ করতে করতে অমলা ভাইয়ের কথা মেনে নেয়।
রাতের পর রাত মামা—ভাগ্নের বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ দেখা চলতে লাগল। অনিরুদ্ধ তার প্রতিজ্ঞামতো সাতদিন পরই স্কুটার চালিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে অবাক ম্যানেজারের হাতে ডাক্তারের সার্টিফিকেট দিয়ে বলল, ”আমার মা নেই, বিয়েও করিনি, অতএব বউ নেই, দেশেও কোনও বাড়ি নেই, সুতরাং নিশ্চিন্ত থাকুন ছুটির জন্য আর দরখাস্ত করব না।”
বিশ্বকাপ একসময় কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছল। এবার আটটা দল নকআউট ম্যাচ খেলবে। অনিরুদ্ধ দাগিয়ে রেখেছে ইউরোপের বাইরের একমাত্র দল ব্রাজিলকে। ওদের খেলা হল্যান্ডের সঙ্গে। ম্যাচটা তাকে মন দিয়ে দেখতে হবে। গত ষোলো বছর ব্রাজিল সেমিফাইনালে ওঠেনি, এবার পারবে কি? যদি পারে তা হলে অলুকে নিক্কো পার্ক দেখিয়ে আনবে। বলা বাহুল্য, অলু তক্ষুনি ব্রাজিলের সমর্থক হয়ে পড়ল।
ব্রাজিল প্রথম আধঘণ্টা চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে অসাধারণ ফুটবল খেলল কিন্তু গোল পেল না। গোল হব হব হলেই অলু বিছানায় ঘুসি মারতে থাকে উত্তেজিত হয়ে, তারপরই মাথায় হাত চেপে ফ্যালফ্যাল করে মামার দিকে তাকায়। অনিরুদ্ধ তার পিঠে হাত রেখে বলে, ”শান্ত হয়ে বোস। গোল ঠিকই হবে।” হলও, তবে সেকেন্ড হাফে, পরপর দুটো গোল দিল ব্রাজিল। অনিরুদ্ধ মুখ টিপে হেসে বলল, ”কী বলেছিলুম, একটা নয় দু—দুটো গোল। তোকে তা হলে নিক্কো পার্কে নিয়ে যেতেই হচ্ছে।” বাজি হারার জন্য তাকে খুশিই মনে হচ্ছে।
কিন্তু খুশির ভাবটা কয়েক মিনিটের মধ্যেই মুখ থেকে মুছে গেল যখন হল্যান্ড খেপে উঠে পনেরো মিনিটের মধ্যে গোল দুটো শোধ করে দিল। এর পর হল্যান্ডের পেনাল্টি এরিয়ার প্রায় দশ গজ বাইরে ফ্রিকিক পেল ব্রাজিল। অনিরুদ্ধর মনে হল না এটা ফাউল, রেফারি বাড়াবাড়ি করল। শট নেমে ব্র্যাঙ্কো, সামনে পাঁচজনের দেয়াল। ব্রাজিলের দু’জন সেই দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। অনিরুদ্ধ বলল, ”অলু, গোলকিপারকে দেখ কোথায় দাঁড়াচ্ছে। বল দেখতে পাচ্ছে না, চেঁচিয়ে নিজের প্লেয়ারদের বলছে একটু ফাঁক হয়ে দাঁড়াবার জন্য।”
গোলকিপার দুই পোস্টের মাঝামাঝি জায়গায় কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে। প্রায় তিরিশ গজ দূর থেকে ব্র্যাঙ্কো শট নেবে। সে শট নিল। দেয়ালে একটা ছোট্ট ফাঁক। শটটা বাতাসে বেঁকে সেই ফাঁকের মধ্য দিয়ে গলে গিয়ে আরও বাঁকতে বাঁকতে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকা গোলকিপারকে দাঁড় করিয়ে রেখে দূরের পোস্টে ধাক্কা দিয়ে গোলে ঢুকে গেল। সারা মাঠের মতো ঘরের দু’জনও স্তম্ভিত!
উত্তেজনা চেপে অনিরুদ্ধ প্রথম কথা বলল, ”ওইরকম আউট সুইঙ্গার! গোলকিপারের কিছু করার ছিল না।” দেয়াল—ঘড়ি দেখে বলল, ”আধঘণ্টায় পাঁচটা গোল, খেলা বটে!”
”বাব্বা, কতখানি বেঁকে গেল বলটা!” অলু চোখ প্রায় কপালে তুলে ফেলল।
”দেখলি তো ওয়ার্ল্ড ক্লাস শট কাকে বলে?”
ফ্রিকিকটা রিপ্লেতে তিনবার তিনদিক থেকে দেখাল। ওরা গভীর মনোযোগে যখন দেখছে তখনই বারান্দার বাইরে বটগাছটায় ঝর ঝর ঝর ঝপাত করে শব্দ হল। যেন গাছের ডাল ভেঙে পড়ল। চমকে উঠে অলু মামার গা ঘেঁষে সরে এল। ওর একটু ভূতের ভয় আছে।
”কী ব্যাপার রে অলু, দ্যাখ তো!”
খাট থেকে ঝুঁকে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অলু বলল, ”ঘুটঘুটে অন্ধকার।”
অনিরুদ্ধ বারান্দায় বেরিয়ে এসে বলল, ”তোদের টর্চটা নিয়ে আয়। চোরটোর হতে পারে। বটগাছ দিয়ে উঠোনে নামল কিনা দেখি।”
অলু ঘর থেকে একটা তিন ব্যাটারির টর্চ আনল, সঙ্গে ঘুম থেকে ওঠা অমলা। সে বলল, ”আমার ছোটবেলায় একবার একটা চোর বটগাছ ধরে নেমে উঠোনে লাফিয়ে পড়েছিল। ধরা পড়ে বাবার হাতে বেদম মার খায়।”
অনিরুদ্ধ টর্চ জ্বালিয়ে বটগাছের মগডাল দেখল, তারপর রশ্মিটা নীচের দিকে নামাতে নামাতে থেমে গিয়ে মুখ দিয়ে শব্দ করল, ”আরে!”
অলু আর অমলাও বলে উঠল ”এ কী!”
দু’হাতে গাছের ডাল ধরে বাদুড়ের মতো ঝুলছে কুড়োন।
”অ্যাই, তুই এখানে এত রাতে?” অনিরুদ্ধ চেঁচাল।
