.
স্কুল থেকে তিন মিনিট হাঁটলে হেডমাস্টার শিবেনবাবুর একতলা ভাড়াবাড়ি। অনিরুদ্ধ স্থির করল রবিবার ওঁর বাড়িতে গিয়েই দেখা করবে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল পর্যায়ের ম্যাচগুলো চারদিন পর শুরু হতে চলেছে। টিভি সেটে ছবি ভাল আসছে না, ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতো দেখাচ্ছে, বোধ হয় কেবলের তারে গোলমাল। কেবল অপারেটরকে সে বাড়ি থেকে দু’বার ফোন করেছিল, রিং হয়ে গেছে, কেউ ধরেনি। সে বুঝে গেল ফোন খারাপ, ঠিক করল শনিবার বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় খবর দিয়ে আসবে।
শনিবার বিকেলে অনিরুদ্ধ স্কুটার চালিয়ে কলাইখোলার মোড়ে পৌঁছে ইতস্তত করে ডান দিকে ন্যাড়ামন্দিরের রাস্তাটা ধরল। রাস্তা না বলে এটাকে মাইন বিস্ফোরিত যুদ্ধক্ষেত্র বলাই ভাল। সিটে বসে ঝাঁকুনির দাপটে তার মনে হল বোধ হয় স্কুটার থেকে ছিটকে পড়ে যাবে। মিনিট দুই পর সে যখন ভাবছে, আর নয় এবার ফিরে যাই, তখনই চোখে পড়ল ভাঙা একটা শিবমন্দির। তার পাশে একটা পোড়ো জমি। দু’দিকে বাঁশের খুঁটি দিয়ে তৈরি গোল, ক্রসবার হয়েছে নারকেলদড়ি।
অ্যাশশ্যাওড়া আর ফণিমনসা গাছের ফাঁক দিয়ে অনিরুদ্ধ দেখতে পেল গুটিদশেক ছেলে আদুড় গায়ে একটা লালরঙের বড় রবারের বল নিয়ে খেলছে। কুড়োনকে সে একনজরেই চিনতে পারল তার গায়ের ঢলঢলে সবুজ গেঞ্জি আর পায়ের কেডস দেখে। ওকে মনে হচ্ছে হাঁসের দলে যেন একটা বক। মাঠটা বড় বড় ঘাসে ঢাকা কিন্তু উঁচু—নিচু বেশিরভাগ ছেলেই মাঝমাঠে বল নিয়ে এলোমেলো পা চালাচেছ। বলে পা লাগলে বলটা একজনের গায়ে লেগে ছিটকে আর একজনের কাছে যাচ্ছে। কুড়োন এই গোঁতাগুঁতির বাইরে দাঁড়িয়ে। একবার বলটা ছিটকে তার কাছে এল, কুড়োন বল ধরে গোলকিপারকে দেখল, তারপর প্রায় পনেরো গজ দূর থেকে বলটা আলতো মারলো। দড়ি আর বাঁশের কোণ দিয়ে গোল হয়ে গেল।
.
এইটুকু দেখেই অনিরুদ্ধ স্কুটারে স্টার্ট দিল। তার যা দেখার আর বোঝার, তা হয়ে গেছে। ছেলেটা এখানে খেলে নিজেকে নষ্ট করছে। খানাখন্দ, ঢিবির উপর দিয়ে স্কুটারটা টলতে টলতে চলেছে। সে লক্ষ করেনি শিংওলা একটা গোরু তার সামনে দশহাত দূরে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। পেছনে একটা বাছুর। অনিরুদ্ধ হর্ন বাজাল। টিয়াপাখির কর্কশ ডাকের মতো আওয়াজ শোনায় অনভ্যস্ত গোরুটা চমকে উঠে মাথা নামিয়ে এগিয়ে এল, অনিরুদ্ধ তাড়াতাড়ি স্কুটারটা ডান দিকে ঘোরাতেই একটা গর্তে পড়ে গেল চাকা। কাত হয়ে সে স্কুটারসমেত গড়িয়ে পড়ল। পাশ দিয়ে চলে গেল গোরুটা।
স্কুটারের তলা থেকে ডান পা টেনে বার করে সে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝল হাঁটুতে গোলমাল ঘটে গেছে, যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। বছরদশেক আগে ওখানে যে চোটটা পেয়েছিল একটা লাথি খেয়ে, যার জন্য লিগের সাতটা খেলায় মাঠে নামতে পারেনি। দুটো ম্যাচ খেলেই আবার বসে গিয়েছিল সারা সিজনের জন্য, ঠিক সেখানেই চোটটা লাগল। স্কুটারটা তুলে দাঁড় করিয়ে সে স্টার্ট দিয়ে কোনওক্রমে উঠে বসল। কেবল অপারেটরের কাছে যাওয়া এখন শিকেয় তোলা থাক, অলুকে দিয়ে খবর দিলেই হবে, হেডমাস্টারমশাইয়ের বাড়িতেও পরে যাওয়া যাবে। তার আগে এখন বাড়ি ফিরে বরফজল আর গরমজল পরপর হাঁটুতে ঢেলে যন্ত্রণাটা কমাতে হবে, তারপর ডাক্তার দেখানো।
সেই রাত্রেই অলু ডাক্তার ডেকে আনল। সব শুনে এবং হাঁটু পরীক্ষা করে তিনি জানালেন গুরুতর কিছু নয় সাতদিন বিছানায় থাকতে হবে, নড়াচড়া একদম নয়। বাড়িতে ক্রেপ ব্যান্ডেজ ছিল। তাই দিয়ে হাঁটুটা শক্ত করে জড়িয়ে দিয়ে তিনি একটা মলম লিখে দিলেন, দিনে তিনবার পুরু করে লাগাতে হবে।
ডাক্তারের নির্দেশমতো অনিরুদ্ধ বিছানাবন্দি হল। অলু কেবল অপারেটরকে খবর দিতেই তাদের লোক এসে তার ঠিক করে টিভির ছবি স্পষ্ট করে দেয়। টেবলে রাখা টিভি সেটটা ঘুরিয়ে দিতে হল, কেননা বিছানায় পা ছড়িয়ে বালিশে ঠেশ দিয়ে দেখতে হলে সেইটাকে দরজার দিকে মুখ করে রাখতে হবে।
টেলিফোন করে ম্যানেজারকে অনিরুদ্ধ জানিয়ে দিল তার দুর্ঘটনার ব্যাপারটা। কবে অফিস যেতে পারবে তা এখনই বলতে পারছে না, ডাক্তার অনুমতি দিলেই যাবে। ম্যানেজার রসিক মানুষ, তিনি বললেন, ”বিশ্বকাপে বাহান্নটা ম্যাচ, সবগুলো দেখলে চোখের বারোটা বেজে যাবে।”
শুনে আঁতকে উঠে অনিরুদ্ধ বলে, ”না না স্যার, পায়ের চোটটা কিন্তু সত্যি—সত্যিই। বড়জোর সাতদিন রেস্ট নেব।”
প্রৌঢ় ব্যাঙ্ক ম্যানেজার আহত স্বরে জবাব দিলেন, ”আহহা, আমি কি বলেছি তুমি মিথ্যে মিথ্যে বলছ। এই দ্যাখো না তিনটে ছুটির দরখাস্ত পেলাম, একজনের মায়ের গলব্লাডার অপারেশন হবে, আর একজনের বউয়ের বাচ্চচা হবে, তৃতীয়জনের দেশের বাড়ির ছাদ ভেঙে পড়েছে, মেরামত করতে যাবে। সবাই ছুটি চেয়েছে যে তারিখগুলোয়, তার মধ্যেই পড়ছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ফাইনাল—সাতটা খেলা, সবক’টাই স্যাংশন করে দেব।”
শোনামাত্র অনিরুদ্ধ স্থির করল সাতদিনের মধ্যে সে অফিসে যাবে। একটা দিনও কামাই করবে না, ডাক্তারের নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলবে, কাঠের গুঁড়ির মতো বিছানায় পড়ে থাকবে। সাতদিনও গেল না তিনদিনের মাথায় সে খাট থেকে নেমে ঘরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা করল। হাঁটুতে খচখচ করতেই সে হাঁটা থামিয়ে শুয়ে পড়ে। সেইদিনই ছিল বিশ্বকাপের প্রথম খেলা।
