অলু চোখ বড় করে মামার কথা শুনছিল। বলল, ”মুর্মু ফিট হল?”
”না পায়ের গোছ ফুলেই রইল। ইঞ্জেকশন দিয়েও ব্যথা কমানো গেল না।”
”ওড়িশার সঙ্গে ম্যাচটার কী হল?”
”টাইব্রেকারে জিতলুম, ফাইভ—ফোরে। একসময় ছিল ফোর—ফোর।”
”লাস্ট শটটা কাদের ছিল?” অলু উৎকণ্ঠিত কৌতূহল নিয়ে বলল।
”ওদের।’ নিস্পৃহ গলায় বলল অনিরুদ্ধ।
”বাইরে মারল?” অলুকে আরও উৎকণ্ঠিত দেখাল।
অনিরুদ্ধ মুখ নামিয়ে রুটি ছেঁড়ায় ব্যস্ত হল। অমলা বলল, ”অনি বলবে কী, আমি বলছি। তোর মামা ডানদিকে ঝাঁপিয়ে বলটা ধরে নেয়। কাগজে বড় করে হেডিং দিয়েছিল ‘বাংলাকে ফাইনালে তুলল অনিরুদ্ধ’। অলু তুই তখন একমাসের, তোর এসব জানার কথা নয়। হ্যাঁরে অনি তোর কাছে কাগজের কাটিংটা আছে?” ভাইয়ের জন্য গর্বে অমলার চোখমুখ ঝকঝক করে উঠল।
”কাটিং ফাটিং আমি রাখি না। বুড়ো বয়সে বেতো শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাটিং দেখব আর লোকেদের দেখাব আমি কী ছিলুম। ওসব ব্যাপারে আমি নেই। যদি কিছু খেলে থাকি তা হলে লোকে এমনিই মনে করে রেখে দেবে। দেশের লোকে কপিলদেব, গাওস্করকে মনে করে রেখে দেবে, লিয়েন্ডার পেজকেও মনে রাখবে, আমি তো তেমন কিছু করিনি যে মনে করে রাখবে, তাহলে কাটিং জমিয়ে রেখে লাভ কী?” অনিরুদ্ধ নিচু স্বরে ধীরে ধীরে বলল। এর পর সবাই নীরবে খাওয়া শেষ করল।
রাতে খাওয়ার পর অন্তত আধঘণ্টা ছাদে পায়চারি করে অনিরুদ্ধ। এটা সে ছেলেবেলায় বাবাকে দেখে শেখে। ‘এই পায়চারিটা খুব দরকার। হজম সাহায্য করে স্বাস্থ্যকে। স্বাস্থ্য সাহায্য করে খেলাকে।’ অঘোর ছেলেকে কথাগুলো বলেছিলেন। তারপর থেকেই সে খেলায় সাহায্য করে এমন সবকিছুকেই মেনে চলতে শুরু করে। আর এটা সে অলুর মাথাতেও ঢুকিয়ে দিয়েছে।
ছাদে পায়চারির সময় অনিরুদ্ধ গোলকিপিংয়ের নানান বিষয় নিয়ে কথা বলে, নিজের অভিজ্ঞতার গল্প ভাগ্নেকে শোনায়। আজ সে অলুকে জিজ্ঞেস করল, ”তোদের তিনটে ছেলেকে কুড়োন কাটালো চারবার, কী করে করল বল তো?”
”প্রথমে দেবুর মুখোমুখি হল, তারপর শরীরটা বাঁয়ে হেলিয়েই ডান দিকে হেলাল, দেবু একটু টলে গেল তখুনি বিদ্যুৎগতিতে কুড়োন শরীরটাকে একটু বাঁ দিকে ফিরিয়ে দেবুকে আড়াল করে ওর বাঁদিক দিয়ে বল পায়ে রেখে চলে গেল, বলটা ডান পায়ে আঠার মতো লেগে ছিল আর একটা ঝলকানির মতো এত ফাস্ট চলে গেল না! দেবু ঘুরতে ঘুরতে কুড়োন তখন শ্যামলকেও কাটিয়ে ফেলেছে, ওইভাবেই আবার জ্যোতিকে। একবার বাঁ দিক দিয়ে আর দু’বার ডান দিক দিয়ে—কী বলব মামা, ওই রোগা কালো ছেলেটা যেন কেউটের মতো তিনটে ছোবল দিয়ে বলটা নিয়ে গেল। আমরা তো থ! দেবুর মুখ থমথমে হয়ে গেল। ও দাঁত চেপে বলল, ‘অ্যাই ব্যাটা আবার কর তো।’ তিনজনেই রেডি হয়ে দাঁড়াল ওকে আটকাবার জন্য। কুড়োন এবার করল কী, প্রথমবার দেবুর বাঁ দিক দিয়ে গেছল এবার গেল ডান দিক দিয়ে একইভাবে, তারপর শ্যামল আর জ্যোতিকে কাটিয়ে আমার সামনে এসে পড়ল।”
”তুই তখন করলি কী?” অনিরুদ্ধ বলল।
”কী আবার করব, দিলুম একটা ডাইভ ওর পা লক্ষ্য করে।”
”ও তখন করল কী?”
”ও যেন জানত আমি কী করব, টুক করে বলটা পায়ে সরিয়েই আলতো করে আমার মাথার ওপর দিয়ে গোলে পাঠিয়ে দিল।” অলুর গলা দিয়ে ঝরে পড়ল একরাশ লজ্জা। অনিরুদ্ধ বুঝে গেল কুড়োনের শুধু অসাধারণ স্কিলই নয়, আছে বুদ্ধি আর ঠান্ডা মাথা, আর এই ছেলেটাকেই দিপুদা কিনা চড় মেরে বার করে দিল!
”অলু, তুই বড় গোলকিপার হতে চাস?”
অবাক হয়ে অলু বলল, ”কে না চায়?”
অনিরুদ্ধ হাঁটা থামিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে অলুর দু’কাঁধে হাত রেখে বলল, ”তা হলে কুড়োনের সঙ্গে প্র্যাকটিস কর। কালীতলার মাঠে তো হবে না, অন্য কোথাও। কুড়োন এখন খেলে কোথায়?”
”ঠিক জানি না। খোঁজ নিয়ে বলব তোমায়।”
পরের দিনই অলু খোঁজ নিয়ে তার মামাকে বলল, ”তেলিপাড়ায় ন্যাড়া মন্দিরের পাশে যে পোড়ো জমিটা রয়েছে, কুড়োন সেখানে গিয়ে ওখানকার ছেলেদের সঙ্গে খেলে। ন্যাড়ামন্দির বালক সঙ্ঘ নামে ওদের একটা ক্লাবও আছে।”
অনিরুদ্ধ বলল, ”ন্যাড়ামন্দির তো এখান থেকে দেড়—দু’মাইল দূরে! খেলবে বলে কুড়োন রোজ অতদূর যায়!” ফুটবল খেলার জন্য ছেলেটার এই উৎসাহ তাকে আরও কৌতূহলী করে তুলল। সে ঠিক করল স্কুলের হেডমাস্টারমশাইকে বলে সকালে স্কুলের মাঠে ছেলেদের খেলা শেখাবে আর কুড়োনকে ছাত্রদের দলে ভিড়িয়ে নেবে। স্কিল আর টেকনিকের সঙ্গে পরিচয় হওয়াটা এই বয়সেই দরকার।
অনিরুদ্ধ ভারত দলের ক্যাম্পে বিদেশি কোচের প্রশিক্ষণ পেয়েছে। কোচিং সম্পর্কে তার জ্ঞানের পুঁজি সেটাই। তা ছাড়া ক্লাব স্তরের কোচদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখেছে। সে মনে করে ছোটদের প্রাথমিক পাঠ দেওয়ার মতো ফুটবল—বিদ্যে তার আছে। খরচ করার মতো টাকাও তার আছে বা জোগাড় করতে পারবে। আসল দরকার নিজের উৎসাহটাকে জিইয়ে রাখা। তার বিশ্বাস, আমাদের মতো ফুটবলে পিছিয়ে থাকা গরিব দেশে, বড় বড় অ্যাকাডেমি করার আগে বেশি দরকার খেলা শেখার ছোট ছোট পাঠশালা। সে পাঠশালাই খুলবে। ফুটবল তাকে নাম যশ অর্থ দিয়েছে। এখন তার কিছুটা সে ফুটবলকে ফিরিয়ে দেবে, এটা তার নৈতিক কর্তব্য।
