রাখাল যখন ভাইয়ের জামাই শশধরের মৃত্যু বৃত্তান্ত শোনাচ্ছিল অনিরুদ্ধ তখন দেখছিল টিউবওয়েলে জল খাচ্ছে ছোট্টখাট্ট পাতলা গড়নের একটা ছেলে। গায়ের রং ঘোর কালো, মাসখানেক আগে ন্যাড়া হওয়া মাথায় এখন কদমফুলের মতো চুল। মুখে মাথায় জল থাবড়ে ছেলেটা তাদের দিকে একবার তাকিয়ে ধীরে হেঁটে স্কুলবাড়ির আড়ালে চলে গেল। গায়ে ঢলঢলে হাঁটু পর্যন্ত ঝোলা সবুজ রঙের গেঞ্জি। অলুকে এই গেঞ্জিটা সে একসময় পরতে দেখেছে। সে বুঝে গেল এটা দিদিই দিয়েছে রাখালের নাতির জন্য।
”অই হল কুড়োন। বাপরে বাঘে লয়, মারে লয় কুমির। চিংড়ির মীন তুলতে অর মা নদীতে নামছিল দু—তিনজনের সঙ্গে, কুমিরে টাইন্যা লইয়া যায়। আমার ভাই অরে নিয়া আসে তখন চার বছর বয়স, ভাইরেও সাপে কাটল। শেষে অরে আমি এখানে নিয়া আইলাম। এখন বয়স বারো।”
অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করল, ”সারাদিন ও করে কী?”
রাখাল মাথা নেড়ে বলল, ”কিসসু করে না, খালি ঘুইরা বেড়ায়।
অনিলের হোটেলে ফাইফরমাশ খাটার কামে দেছিলাম, দুই টাকা রোজ আর খোরাকি। তিনদিন কাম কইরা বলল, আর করব না। অরে ধরছে ফুটবলের ভূতে।”
কথাটা শুনেই অনিরুদ্ধর মনে হল, রাতে ধপধপাস শব্দগুলো তা হলে কুড়োনেরই তৈরি।
অনিরুদ্ধের কৌতূহল বেড়ে গেল, বলল, ”ফুটবলের ভূত ব্যাপারটা কী?”
”ব্যাপার আর কী, সকালে কালীতলার মাঠে গিয়া ছোটদের সঙ্গে খেলতে চাইত। ছেলেরা ওকে তাড়ায়ে দিত, খেলায় নিত না। একদিন একটা বল পায়ে নিয়া তিনটা ছেলেরে কইল আমারে আটকাও তো, ছেলেগুলাকে চারবার কাটায়ে কুড়োন হাসতাছিল, তহনই একজন খুব রাইগা গিয়া অর বুকে ঘুসি মারে, কুড়োনও পালটা মারে। পুরো ব্যাপারটা লক্ষ করে দীপক। অরে চেনো তো, তোমার ছারকেলাস উঁচুতে পড়ত, এখন কালীতলা কেলাবে ছোটদের খেলা শিখায়, কোচ।”
দীপক কর্মকারকে অনিরুদ্ধ চেনে, পাশের মোচাবেড়িয়ায় বাড়ি। সে যখন ইন্টার—ক্লাস প্রথম ম্যাচে খেলে বিখ্যাত হল, দিপুদা সেই বছর উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে পড়তে যায় কলকাতায়। রাজস্থান, বাটা হয়ে শেষে ইস্টার্ন রেলে খেলেছিল। চাকরি করে শিয়ালদায়, রেলের অফিসে।
”দীপক কুড়োনরে মাঠ থেকা বাইর কইরা দেয় দুইটা থাপ্পড় লাগায়ে। বলে দেয় আর কক্ষনও তার পারমিশান না লইয়া ক্লাবের ছেলেদের সনে যেন না খেলে। তুমি বরং তোমার ভাগ্নারে জিজ্ঞাসা কইরা লইও, সে তখন ওখানে ছিল।”
আর কথা না বাড়িয়ে অনিরুদ্ধ চলে আসে। আসার আগে রাখালকে মনে করিয়ে দিল, ”কাল সকালে ঠিক যেও কিন্তু রাখালদা।” স্কুটারটা মাঠের ওপর দিয়ে চালিয়ে গেটের দিকে যাওয়ার সময় সে দেখল অন্ধকারে স্কুলের লম্বা দালানে পা ঝুলিয়ে একটা ছায়ামূর্তি বসে রয়েছে। অনিরুদ্ধর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল। তার মনে হল ফুটবলের ভূত ওর ঘাড়ে বসেনি, কুড়োন নিজেই ভূত হয়ে ফুটবলের ঘাড়ে বসেছে।
রাতে অলু আর অনিরুদ্ধ মুখোমুখি টেবলে খেতে বসেছে। একসময় অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করল, ”হ্যাঁ রে অলু, রাখালের নাতি সকালে তোদের সঙ্গে খেলতে যেত এখন আর যায় না, কেন রে?”
অলু অবাক হয়ে বলল, ”তোমায় কে বলল!”
”যেই বলুক, কুড়োনকে দিপুদা চড় মেরে বলেছে আর যেন তোদের সঙ্গে না খেলে?”
”হ্যাঁ। ও আমাদের ভেংচি কেটেছিল। অলু গম্ভীরস্বরে বলল।
”কেন কেটেছিল?”
অলু ইতস্তত করছে দেখে অনিরুদ্ধ বলল, ”তোদের তিনটে ছেলেকে ও চারবার কাটিয়ে বল নিয়ে গিয়ে হেসেছিল। তখন তোদের একজন ওকে ঘুসি মারে, ঠিক কি না?”
”হ্যাঁ। কিন্তু ও হাসল আবার বকও দেখাল। তাই তো রেগে গিয়ে শুভেন্দু ওকে মারল। মামা, কুড়োনও কিন্তু হাত চালিয়েছে। তখনই দীপুদা এসে ওকে চড় মারে।”
”তোদের তিনজনকে চারবার কাটিয়ে যে বল নিয়ে বেরিয়ে গেল সে তো তোদের থেকে ভাল খেলে, তা হলে তো তোদের উচিত ওকে দলে টেনে নেওয়া।”
”রাখালের নাতিকে দলে নেব!” অলু অবাক হয়ে মামার দিকে তাকাল এমনভাবে, যেন এক পাগলকে দেখছে, যে পাঁচ সেকেন্ড আগেও সুস্থ মস্তিষ্কের ছিল।
”ছেঁড়া গেঞ্জি, ময়লা প্যান্ট, খালি পা। কুড়োন আমাদের সঙ্গে খেলবে, বলো কী?”
”ধর তোদের কালীতলার সঙ্গে দুর্গাতলা স্পোর্টিং নামে একটা টিমের খেলা হচ্ছে কোনও টুর্নামেন্টে, দুর্গাতলার হায়ে নেমেছে কুড়োন। ময়লা গেঞ্জি আর ময়লা প্যান্ট পরনে, পায়ে বুটও নেই। তোরা কি বলবি কুড়োন খেললে আমরা খেলব না? তা হলে তো লোকে হাসবে, ছ্যা ছ্যা করবে।”
অমলা এতক্ষণ মামা—ভাগ্নের কথা শুনে যাচ্ছিল, এবার ভর্ৎসনার সুরে ছেলেকে বলল, ”রাখালদার নাতি বলে তোরা ওর সঙ্গে খেলবি না? এরকম মানসিকতা হল কী করে তোর অলু? চারবার যে তিনটে ছেলেকে কাটায় সে তো তোদের থেকে অনেক গুণী। গুণের কদর করতে শেখ, হলেই বা ময়লা ছেঁড়া গেঞ্জি প্যান্ট!”
অনিরুদ্ধ মিটিমিটি হাসছিল দিদির ঝাঁঝালো স্বর শুনে আর অলুর চোখে লজ্জার ছায়া পড়তে দেখে। সে বলল, ”জানো দিদি একবার ইম্ফলে সন্তাোষ ট্রফিতে মণিপুরের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলায় আমাদের স্ট্রাইকার সুধীর মুর্মু হ্যাটট্রিক করার পর খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ থেকে বেরিয়ে গেল। বেধড়ক পা চালিয়েছিল মণিপুরের ডিফেন্ডাররা সুধীরের পা লক্ষ্য করে। দু’দিন পরেই ম্যাচ ওড়িশার সঙ্গে। আমাদের গোল দেওয়ার লোক বলতে ওই সুধীর মুর্মু, ঝাড়গ্রামের ছেলে, সাঁওতাল। আমরা তো ঝাঁপিয়ে পড়লুম সুধীরের পায়ের ওপর। আমি ওর পা ধরে বরফ ঘষছি, মালিশ করছি, হাতে মাত্র দুটো দিন, ওকে ফিট করে মাঠে নামাতেই হবে। বেচারা সুধীর খালি বলছে, অনিদা পায়ে হাত দিও না, তুমি বামুনের ছেলে, আমার পাপ হবে। আমি বললুম ধেত্তোরি বামুনের ছেলে, এখন ভুলে যা ওসব! খেলার মাঠে তুই বামুন আর সব সিডিউল ট্রাইব। বেচারার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল আমার কথা শুনে।”
