রাখালের কথা শুনে অনিরুদ্ধর বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। তার বাবাও ঠিক এই কথাগুলো বার দুয়েক বলেছিলেন, তারপর হঠাৎই একদিন অফিসে যাওয়ার জন্য ভাত খেতে খেতে অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়েন, তারপর জ্ঞান আর ফেরেনি। মা অবশ্য মারা যান ক্যান্সারে মাস ছয়েক ভুগে।
”ঠিক আছে রাখালদা আমি দেখব, আমার বন্ধু এক ডাক্তার আছে এন আর এস হাসপাতালে, ওকে দিয়ে তোমায় দেখিয়ে দেব। তুমি এখন স্কুলে করো কী?”
”কী আর করব, সেই ঘণ্টাই পিটিয়ে যাচ্ছি। নতুন একটা ছোকরা এসেছে, নাম ভবা, সে—ই আমার অন্য কাজগুলো করে।”
”খেলাটেলাগুলো কে দেখছে, ভবা?”
রাখাল হেসে মাথা কাত করল।
”চলি রাখালদা, তোমাকে খবর দেব।”
অনিরুদ্ধ স্কুটারে স্টার্ট দিল। রাখাল কিন্তু কিন্তু করে বলল, ”অনি একটা কথা বলব?”
অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
”তোমার ভাগ্নের ছেঁড়া জামাপ্যান্ট যদি থাকে তা হলে একটা দিতে পারো?”
”কার জন্য?” অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। সে জানে রাখালের কোনও ছেলেমেয়ে নেই, বউও বছর পাঁচেক আগে মারা গেছে। একা থাকে স্কুলের পেছনে একটা টালির চালের ঘরে। ঘরের পাশে স্কুলের শৌচাগার। নিজের হাতে রান্না করে খায়।
”আমার ভায়ের নাতিটারে কাছে এনে রাখিছি। তোমার ভাগ্নের বয়সী।”
”দিদিকে বলব অলুর যদি কিছু পুরনো থাকেটাকে, তুমি কালপরশু এসে দিদির সঙ্গে দেখা কোরো।” এই বলে সে স্কুটার চালিয়ে দিল।
.
অনিরুদ্ধ বলেছিল বটে দিদিকে বলব কিন্তু বলতে ভুলে গেছল। এমনকী, ডাক্তারবন্ধুকে সে রাখালের কথা বলেনি। সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত মাজার সময় একতলায় দড়িতে শুকোতে দেওয়া অলুর জামা আর হাফপ্যান্ট দেখে তার মনে পড়ল রাখালের কথা। মনে মনে জিভ কেটে তখুনি সে নীচে নেমে এসে দিদি অমলাকে বলল, ”রাখাল কি তোমার কাছে এসে অলুর পুরনো জামা—প্যান্ট চেয়েছে? ওকে আমি তোমার কাছে আসতে বলেছিলুম।”
অমলা অবাক হয়ে বলল, ”কই না তো, রাখাল তো আমার কাছে আসেনি।”
”ওকে দেওয়ার মতো অলুর প্যান্ট—জামা কিছু যদি থাকে তা হলে দাও আমি অফিস যাওয়ার সময় ওকে দিয়ে যাব, আছে কিছু?”
”থাকবে না কেন, এখন তো ছ’মাস অন্তর ওর জুতো—জামা প্যান্ট ছোট হয়ে যাচ্ছে। বাব্বা! লাউডগার মতো তরতর করে লম্বা হচ্ছে ছেলেটা।”
অলু অর্থাৎ অলক দিদির একমাত্র সন্তান, স্বরূপানন্দে ক্লাস এইটে পড়ে, ওর ইচ্ছে মামার মতো গোলকিপার হবে। অনিরুদ্ধ ওকে কালীতলা ক্লাবে তার গুরু সাতাত্তর বছরের হারাধন দত্তের হাতে দিয়ে এসেছে।
অনিরুদ্ধর আধঘণ্টা আগে অমলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে। সে যাবে চারটে স্টেশন পরে দৈজুড়িতে। সেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলে সে সহ—প্রধানশিক্ষিকা। বাড়ি থেকে বেরোবার আগে অমলা একটা পলিব্যাগ ভাইয়ের হাতে দিয়ে বলল, ”রাখালকে এটা দিস, অলুর জামাপ্যান্ট আর একজোড়া কেডসও দিয়ে দিলুম, যদি পায়ে লাগে তো পরবে নয় তো তুলে রাখতে বলিস।”
অনিরুদ্ধ যখন স্কুটার চালিয়ে স্কুলের মাঠে ঢুকল প্রাইমারি সেকশনের ক্লাস তখন চলছে। হেডমাস্টারের ঘরের সামনে দালানে রাখাল কথা বলছিল এক ছাত্রের বাবার সঙ্গে।
”ও রাখালদা, একবার এদিকে এসো।”
রাখাল কাছে আসতে অনিরুদ্ধ পলিব্যাগটা তার হাতে দিয়ে বলল, ”বলেছিলুম দিদির সঙ্গে দেখা করতে, যাওনি। কেন? দিদি এটা তোমাকে দিতে বলল, দ্যাখো কী আছে।”
”যাব কী! তোমার সঙ্গে সেদিন কথা বলার পর ঘরে গিয়ে ভাত চড়াইছি তারপরই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলাম। বুকে ব্যথা।” রাখাল এর পর অনিরুদ্ধর কাছে সরে এসে ফিসফিস করে বলল, ”বড় সার জানতি পারলে সঙ্গে সঙ্গে বলবে ‘রাখাল এবার কাজ ছাড়ো।’ রিটায়ার করলি খাব কী, এই ঘর ছাড়ি চলি যেতে হবে, যাব কোথায়? আমার তো মরা ভাইয়ের এই নাতিটা ছাড়া কেউ নাই। কুড়োনরে বড় করতি হবে, কোথাও একটা কাজে ঢুকোতি হবে। এখন চাকরি গেলে মুশকিলে পড়ে যাব। তুমি কিন্তু আমার অজ্ঞান হওয়ার কথা কারুরে বোলো না।” রাখাল অনিরুদ্ধর হাত চেপে ধরল।
”না বলব না।” কথাটা বলেই অনিরুদ্ধ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল আজই সে দুপুরে তরুণের বাড়িতে ফোন করে রাখালকে দেখাবার ব্যবস্থা করবে। তারা দু’জনে কলেজ ফুটবল টিমে একসঙ্গে খেলেছে। তরুণ ফুটবলারদের চিকিৎসার জন্য ফি নেয় না। রাখাল ফুটবলার না হলেও অনিরুদ্ধর ধারণা তার পাঠানো গরিব মানুষের কাছ থেকে তরুণ টাকা নেবে না। অবশ্য সরকারি হাসপাতালে দেখালে কোনও টাকা লাগে না।
অনিরুদ্ধর কাছ থেকে সব কথা শুনে তরুণ জানাল, কাল তার কার্ডিয়াক বিভাগে আউটডোর ডিউটি রয়েছে, রাখাল যেন সেখানে সকালে এসে টিকিটটা করে নেয়, তারপর সে নিজে দায়িত্ব নিয়ে ওর বুক দেখার ব্যবস্থা করে দেবে। সন্ধ্যার মুখে অনিরুদ্ধ ফিরল তার অফিস থেকে। বাড়ি না গিয়ে সে সোজা হাজির হল রাখালের চালা ঘরে। তখন সে হারিকেনের চিমনি সাফ করছিল ন্যাকড়া দিয়ে।
অনিরুদ্ধ কাল তাকে কী কী করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে বলল, ”ভোরবেলাতেই ট্রেনে উঠে শেয়ালদায় চলে যেও। স্টেশনের কাছে এন আর এস হাসপাতাল। চিনতে পারবে তো?”
”আরে, ও হাসপাতালে অনেক বার গেছি। ভাইরে সাপে কাটল তখন তো ওখানেই নিয়া গেছল। কুড়োনের বাপেরে বাঘে ধরল মাছ ধরতি গিয়া। নওবাকি নদীর খাড়িতে জাল পাততি গেছল, লৌকা থেকে বাঘে তারে তুলা নেয়। সঙ্গের তিনটে লোক তাড়া করতি শশধররে ফেইল্যা বাঘ সুশান্তরে তুইল্যা জঙ্গলে ঢুইকা যায়। পত্থমে ক্যানিং তারপর এই শেয়ালদার হাসপাতালে শশধররে নে আইল, চারদিন বেঁচে ছিল, আমি রোজ দেখতে গেছি।”
