তারপর পঁচিশ বছর কেটে গেছে, হারাধন দত্ত আজও জীবিত, এখন তাঁর বয়স সাতাত্তর। রোজ মাঠে আসেন, প্রায়ই দেখা হয় তবু অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করতে পারেনি—হারুদা সেদিন কী দেখে আমাকে বেছে নিয়েছিলেন?
পঁচিশ বছরে অনিরুদ্ধ বি.এ পাশ করেছে, কলকাতার বড় ক্লাবে খেলেছে, ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে এখন গড়িয়াহাট শাখায় কাজ করছে। বাড়ি থেকে অফিস দশ কিলোমিটার সে স্কুটারে যাতায়াত করে ইর্স্টান বাইপাস দিয়ে।
.
স্বরূপানন্দ বিদ্যালয়ের লোহার ফটকটা রাত্রে বন্ধ থাকে। খোলা আর বন্ধের দায়িত্ব অনিরুদ্ধর সময় থেকে আজও রাখালের। ফটকের লোহার গরাদের ফাঁক দিয়ে অনিরুদ্ধ মাঠের দিকে তাকাল। দেয়ালে বল লাগার শব্দটা এখনও হয়ে চলেছে। চাঁদের আলোয় সে ছায়ার মতো একটা আকৃতিকে ছোটাছুটি আর দেয়ালে শট নিতে দেখল স্কুলবাড়ির পশ্চিম দিকে যেখানে দুটো জানলার মধ্যে দেয়ালটা প্রায় পনেরো ফুট চওড়া। সে জানে জানলা দুটো হেডমাস্টারমশাইয়ের ঘরের আর টিচার্স রুমের।
কিছুক্ষণ তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে থেকে অনিরুদ্ধ বুঝল খুব অল্পবয়সী, খালি গা একটি ছেলে একা একাই দেয়ালে বল মেরে মেরে টার্গেট প্র্যাকটিস করছে। মাত্র পাঁচ গজ চওড়া দেয়ালে মারা বলটা ফিরে আসামাত্র কখনও হেড করছে, কখনও ভলি মারছে, কখনও ড্রপ শট নিচ্ছে। দেয়ালে লেগে বলটা সবসময় সোজা ওর কাছে না এসে এদিক—ওদিক চলে যাচ্ছে। ছেলেটা ছুটে গিয়ে প্রতিবারই বলটা ধরে অদৃশ্য কোনও ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য শরীরটাকে ডাইনে—বাঁয়ে দুলিয়ে পায়ে বল নিয়ে অদৃশ্য পাস দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অবাক হয়ে অনিরুদ্ধ একবার দেখল দেয়ালে লেগে ফিরে আসা উঁচু বলটাকে বাইসাইকেল কিক নেওয়ার চেষ্টা করল, অবশ্য কিকটা ফসকাল। কিন্তু চেষ্টা করেছিল!
”অ্যাই অ্যাই, এত রাতে তুই কে রে?”
অনিরুদ্ধর ধমকের সুরে চেঁচিয়ে বলা কথাটা শোনামাত্র ছেলেটা থমকে দাঁড়াল। ফটকের বাইরে একটা লোকের ছায়া দেখেই বলটা হাতে তুলে ছুট লাগাল স্কুলবাড়ির পেছন দিকে। প্রথম বন্ধনীর মতো দেখতে একতলা স্কুলবাড়িটার আড়ালে ছেলেটা অদৃশ্য হয়ে যেতেই অনিরুদ্ধ বুঝল আর ওকে এত রাত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে বুঝে গেল ছেলেটা খুব কাছাকাছিই থাকে।
কাল সকালে অফিস যাওয়ার সময় রাখালদাকে ধরে বার করতে হবে, কে এই ছেলেটা যে ঘুমোতে দিচ্ছে না! একটা পাগল ছেলে ধপ ধপাস শব্দ করে চলেছে আর রাখালদা স্কুলের পেছনে একটা ঘরে কি না ঘুমিয়ে আছে! কুম্ভকর্ণেরও তো ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা, ফাঁকিবাজ, একদম ফাঁকিবাজ, ওর এখন রিটায়ার করা উচিত। কয়েকদিন আগে অফিস যাওয়ার সময় রাখালের সঙ্গে তার রাস্তায় দেখা হয়েছিল। গালে সাতদিনের না কামানো সাদা দাড়ি, নীচের পাটিতে দুটো দাঁত নেই, ময়লা ধুতির ওপর হলুদ ফুলহাতা শার্ট, ধুলোকাদার আস্তরণের নীচে চটির আসল রং বোঝা যায় না। রুগণ বুক ভেতর দিকে ঢুকে গেছে। হাতে ছিল বাজারের থলি।
রাখাল শুধু বেয়ারাই নয়, তার আরও একটা পদ তখন স্কুলে ছিল, স্পোর্টস অ্যাসিস্ট্যান্ট। বাংলায় লেখা হত ক্রীড়া সহায়ক। তবে ছেলেরা বলত, মালি। অন্য কোনও গ্রামের বা শহরের মাঠে খেলা থাকলে জার্সি, বল, গোটা দশেক পাতিলেবু, খাওয়ার জলের বালতি, ফার্স্ট এইড বক্স ইত্যাদি তাকিয়ার খোলের মতো বিশাল একটা ক্যানভাসের থলিতে ভরে রাখাল স্কুল টিমের সঙ্গে যেত।
গত পরশু দিন রাস্তায় রাখালের সঙ্গে দেখা হতেই অনিরুদ্ধ পথ আটকে তার স্কুটারকে দাঁড় করায়।
”কী রাখালদা, আর তো তুমি চিনতেই পারো না।” রাখালকে অপ্রতিভ করার জন্য অনিরুদ্ধ বলেছিল।
স্কুলের প্রাক্তন আর বর্তমান ছাত্ররা ওকে রাখালদা বলে ডাকে। রাখাল স্কুল শুরুর আর ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে গত পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে। অনিরুদ্ধর বাবা অঘোর যখন এই স্কুলে ক্লাস টেন—এ পড়ত তখন তার সমবয়সী ষোলো বছরের রাখাল কয়াল সুন্দরবনের বরুণহাটি গ্রাম থেকে মাসির সঙ্গে এসে স্বরূপানন্দ স্কুলে চাকরিতে বহাল হয়, মাসিক পাঁচ টাকা বেতনে। মাসি ছিল হেডমাস্টারমশাইয়ের বাড়ির রাঁধুনি।
বাবার কাছে অনিরুদ্ধ শুনেছে, স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে রাখাল কবাডি আর ফুটবল খেলত। খেলার সময় বোকামি বা কোনওরকম দক্ষতার ঘাটতি দেখলে রাখাল তার দলের ছেলেদের মাথায় চাঁটি মেরেছে। অঘোর স্বীকার করেছিলেন ছেলের কাছে, ‘একটা ওপেন নেট গোল মিস করার পর রাখু আমায় চড় মেরেছিল।’ রাখাল ছিল সমবয়সী ছাত্রদের কাছে ‘ক্লাস ফ্রেন্ড’, কিন্তু বরুণহাটির পাঠশালায় সে ‘থ্রি ক্লাসের’ বেশি ওঠেনি। যতই তার বয়স বাড়তে লাগল রাখাল ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যেতে থাকে ছাত্রদের থেকে, অবশেষে সে ‘রাখু’ থেকে একসময় হয়ে যায় রাখালদা।’
অনিরুদ্ধর স্কুটারের সামনে থতমত রাখাল ভাঙা দাঁত বার করে সরল হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলল, ”চিনব না কেন খুব চিনি। তবে তুমি কিনা অনেক বড় হয়ে গেছ, অনেক নাম করেছ, তোমারে ডেকে কথা বলতে এখন লজ্জা করে।”
”লজ্জাটজ্জা থাক। তুমি আছ কেমন?”
”ভাল, ভালই আছি। শুধু মাঝে মাঝে বুকে একটা ব্যথা হয়, হাঁফ ধরে। তুমি একটু ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করে দিতে পারো?”
