অতীতে আর্জেন্তিনার ফুটবলে যে কর্কশ হিংস্র প্রবণতার স্পর্শ মাখান থাকত সেটা বহুল পরিমাণে মার্জিত, সুসংস্কৃত হয়ে ওঠে তাদের ম্যানেজার সিজার লুই মেনোত্তির তত্ত্বাবধানে। তিনি নতুন ভাবধারা আনেন, গতিময়তা ও উদ্দাম দৌড়—নির্ভর খেলায় বল্গা পরিয়ে তাকে খোলাখুলি আক্রমণাত্মক স্টাইলে নিয়ে আসেন। ১৯৭৭—এ দেশের মাঠে আর্জেন্তিনা ছয়টি জয় পায় ইওরোপীয় দলের বিরুদ্ধে, ১৯৭৮—এ পাঁচটি জয়। মেনোত্তির মুশকিল হল, আর্জেন্তিনার নামী খেলোয়াড়দের টাকার টোপ দিয়ে ইওরোপ তুলে নিয়ে যায়, বিশেষ করে স্পেন। ১৯৭৮—এ ছ’—সাতজন ভাল খেলোয়াড় বিদেশে খেলছে তাই তিনি ঘরের থেকেই লোক খুঁজলেন। স্পেন থেকে ফিরে এল শুধু কেম্পেস।
এবারের চূড়ান্ত পর্বে বড়দরের সুপারস্টার কোন দলেই নেই। পশ্চিম জার্মানির মুলার ও বেকেনবাউয়ার অবসর নিয়ে উত্তর আমেরিকা লীগে খেলছেন। ক্রুয়েফ বাছাই পর্বে হল্যাণ্ডকে সাহায্য করেছেন বটে কিন্তু চূড়ান্ত পর্বে খেলতে রাজি হননি। উত্তর আয়ার্ল্যাণ্ডের জর্জ বেস্ট বাছাই পর্বে খেলেছেন কিন্তু তার দেশ গ্রুপে তৃতীয় হয়। আফ্রিকা থেকে তিউনিসিয়া ও এশিয়া—ওসেনিয়া থেকে ইরান চূড়ান্ত পর্বের জন্য যোগ্যতা পায়।
রিভারপ্লেট স্টেডিয়ামে পশ্চিম জার্মানি ও পোল্যাণ্ডের মধ্যে উদ্বোধনী খেলাটি অসীম বিরক্তি তৈরি করে ০—০ হল। ১৯৬২ থেকে দেখা যাচ্ছে উদ্বোধনী ম্যাচে গোল হচ্ছে না। একটা ছক অনুযায়ী এটা ঘটছে। হাঙ্গেরি ও ফ্রান্সকে একই ২—১ ফলে হারিয়ে আর্জেন্তিনা শুরু করল। অনেকের মতে খেলাদুটিতে জনতার হাতের পুতুল হয়ে পড়েছিলেন রেফারি। দু’পক্ষই মারপিট করেছে কিন্তু রেফারি মাঠ থেকে বার করে দেন শুধু হাঙ্গেরির দু’জনকে। সন্দেহজনক পেনাল্টিতে ফরাসিরা ডুবে যায় এবং ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়। তবে দু’জন দীর্ঘদেহী স্ট্রাইকার, লুকে ও কেম্পেস সহ আর্জেন্তিনা দলকে ভীতিকরই মনে হচ্ছিল। প্রবল জনমত অগ্রাহ্য করে মেনোত্তি বিশ্বকাপ চূড়ান্ত দল থেকে এক উদীয়মান কিশোরকে বাদ দিয়েছিলেন। ১৯৭৬—এ ষোড়শ জন্মদিনের দশ দিন আগে সে প্রথম লীগ ম্যাচ খেলে, চার মাস পর হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নামে, এরপর আরো তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে। মেনোত্তি মনে করেন, ছেলেটি অল্পবয়সী কাঁচা, দীর্ঘসময় ধরে বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার চাপ সইবার মত অভিজ্ঞতা এখনো হয়নি। এই বাদ পড়া ছেলেটি ১৯৭৮ দলে থাকলে আর্জেন্তিনার আক্রমণ নিশ্চয় আরো ভীতিকর হয়ে উঠত। ছেলেটির নাম দিয়েগো মারাদোনা।
প্রাথমিক গ্রুপ লীগে আর্জেন্তিনা তৃতীয় ম্যাচে ইতালির কাছে ১—০ হারলেও দ্বিতীয় স্তরে উঠল। সেখানে তাদের গ্রুপে রয়েছে ব্রাজিল, পোল্যাণ্ড ও পেরু। আর্জেন্তিনা ২—০ পোল্যাণ্ডকে ও ব্রাজিল ৩—০ পেরুকে হারাল। দু দলের পয়েণ্ট সমান হলেও গোল—পার্থক্যে ব্রাজিল এগিয়ে। এবার দুটি দল মুখোমুখি হয়ে খুব সাবধানে খেলে ০—০ করল। দুই দলের জন্য বাকি একটি করে ম্যাচ। একই দিনে খেলা দুটি। বিকেলে ব্রাজিল ৩—১ হারাল পোল্যাণ্ডকে। রাত্রে আর্জেন্তিনাকে তাহলে অন্তত চার গোলের ব্যবধানে পেরুকে হারাতে হবে যদি ফাইনালে উঠতে চায়। ফিফা—র কাছে ব্রাজিল প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল এইভাবে খেলার সময় স্থির করে আর্জেন্তিনাকে পরের ম্যাচ খেলতে দিয়ে, ঠিক কি কাজটা তাদের করতে হবে সেটা জানিয়েই দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবাদ অবশ্য গ্রাহ্য হয়নি। আর্জেন্তিনা ৬—০ গোলে জেতায় একটা সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ে, পেরু পুরো চেষ্টা করেনি। আর প্রতিযোগিতায় একমাত্র অপরাজিত দল ব্রাজিল ছিটকে গেল ১৯৭৮ বিশ্বকাপ থেকে।
চার বছর আগে জার্মানিতে যে উচ্চতায় হল্যাণ্ড উঠেছিল তাদের এই দলটি সেই মানে এখানে খেলতে পারেনি। ইরানকে ৩—০ হারিয়ে, পেরুর সঙ্গে ০—০ ড্র করার পর তারা স্কটল্যাণ্ডের কাছে ২—৩ হেরে গোল—পার্থক্যে কোনক্রমে পরের ধাপে ওঠে। এই ম্যাচে ১৯৩০ থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের ১০০০—তম গোলটি করেন হল্যাণ্ডের রব রেনসেনব্রিঙ্ক, পেনাল্টি থেকে। পয়েণ্টে সমান হলেও স্কটল্যাণ্ডের থেকে হল্যাণ্ডের গোল খাওয়ার সংখ্যা তিন কম ছিল। পেরুর কাছে ৩—১ গোলে হারের পর স্কটল্যাণ্ডের উইলি জনস্টনের ডোপ টেস্ট ইতিমূলক হয়। তাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আফ্রিকা মহাদেশ থেকে একটি বিশ্বকাপ ম্যাচ জেতা প্রথম দল হবার মর্যাদা পেল তিউনিসিয়া যখন তারা ৩—১ গোলে মেক্সিকোকে হারাল। পরের ম্যাচে ০—০ করে পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে।
প্রথম রাউণ্ডের ভয় জাগানো অভিজ্ঞতাটা কাটিয়ে ওঠার পর হল্যাণ্ড দাপটে খেলতে শুরু করে। অস্ট্রিয়াকে ৫—১, ইতালিকে ২—১ গোলে হারিয়ে প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা খেলায় ২—২ করে পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে। অনেকেই তখন ভাবতে শুরু করেন দক্ষিণ আমেরিকা থেকে বিশ্বকাপ জয়ী প্রথম ইওরোপীয় দল এরাই হবে। হতোও, যদি—না বাদ সাধত গোল পোস্ট। ফাইনাল খেলা শুরুর আগে আর্জেন্তিনা রেফারির কাছে প্রতিবাদ জানাল হল্যাণ্ডের উইঙ্গার রেনে ভ্যানডার কেরকহফের হাতে বাঁধা প্লাস্টার সম্পর্কে। খেলাটি শুরুর আগেই প্যাচপঁয়জরের কবলে পড়ে গেছে। হল্যাণ্ডও খুব ভাল আচরণ করেনি। সমান তালে তারাও ফাউল করে যায়। কেম্পেস প্রথমার্ধে গোল করে, দ্বিতীয়ার্ধে সেটা শোধ দেয় রেপ—এর পরিবর্ত খেলোয়াড় নানিঙ্গা। খেলার শেষ মিনিটে হল্যাণ্ডের চোখের সামনে ট্রফিটি ঝলসে উঠেই মিলিয়ে গেল যখন রেনসেনব্রিঙ্কের প্রচণ্ড শট গোলকিপার ফিলোলকে হার মানিয়ে পোস্টে লাগল। অতিরিক্ত সময়ে শ্রান্ত আর্জেন্তিনা বাড়তি উদ্দীপনা তুলে এনে খেলার ভারসাম্য নিজেদের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। কেম্পেস ও বার্তোনি গোল দিয়ে বিশ্বকাপটি মাথার উপর তুলে ধরার গৌরব অধিনায়ক প্যাসারেলার জন্য এনে দেন। তৃতীয় স্থান নির্বাচনের খেলায় ব্রাজিল ২—১ হারায় ইতালিকে। সর্বোচ্চচ গোলদাতা হন কেম্পেস—৬ গোল। ৩৮ ম্যাচে মোট গোল হয়েছে ১০২। হল্যাণ্ড ও আর্জেন্তিনা সাতটি করে ম্যাচ খেলে সমান সংখ্যক—১৫ গোল দিয়ে যুগ্মভাবে সর্বাধিক গোলকারী দল হয়। ইতালির কাছে ১—২ গোলে হেরে যাওয়া ফ্রান্সের একমাত্র গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্রুততম গোলের রেকর্ড তৈরি করে। কিক—অফের পর ৩১ সেকেণ্ডে হেড করে গোল দেয় লাকোমবে। অবশ্য ১৯৮২—তে এই রেকর্ডটি ভেঙে যায়। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে কয়েকটি নতুন মুখ দেখা গেল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন, ইতালির রোসি, ব্রাজিলের জিকো, ফ্রান্সের প্লাতিনি, ইংল্যাণ্ডের কীগান ও পশ্চিম জার্মানির রুমানিগে।
১৯৮২ স্পেন
দ্বাদশ বিশ্বকাপ চূড়ান্ত পর্বেই প্রথমবার ১৬টি দলের বদলে ২৪টি দলকে খেলার সুযোগ দেওয়া হল। ফিফার সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকা, এশিয়া এবং উত্তর মধ্য আমেরিকার ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশগুলি সোচ্চচার হয়ে উঠছিল এই বলে যে চূড়ান্ত পর্বে প্রতি অঞ্চল থেকে তিনটি দল কেন যাবে? এবার তাই তিনটি কমিয়ে দুটি দল করা হল। ইওরোপ থেকে ১৪টি, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৪টি, ও বাকিদের প্রতিটি থেকে দুটি করে ৬টি। ম্যাচ হবে ৫২টি অর্থাৎ ১৪টি বেশি। প্রাথমিক রাউণ্ডে চারটির বদলে হবে ছয়টি গ্রুপ। গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল পরের রাউণ্ডে চারটি গ্রুপ তৈরি করবে। তাদের বিজয়ীরা সেমিফাইনাল খেলবে।
