অনুষ্ঠাতা দেশ পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে—উরুগুয়ে, ইতালি, ইংল্যাণ্ড, পশ্চিম জার্মানি ও আর্জেন্তিনা। সুতরাং দ্বাদশ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি, ব্রাজিল ও আর্জেন্তিনাকে ফেভারিট ধরা হলেও স্পেনকেও তাদের দলে রাখা হয়। গত চারটি প্রতিযোগিতায় উদ্বোধন ম্যাচে একটি গোলও হয়নি, এবার হল। বেলজিয়াম ১—০ জিতল আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে। উপগ্রহ মারফত সারা বিশ্বে ১৫০ কোটি দর্শক টেলিভিশনে উদ্বোধন অনুষ্ঠান দেখেন। কিন্তু উদ্বোধন ম্যাচটি দেখায়নি সম্প্রচারের স্বত্ব ক্রয়কারী ব্রিটেনের ইণ্ডিপেণ্ডেণ্ট টেলিভিশন। তখন ফকল্যাণ্ডকে নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্তিনার মধ্যে যুদ্ধ চলছিল। প্রাথমিক গ্রুপে রেকর্ড করল হাঙ্গেরি ১০—১ গোলে এল সালভাদরকে হারিয়ে। হ্যাটট্রিক করেন লাজলো কিস। চূড়ান্ত পর্বে একটি খেলায় রেকর্ড ছিল ৯ গোলের, দ্বি—অঙ্কের সংখ্যা এই প্রথম। তবে বাছাই পর্বে ১৯৮১ অকল্যাণ্ডে নিউজিল্যাণ্ড সর্বোচ্চচ ১৩—০ গোলে একটি ম্যাচে হারিয়েছিল ফিজিকে। আর একটি উল্লেখ করার মত রেকর্ড হয়—দ্রুততম গোলের। বিলবাওয়ে খেলা শুরু হওয়ার ২৭ সেকেণ্ডেই ইংল্যাণ্ডের ব্রায়ান রবসন ফ্রান্সকে গোল দিয়েছিলেন। ইংল্যাণ্ড ৩—১ জেতে তাদের প্রথম খেলাটিতে। জিয়নে আলজেরিয়া প্রথম খেলাতেই স্তম্ভিত করল ২—১ গোলে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে। লকধর বেলুমি ও রাবা মাদের গোল দুটি করেন। ১৯৭৪ বিশ্বকাপ জেতার পর জার্মানির এটি তৃতীয় পরাজয়। এর আগে ব্রাজিল ও আর্জেন্তিনার কাছেই মাত্র তারা হেরেছিল। ম্যাচের আগে জার্মান ম্যানেজার জুপ ডারওয়েল বলেছিলেন, ‘আলজেরিয়াকে যদি আমরা হারাতে না পারি তাহলে পরের ট্রেনেই আমি বাড়ি ফিরে যাব।’ অবশ্য তিনি কথা রাখেননি। স্পেনের সঙ্গে হোণ্ডুরাস ১—১ এবং চেকোশ্লোভাকিয়ার সঙ্গে কুয়েত ১—১ করে বেশ সাড়া জাগিয়ে ফেলে। কুয়েত দল স্পেনে আসে তাদের ম্যাসকট একটি সত্যিকারের উট সঙ্গে নিয়ে।
প্রাথমিক গ্রুপের খেলায় আলজেরিয়া ০—২ গোলে অস্ট্রিয়ার কাছে হেরে গেলেও তারা পেরুকে হারায় ৩—২ গোলে। দ্বিতীয় রাউণ্ডে তাদের ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল কেননা অস্ট্রিয়ার সঙ্গে তাদের পয়েণ্ট সমান কিন্তু গোল—পার্থক্যটা খারাপ। পশ্চিম জার্মানির সামনে তখন অস্ট্রিয়াকে হারান ছাড়া অন্য পথ নেই কেননা তারা দু পয়েণ্ট পিছিয়ে। জার্মানরা জিতল বটে কিন্তু খেলাটা এমন নির্লজ্জ হাঁটি হাঁটি ভাবে হল যাতে দু দলই উপকৃত হয়। গত বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনা—পেরু ম্যাচের মতই হল ব্যাপারটা। সেবার ৬—০ করে ব্রাজিলকে বার করে দেওয়া হয় এবার জার্মানি ১—০ জিতে দুটি পয়েণ্ট নিয়ে এবং গোল বাড়াবার চেষ্টা না করে গোল—পার্থক্যে আলজেরিয়াকে খারিজ করে দিল। চারিদিকে ঢিঢিক্কার পড়ে গেলেও অস্ট্রিয়া এবং জার্মানি দ্বিতীয় রাউণ্ডে উঠল।
ফ্রান্স বনাম কুয়েতের খেলাটি শেষ হবার দশ মিনিট আগে মাঠে প্রচণ্ড ঝামেলা তৈরি হয়। ৪—১ গোলে ফ্রান্স জেতে। কুয়েত গোলের পিছনে এক দর্শক প্রায়ই হুইসল বাজিয়ে ধাঁধার সৃষ্টি করছিল। একবার কুয়েতি ডিফেণ্ডাররা থমকে যায় হুইসল শুনে আর ফ্রান্সের চতুর্থ গোলটি জিরেস সেই ফাঁকে করেন। তীব্র প্রতিবাদ জানায় কুয়েত রুশী রেফারি স্তুপারের কাছে। কুয়েত ফুটবলের প্রেসিডেণ্ট এবং ফ্রান্সের ম্যানেজার হিদালগো মাঠে নেমে আসেন। মাঠে ধাক্কাধাক্কি, ঘুঁষোঘুষিও হয়। খেলা আট মিনিট বন্ধ ছিল। রেফারি চাপে পড়ে সিদ্ধান্ত বদলে গোলটি বাতিল করেন। ফিফা কুয়েত দলকে সতর্ক করে দিয়ে ২৫ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানা এবং স্তুপারকে সাসপেণ্ড করে।
উত্তর আয়াল্যাণ্ডের নর্ম্যাল হোয়াইটসাইড ১৭ বছর ৪০ দিন বয়সে যুগোশ্লাভিয়ার বিরুদ্ধে খেলে পেলের ১৭ বছর ৮ মাস বয়সে খেলার বিশ্বকাপ রেকর্ডটি ভেঙে দেন। খেলাটি ০—০ হয়। স্পেনকে ১—০ হারিয়ে আইরিশরা দ্বিতীয় রাউণ্ডে ওঠে আরো এগারোটি দলের সঙ্গে। এবার বিদায় নিল আর্জেন্তিনা ও ব্রাজিল দুই ফেভারিট দল। ইতালির কাছে ১—২ হারার পর ব্রাজিলের সঙ্গে খেলায় ১—৩ গোলে হেরে আর্জেন্তিনা বিদায় নিল। তাদের ব্যর্থতার কারণ রূপে বলা হল, ফকল্যাণ্ড যুদ্ধের টেনশ্যন আর গোল পাবার জন্য মারাদোনার মুখাপেক্ষী হওয়া। তখন পর্যন্ত মারাদোনা, ইতালির জেনতাইলে যে ধরনের রুক্ষ ট্যাকল করেছে তেমন ধরনের আচরণের সঙ্গে সড়গড় ছিলেন না আর তখন তাঁর মানসিকতাও বিপর্যস্ত ছিল বার্সিলোনা ক্লাবে যোগদানটা ঝুলে থাকার টানাপোড়েনে। মারাদোনার প্রথম বিশ্বকাপ খেলা শেষ হয় মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে, ব্রাজিলের সঙ্গে খেলায় বারবার মার খেয়ে ধৈর্য হারিয়ে বাতিস্তাকে পাল্টা লাথি মারার দায়ে। ব্রাজিল যে দাওয়াই দিয়েছিল মারাদোনাকে আর্জেন্তিনার ম্যানেজার মেনোত্তি জিকোর জন্য সেই ওষুধেরই ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রয়োগের দায়িত্বটা দিয়েছিলেন প্যাসারেলার উপর। ফলে খেলাটি রূপান্তরিত হয়েছিল লাথালাথিতে। জিকোকে মাঠ ছাড়তে হয় খোঁড়াতে খোঁড়াতে। পরের ম্যাচে ইতালির বিরুদ্ধে ব্রাজিল হেরে গেল ২—৩ গোলে। ব্রাজিলের জেতা ম্যাচ অন্তত ৩—৩ হতে পারত যদি ইসরায়েলি রেফারি জেনতাইলের ফাউলগুলো অগ্রাহ্য না করে, যেমন জিকোকে পেনাল্টি এলাকার মধ্যে টেনে ফেলে দেওয়া, শাস্তি দিতেন। ব্রাজিল এবং জিকো তাদের নিজেদের যাদুকরী খেলারই শিকার হলেন, যে ফুটবলকে তারা সমৃদ্ধশালী করেছেন তারই নয়া বাস্তবতার দ্বারা তারা দণ্ড পেলেন। এই বিশ্বকাপে জিকো প্রাথমিক পর্বে চোখ ধাঁধানো ফুটবল খেলে ‘নতুন রাজা’ বনে ছিলেন। তার প্রতিভাই তাকে বর্বরতার লক্ষ্য করে দেয়।
