বেয়ার্ন মিউনিখ ক্লাবের ছয়জনকে নিয়ে গড়া পশ্চিম জার্মান দল দু বছর আগে ইওরোপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এই ক্লাবও ইওরোপীয় কাপ সবে জিতেছে। ইওরোপে সর্বস্তরেই তারা তখন শ্রেষ্ঠ। তাছাড়া ফাইনাল খেলা হবে বেয়ার্নের নিজের স্টেডিয়ামে। ব্রাজিল দলে পেলে, তোস্তাও, গারসন অনুপস্থিত। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ভয়টা এখন আর ততটা নেই। সুতরাং পশ্চিম জার্মানিই ফেভারিট আর তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু হল্যাণ্ড। এককোটি ৩০ লক্ষের ছোট্ট দেশটি দুর্দান্ত প্রতিভাবান এক ফুটবলার প্রজন্ম তুলে ধরেছে যার শিরোমণি তাদের অধিনায়ক ইওহান ক্রুয়েফ, বিস্ফোরক স্কিলে এবং শৈল্পিক স্পর্শে যিনি পেলের সঙ্গে তুলনীয়। বিশ্বকাপে তাঁরই জীবনবীমার পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ—১০ লক্ষ পাউণ্ড। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আক্রমণাত্মক কয়েকজন প্রতিভাধর—নিসকেনস, রেপ, হ্যাগেজেম ও রেনসেনব্রিঙ্ক।
দেশের লীগে ও আন্তর্জাতিক ম্যাচে মোট ১,১৪৩ মিনিট খেলার পর চূড়ান্ত পর্বের প্রথম ম্যাচে ইতালির গোলকীপার দিনো জোফ গোলের মধ্য থেকে প্রথমবার কুড়িয়ে আনলেন হাইতির স্যাননের দেওয়া গোলের বলটি। অবশ্য ইতালি ৩—১ জিতেছিল। পোল্যাণ্ড ৭—০ হারায় হাইতিকে আর ইতালিকে ২—১ গোলে।
চূড়ান্ত পর্বের দ্বিতীয় স্তরে হল্যাণ্ড আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আরো দুঃসাহসী। আর্জেন্তিনাকে ৪—০, পূর্ব জার্মানিকে ২—০ ও ব্রাজিলকে ২—০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে তারা ফাইনালে পৌঁছয়। অন্যদিক থেকে পশ্চিম জার্মানি ও পোল্যাণ্ডের মধ্যে রেষারেষি চলে ফাইনালে ওঠার জন্য। কে উঠবে সেটা ঠিক হয় গ্রুপের শেষ ম্যাচে এই দুই দলের মধ্যে খেলায়। প্রথমার্ধে গোলশূন্য। দ্বিতীয়ার্ধে জার্মানরা পেনাল্টি পায় কিন্তু হোনেসের কিক ধরে ফেলেন তোসাজেউস্কি। শেষ পর্যন্ত মুলারের গোলে জার্মানরা জেতে।
দেশের মাটিতে জার্মানরা ফাইনাল খেলছে, মাঠে ৭৮ হাজার আর পৃথিবী জুড়ে টিভি—তে কয়েক কোটি দর্শকের সামনে। হল্যাণ্ড কিক—অফ করেই জার্মান পেনাল্টি এলাকা পর্যন্ত এবং তার দুপাশে অবিচ্ছিন্ন পনেরোটি পাস খেলল। তারপরই আচমকা বিস্ফোরিত হলেন ক্রুয়েফ। বল নিয়ে তীরগতিতে পেনাল্টি এলাকায় ঢুকলেন আর তাকে আটকাতে না পেরে পা দিয়ে ফেলে দিলেন হোনেস। ইংরাজ রেফারি জ্যাক টেলর পেনাল্টি সিদ্ধান্ত দিতে দ্বিধা করলেন না। বিশ্বকাপ ফাইনালে এই প্রথম পেনাল্টি এবং দ্রুততম গোল। নিসকেনস যখন গোল করলেন খেলার বয়স তখন ৮০ সেকেণ্ড মাত্র। এর ২৬ মিনিট পর হোলজেনবিনকে অবৈধ ট্যাকলিংয়ের জন্য জার্মানি পেনাল্টি পায় এবং পল ব্রিটনার গোল শোধ করে দেন। ছয় মিনিট পর বোনহফ ডানদিক থেকে উঠে হ্যানকে গতিতে পিছনে ফেলে ক্রস করেন মুলারকে। তিনি দ্বিতীয় চেষ্টায় শরীর মুচড়ে পা বেঁকিয়ে শট নেন এবং বল ইয়ংব্লোডের নাগালের বাইরে দিয়ে গোলে ঢোকে। দ্বিতীয়ার্ধে হল্যাণ্ডেরই আধিপত্য ছিল কিন্তু ব্রিটনার ও বোনহফ ধাক্কা সামলান আর গোলে মেইয়ার ছিলেন অবিচল। মরণ অথবা গৌরব এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে বেকেনবাউয়ারের নেতৃত্বে জার্মানরা লড়াই করে বিজয়ী হয়। গৌরবের ভাগীদার ছিলেন তাদের ম্যানেজার হেলমুট শ্যোন—ও। ১৯৬৬—তে রানার্স ও ১৯৭০—এ তৃতীয় হওয়া পশ্চিম জার্মান দল তাঁরই তত্ত্বাবধানে খেলেছিল। এবার তৃতীয় স্থান পায় পোল্যাণ্ড ১—০ ব্রাজিলকে হারিয়ে।
দশম বিশ্বকাপে চূড়ান্ত পর্বে মোট ৯৭ গোলের মধ্যে সব থেকে বেশি গোল পোল্যাণ্ডের—১৬টি। হল্যাণ্ডের ১৫টি। একটি খেলায় সর্বাধিক গোল দেওয়ার রেকর্ড স্পর্শ করল যুগোশ্লাভিয়া ৯—০ গোলে জাইরকে হারিয়ে। পোল্যাণ্ডের ল্যাতো ব্যক্তিগত সর্বাধিক গোল করেন—৭টি। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মোট গোলসংখ্যা এখন দাঁড়াল ১০৯ ও পশ্চিম জার্মানির ১০১। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে সবথেকে বেশি মোট গোল গার্ড মুলারের, ১৪টি। এটি এখনো রেকর্ড হয়ে আছে।
১৯৭৮ আর্জেন্তিনা
উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার আটচল্লিশ বছর পর তা আবার তার জন্মস্থানের খুব কাছাকাছিই ফিরে এল রিভারপ্লেটের অন্য তীরে আর্জেন্তিনায়। প্রথমবার রানার্স হওয়া ছাড়া এখনো পর্যন্ত তারা বড়মাপের কোন ফল দেখাতে পারেনি। আগের বিশ্বকাপগুলিতে ঘরের জনতা লক্ষণীয়ভাবে ফলাফলের উপর প্রভাব বিস্তার যদি করে থাকে তাহলে এবার সেটা প্রায় চূড়ান্ত ভূমিকা নিতে চলল। আর্জেন্তিনা একটি ম্যাচ জিতলেই রাস্তা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। গাড়ি চলাচল থেমে যায়, মোটরে অবিশ্রান্ত হর্ণ বেজে যায়। বাড়ির বারান্দায় লাউডস্পীকার লাগিয়ে আর্জেন্তিনীয় গোলের ধারাবিবরণের টেপ বাজান হয়। দলের নায়কদের সংবর্ধনা জানাতে স্টেডিয়ামে কাগজের কুচি এমন ছোঁড়া হয় যে কিছু আর তখন দেখা যায় না।
একাদশ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবার সময় আর্জেন্তিনা তখন কঠিনভাবে সামরিক একনায়কত্বের মুঠোয়। লড়াই চলছে সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে। প্রতিবাদ জানাচ্ছে মানবাধিকারের জন্য আন্দোলনকারীরা। বুয়েনস এয়ারেস প্রেস সেণ্টারে বোমা ফেটে একজন পুলিস মারা গেছে। বিশ্বকাপ সংগঠনের দায়িত্বে থাকা সরকার নিযুক্ত সামরিক জেনারেল খুন হয়েছেন। আর্জেন্তিনার পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ফিফা মেনে নিয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে সম্মত হল। প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত রক্ষিত হয়।
