পেলের তৈরি করে দেওয়া হলে জাইরজিনহোর একমাত্র গোলে ব্রাজিল জিতলেও স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল পেলের হেড থেকে ইংল্যাণ্ড গোলকীপার গর্ডন ব্যাঙ্কসের একটি গোল বাঁচান। জাইরজিনহোর একটা ক্রস পেলে পরিষ্কারভাবে মাথায় যখন লাগান তখন ব্যাঙ্কস ছিলেন অন্য প্রান্তের পোস্টে। নীচেরদিকে ঠুকে দেওয়া হেডটি মাটিতে পড়ে গোলে যখন ঢুকবে তখন ব্যাঙ্কস ডানদিকে শরীর ফিরিয়ে ঝাঁপালেন হাতটা বাড়িয়ে। মাটি থেকে বল যখন উঠছে তখন তিনি বলের তলায় ডান তালুর ধাক্কা দিয়ে সেটা বারের উপর দিয়ে তুলে দেন। পেলে বলেন, তিনি জীবনে এমনটি দেখেননি। গ্রুপ থেকে এই দুটি দল কোঃ ফাইনালে ওঠে। ইংল্যাণ্ড ৫০ মিনিটেই ২—০ এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে। কিন্তু বেকেনবাউয়ার ও জিলার সমতা ফিরিয়ে আনায় খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় আর মুলার একটি গোল করে ইংল্যাণ্ডের এবারের বিশ্বকাপ অভিযান থামিয়ে দেন। কিন্তু ব্রাজিলকে থামাতে পারল না পেরু। ৪—১ গোলে জিতে ব্রাজিল সেমি ফাইনালে উঠে উরুগুয়েকে হারাল ৩—১।
অন্যদিক থেকে মেক্সিকোকে ৩—১ গোলে হারিয়ে ইতালি সেমি ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ৪—৩ হারায় জার্মানিকে। দুটি সেমি ফাইনালে এই একবারই বিশ্বকাপ বিজয়ী চারটি প্রাক্তন দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করল। আবার এদের মধ্যে তিনটি দলের কাছে ট্রফিটি বরাবরের মত জিতে নেওয়ারও সুযোগ ছিল। এবং ব্রাজিল জিতে নিল।
১৯৭০—এর ২১ জুন প্রতিযোগিতা থেকে অন্তর্হিত হল জুল রিমে ট্রফি এবং স্থায়ী ঘর পেল ব্রাজিলে। অবিস্মরণীয় চোখ ধাঁধানো ফুটবল ফাইনালে খেলে তারা তর্কাতীত ভাবে প্রমাণ দিল তারাই বিশ্বশ্রেষ্ঠ। ইতালির নেতিমূলক রক্ষণাত্মক নীতিই তাদের পতন ডেকে আনে ৪—১ গোলে হারার জন্য। পেলের এটিই বিশ্বকাপে শেষ খেলা। উজ্জ্বল হয়ে তিনি বিরাজ করেছেন এবং প্রথম গোলটি করেন ১৮ মিনিটে। বোনিনসেনা ১—১ করেন ৩৮ মিনিটে। গারসন ৬৬ মিনিটে এবং জাইরজিনহো তৃতীয়টি করেন পেলের দেওয়া বল থেকে। খেলা ভাঙার তিন মিনিট আগে রক্ষণ থেকে উঠে আসা অধিনায়ক কার্লোস আলবার্তোর দিকে পেলে বল গড়িয়ে দেন এবং তিনি প্রচণ্ড শটে চতুর্থ গোলটি করেন। পেলের গোলটির সঙ্গে ১৯৩০ থেকে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে ব্রাজিলের শততম গোলটিও হল। চারটি বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলে প্রতিটিতেই তিনি কোন না কোন ম্যাচে গোল করেছেন। এই কৃতিত্ব এই বিশ্বকাপে আর অর্জন করলেন পশ্চিম জার্মানির জিলার। বিশ্বকাপে পেলে মোট ১২টি ও জিলার মোট ৯টি গোল করেছেন। পেলের মত দীর্ঘ ১২ বছরের (১৯৫৮—র পর ১৯৭০) ব্যবধানে আর কেউ ফাইনালে খেলেননি। ভাভার মত দুটি ফাইনালেই তিনি গোল করেছেন। নবম বিশ্বকাপে ফাইনালসহ প্রতিটি রাউণ্ডে ছয় ম্যাচে সাত গোল করে জাইরজিনহো নতুন রেকর্ড করলেন। তবে এবার সর্বাধিক গোল করায় কৃতিত্ব দেখালেন গার্ড মুলার— ছয়টি খেলায় ১০ গোল। তৃতীয় স্থানাধিকারী নির্ধারণ ম্যাচে পশ্চিম জার্মানি ওভারটের গোলে উরুগুয়েকে হারায় ১—০। এই ম্যাচটিতে মুলার গোল করলে বিশ্বকাপের সেরা রেকর্ডটি তিনি স্থাপন করতে পারতেন। যোগ্যতা পর্বের ছয়টি ম্যাচেই তিনি গোল করেন, মোট ৯টি এবং চূড়ান্ত পর্বের পাঁচটিতেই, মোট ১০টি। শুধু প্লে—অফে গোল পাননি। ১২ ম্যাচে ১৯ গোল। চূড়ান্ত পর্বে ১৩ গোল দিয়ে ফঁত্যেন ১৯৫৮—য় যে রেকর্ড করে রেখেছেন তার সঙ্গে মুলারের ১৯ গোলের রেকর্ডটিও যুক্ত হল—দুটিই এখনো বর্তমান। মেক্সিকোয় মোট ৯৪ গোল হয় তাতে সর্বাধিক অবদান ব্রাজিলের— ১৯টি। একটি গোলও করতে পারেনি শুধু এল সালভাদর। মাঠ থেকে রেফারি কর্তৃক একজনও বহিষ্কৃত হননি। এবারই প্রথম বিশ্বকাপে পরিবর্ত ব্যবহার করা গেল তাই ৯৫ জন পরিবর্ত হিসেবে খেলেছেন।
১৯৭৪
পশ্চিম জার্মানি
জুল রিমে ট্রফি চিরকালের জন্য ব্রাজিলের ঘরে চলে যাওয়ায় ফিফা নতুন ট্রফি তৈরি করাল। ইতালীয় ডিজাইনার সিলভিয়ো গাজ্জানিয়া বরাদ্দ পেলেন। বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিটি ১৮ ক্যারেট সোনায় তৈরি, ২০ ইঞ্চি লম্বা, ওজন ১১ পাউণ্ড। ১৯৭৪—এ দাম ছিল ১৭ হাজার পাউণ্ড। ট্রফির সঙ্গে বদল ঘটল ফিফা প্রেসিডেণ্টেরও। ইংল্যাণ্ডের স্ট্যানলি রাউসকে ভোটে হারিয়ে চেয়ারে বসলেন ব্রাজিলের জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জে। ৮৯টি দেশ বাছাই পর্বে লড়াই করে চূড়ান্ত পর্বে স্থান পাবার জন্য। এইবারই প্রথম গোলের গড়ের বদলে গোল পার্থক্য নিয়ম প্রয়োগ করা হয় আর তার ফলে একটি ম্যাচও না হেরে, একটি গোলও না খেয়ে বেলজিয়াম বাছাই পর্বেই ছাঁটাই হয়ে যায়। গ্রুপে ছয়টি ম্যাচে তাদের মোট গোল ১২—০ কিন্তু হল্যাণ্ডের ২৪—২। তাই হল্যাণ্ডই চূড়ান্ত পর্বে গেল। সোভিয়েত ইউনিয়ন রাজনৈতিক কারণে চিলির সঙ্গে খেলতে অস্বীকার করায় চিলি ওয়াকওভার পেয়ে চূড়ান্ত পর্বে ওঠে। এশীয় অঞ্চল থেকে ১১টি ম্যাচ খেলে অস্ট্রেলিয়া যোগ্যতা পায় পশ্চিম জার্মানি যাবার কিন্তু সেখানে চিলির সঙ্গে ০—০ করা ছাড়া একটি গোলও করতে পারেনি। আফ্রিকা থেকে যোগ্যতা পায় জাইর ১০টি ম্যাচ খেলে। পূর্ব জার্মানি এবারই প্রথম চূড়ান্ত পর্বে উঠল এবং গ্রুপের খেলায় পশ্চিম জার্মানিকে ১—০ গোলে হারায়ও। কিন্তু বাছাই পর্বেই ব্যর্থ হয় ইংল্যাণ্ডে আর তিন মাস পরই ছাঁটাই হন ম্যানেজার স্যর আলফ র্যামজি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এইবারই প্রথম ডোপিং পরীক্ষা হল। ইতালির বিরুদ্ধে ম্যাচে ১—৩ গোলে হারার পর হাইতির ব্যাক আরনেস্ট জাঁ—জোসেফকে পরীক্ষা করে নিষিদ্ধ ড্রাগ পাওয়া যায়। তাকে প্রতিযোগিতায় আর খেলতে দেওয়া হয়নি।
