”গোলকিপার হবি কী!” অসীমা অবাক হয়ে বললেন, ”লেখাপড়া করবি না?”
”করব।”
”তা হলে?”
”তা হলে আবার কী? খেলব আর পড়বও।” অনিরুদ্ধ সহজভাবে মায়ের সমস্যাটা মিটিয়ে দিল।
বাবা কী যেন ভেবে নিয়ে বললেন, ”ফুটবল প্লেয়াররা তো এখন ভাল চাকরি পায়, রেলে, ব্যাঙ্কে, স্টিলে, এক্সাইজে। সেন্ট্রাল গরমেন্টের অফিসগুলোয় প্লেয়ারদের জন্য অনেক চাকরি আছে। আমাদের রতনবাবুর মেয়ে সাঁতারে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ান। পি অ্যান্ড টি—তে চাকরি পেয়েছে, ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত বিদ্যে। অনি তোকে মাধ্যমিকটা অন্তত পাশ করতে হবে। ক্লাস ফোর স্টাফ হয়ে যদি ঢুকতে হয় তা হলে গোলকিপার হয়ে কাজ নেই।”
অনিরুদ্ধ বুঝে গেল বাবার আপত্তি নেই তার খেলার ব্যাপারে। খেলে চাকরি পাওয়া যায় এটা বাবা জেনে গেছে। সে গলায় জোর দিয়ে বলল, ”মাধ্যমিক কেন, আমি বি.এ. পাশও করব।”
অঘোর বললেন, ”তা হলে তো খুব ভাল।” এর পর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে,”চাকরির যা বাজার অনি তা হলে গোলকিপারই হোক, দেশে এখন আর গোলকিপার কোথায়? অনি তো এখনই বয়সের তুলনায় লম্বা, আরও লম্বা হবে, থঙ্গরাজের পর তো লম্বা কাউকে পাওয়াই গেল না। যদি মনে করিস বড় হতে পারবি তা হলে মন দিয়ে চালিয়ে যা, দেখছি তো কত বি.এ, এম.এ ফ্যা ফ্যা করে চাকরির জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
শুনতে শুনতে অসীমা মাথা কাত করে স্বামীর কথাগুলোয় সমর্থন জানাতে থাকেন। শুধু একটা চাকরির কথা ভেবেই অনিরুদ্ধর বাবা—মা তার গোলকিপার হওয়াতে রাজি হয়ে গেলেন শুধু একটা শর্তে—”লেখাপড়া জানা ঘরের ছেলে, বি.এ—টা পাশ করতে হবে।”
পরদিনই সে প্রতাপবাবুকে জানিয়ে দেয়, খাটতে রাজি।
”আমি আজ হারাধনের বাড়ি যাব, কথা বলব ওর সঙ্গে।”
প্রতাপবাবু দু’দিন পর অনিরুদ্ধকে বললেন, ”কথা বলেছি। কাল সকালে কালীতলার মাঠে ওদের প্র্যাকটিসের সময় হারাধন থাকবে, তুমি যেয়ো, তোমাকে দেখবে।”
লাল গোলগলা গেঞ্জি, কালো শর্টস, সাদা কেডস পরা হারাধন, গলায় সুতোয় বাঁধা হুইসল ঝুলছে। ছোট্ট একটা ভুঁড়ি, কাঁচাপাকা চুল, বয়স বোঝা যায় না, সম্ভবত পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন—র মধ্যে; মাঠে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন যে কাজটা একঘণ্টা ধরে করান সেই পাসিং আর রিসিভিং প্র্যাকটিস করাচ্ছিলেন। গোলে দাঁড়িয়ে দুটি ছেলে নানান জায়গা থেকে নেওয়া শট ধরছে। গোলকিপার দু’জনের একজন অনিরুদ্ধর ক্লাসেরই বীরেশ্বরের দাদা ধীরেশ্বর, কলকাতায় কলেজে পড়ে, তাকে চেনে।
অনিরুদ্ধকে দেখে ধীরেশ্বর অবাক হয়ে বলল, ”তুই এখানে!”
”গোলকিপিং শিখব।”
”শিখে কী করবি, এখানে খেলার চান্স পাবি না। আমরা দু’জন রয়েছি, থার্ড গোলকিপার চান্স পায় না খেলার।”
”তা হলে একতায় চেষ্টা করব।” অনিরুদ্ধ দমে গিয়ে শুকনো গলায় বলল, একতা মানে শিমুলহাটি একতা সঙ্ঘ, কালীতলার প্রতিদ্বন্দ্বী। দুই ক্লাবের মধ্যে আকচাআকচি এই তল্লাটে মুখরোচক আলোচনার বিষয়।
”তুই বরং একতার মাঠে গিয়ে খেলা শেখ।”
ধীরেশ্বর কথা বলছিল ক্রসবারের নীচে দাঁড়িয়ে, গোলে জাল খাটানো নেই। অনিরুদ্ধ কথা বলতে বলতে দেখল একজন পেনাল্টি দাগের কাছ থেকে শট নিতে ছুটে আসছে পেছন ফিরে কথা বলা ধীরেশ্বরকে লক্ষ্য করে। শট নেওয়া বলটা প্রচণ্ড জোরে আসছে ধীরেশ্বরের উচ্চতায়।
অনিরুদ্ধ হুঁশিয়ারি দিয়ে চিৎকার করে উঠল, ”ধীরুদা, বল, বল!”
বলের দিকে না তাকিয়ে ধীরেশ্বর সঙ্গে সঙ্গে কুঁজো হয়ে বসে পড়ল। বলটা ওর পিঠের ওপর দিয়ে সোজা এল অনিরুদ্ধর বুকের দিকে। বিদ্যুৎগতিতে সে বুকের সামনে হাত তুলে দুই তালু দিয়ে বলটা ধরে নিল।
মাঝমাঠ থেকে হারাধন দত্ত ব্যাপারটা দেখে ভুরু কোঁচকালেন, একটি ছেলেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ”সাদা গেঞ্জি পরা ঢ্যাঙা ছেলেটা কে রে?”
”জানি না হারুদা।”
”জিজ্ঞেস কর তো প্রতাপ মাস্টার ওকে পাঠিয়েছে কিনা।”
অনিরুদ্ধ বোকার মতো হেসে বলটা ছুড়ে দিয়েছে ধীরেশ্বরকে। বল ধরে নিয়ে সে বলল, ”এখানে আর দাঁড়াসনি, বেটপকা লেগেটেগে যেতে পারে।”
সেই সময় ছেলেটি এসে অনিরুদ্ধকে বলল, ”তোমাকে কি প্রতাপ মাস্টারমশাই পাঠিয়েছেন?”
”হ্যাঁ।”
”হারুদা তোমায় ডাকছেন।”
হারাধন দত্ত তার আপাদমস্তক দেখে প্রশ্ন করলেন, ”কতদিন গোলে খেলছ।”
অনিরুদ্ধ বলল, ”একদিন ক্লাসের একটা ম্যাচে।”
ভুরু তুলে হারাধন বিস্ময় চেপে বললেন, ”তা হলে আজ বিকেলে দ্বিতীয় ম্যাচটা খেলবে। পার্টি করে ট্রেনি ছেলেদের মধ্যে ফ্রেন্ডলি খেলা হবে, ঠিক পাঁচটায় হাজির থাকবে। না না, বড়রা খেলবে না।”
সেই ফ্রেন্ডলি ম্যাচটা হারাধন দত্ত লাইনের ধারে চেয়ারে বসে পাথরের মতো চোখ করে দেখলেন, একটিও কথা না বলে, অনিরুদ্ধ দুটো গোল খেয়েছিল। ম্যাচের পর ক্লাবের সহ—সচিব পঞ্চানন ঘোষ অনিরুদ্ধকে ডেকে জানিয়ে দেন, ”কাল থেকে দু’বেলা প্র্যাকটিসে। হারুদা নিজে তোমায় দেখবেন।”
কথাটা শুনে অনিরুদ্ধ খুবই অবাক হয়েছিল। দুটো বাজে গোল খাওয়ার পর সে ধরেই নিয়েছিল হারাধন দত্ত তাকে বাতিল করে দেবেন। তাকে নির্বাচনের কারণটা কী, সেটা জানার জন্য কৌতূহলে ছটফট করে উঠলেও সাহস করে সে পঞ্চাননকে তখন কারণটা জিজ্ঞেস করতে পারেনি। আজও সে জানে না কী দেখে হারাধন তাকে দু’বেলা আসতে বলেছিলেন।
