হাঙ্গেরিকে ২—১ গোলে হারিয়ে সেমি ফাইনালে উঠে রুশীরা একই ফলে জার্মানদের কাছে হেরে যায়। ফাইনালে ৯৭ হাজার দর্শকের সামনে জার্মানরাই প্রথম গোল করে ১২ মিনিটে, হেলমুট হ্যালার মারফৎ। তিন মিনিট পর হার্স্ট সেটি শোধ দেন। ৭২ মিনিটে মার্টিন পিটার্স ইংল্যাণ্ডকে এগিয়ে দেবার পর একেবারে শেষ মুহূর্তে ভুলফগ্যাং ভেবার গোল দিয়ে ২—২ করে দেন। অতিরিক্ত সময়ের ১০ মিনিটে হার্স্টের গোলটি আজও তর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে। তার শটটি বারের তলায় লেগে জার্মান গোলকীপার টিলকৌস্কির পিছনে মাটিতে পড়ে। সুইশ রেফারি ডাইয়েনসৎ গোলের বাঁশি বাজান। কিন্তু রুশী লাইনসম্যান আগেই পতাকা তুলেছিলেন হার্স্টের অফ—সাইড নির্দেশ করে। রেফারি তখন কথা বলেন লাইনসম্যানের সঙ্গে এবং তাঁর মতে হার্স্ট অফ—সাইড ছিলেন না। তাই লাইনসম্যানের সিদ্ধান্ত নাকচ করে গোলটি দেন। জার্মানিরা বলেন, বল গোল লাইন অতিক্রম করে গোলের ভিতরে যায়নি। যাই হোক ২—৩ পিছিয়ে পড়ে জার্মানরা গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠায় তাদের ডিফেন্স আলগা হয়ে যায় আর হার্স্ট আবার একটি গোল দিয়ে ফাইনাল ম্যাচে তিনটি গোল করার, এখনো পর্যন্ত একমাত্র সম্মানটির অধিকারী হন। খেলার ছকের সঙ্গে খেলোয়াড়দের যোগ্যতার চমৎকার মিলমিশ থেকে তৈরি বোঝাপড়ার গুণে এবং এগারোজনের সমবেত পরিশ্রমে ইংল্যাণ্ড এই সাফল্য পায়। তৃতীয় স্থান পায় পর্তুগাল ২—১ গোলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে। ১৬টি দল ৩২ ম্যাচে করে ৮৯ গোল। সর্বাধিক গোল দেয় পর্তুগাল—১৭টি আর তাদেরই ইওসেবিও ব্যক্তিগত সবথেকে বেশি গোল দেন—৯টি। ইংল্যাণ্ড তার ছয়টি ম্যাচই খেলেছে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে, যে সুবিধাটা বিশ্বকাপে কখনো কোন দল পায়নি। ১৯৫৪—য় জার্মানির ফ্রিৎশ এবং ওটমার ভাল্টার ভ্রাতৃদ্বয়ের পর বিশ্বকাপ জয়ীর সোনার পদক দ্বিতীয়বার পেলেন এক জোড়া ভাই ইংল্যাণ্ডের ববি ও জ্যাকি চার্লটন।
১৯৭০ মেক্সিকো
নবম বিশ্বকাপ চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাত হাজার ফুটেরও বেশি উপরে এবং যেখানে তাপমান নব্বুই ডিগ্রি ফারেনহাইটের ঘরে, এমন দেশ মেক্সিকোকে নির্বাচন করায় প্রথমে খুবই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। তার উপর ইওরোপীয় টিভি কেন্দ্রগুলিকে খুশি করার জন্য খেলার ব্যবস্থা হয়েছিল মাঝ দুপুরে! ফিফা—র ১৩৮ সদস্যের ৬৯টি দেশ যোগ্যতা পর্বে ১৭৩টি ম্যাচ খেলে, ১৪টি দেশ শেষ পর্যন্ত মেক্সিকো ও ইংল্যাণ্ডের সঙ্গে যোগ দেয় চূড়ান্ত পর্বে। এর মধ্যে গতবারের চমক তোলা উত্তর কোরিয়া নেই। এশিয়া—ওসেনিয়া গ্রুপে ইসরায়েলকে রাখার প্রতিবাদে তারা অংশ নিতে অস্বীকার করে। ইওসেবিও, কোলুনা, সিমোয়েস খেলা সত্ত্বেও পর্তুগাল বাছাই পর্ব থেকে উঠতে পারেনি। ব্যর্থ হয় ১৯৬৮ ওলিম্পিকসের সোনা জয়ী দলের আটজনকে দলে রেখে হাঙ্গেরিও। পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলার বাছাই পর্বের ছয়টি খেলায় ৯টি গোল করে নিজেকে জানান দিয়ে রাখলেন। আর্জেন্তিনা যোগ্যতা পেতে ব্যর্থ হলেও পেরু উঠে এল তাদের নতুন ম্যানেজার ব্রাজিলের দিদি—র তত্ত্বাবধানে। বাছাই পর্বে ১০টি গোল দেওয়া তোস্তাও—এর চোখে গুরুতর আঘাত লাগায় ব্রাজিল কমজোরি হয়ে পড়ে তার উপর তাদের ম্যানেজার জোয়াও সালধানার সঙ্গে পেলের মনোমালিন্য এমন পর্যায়ে যায় যে চূড়ান্ত পর্বের তিন মাস আগে ম্যানেজার বদল ঘটাতে হয়। সালধানার জায়গায় এলেন মারিও জাগালো যিনি দু বার বিশ্বকাপে স্বর্ণজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্য ছিলেন। ইতালি নির্ভর করে রইল লুইগি রিভা—র উপর। জার্মানির আছে বেকেনবাউয়ার, ওভারট আর নতুন গোল দেওয়ার ‘যন্ত্র’ মুলার। ম্যানেজার হেলমুট শ্যোন ডেকে নিলেন প্রবীণ জিলারকেও। ইংল্যাণ্ডের ১৯৬৬—র বিজয়ী দলটিই রয়েছে তবে র্যামজি এবার কোন ভবিষ্যদ্বাণী করেননি। মেক্সিকোর উচ্চতা আর গরমে ইওরোপীয় দলগুলো কেমন ফল করে জানার জন্য সবাই উদগ্রীব হয়ে রইল।
চূড়ান্ত পর্বে আফ্রিকা থেকে প্রথমবার প্রতিনিধিত্ব করল মরক্কো আর প্রথম উঠল ইসরায়েল এবং এল সালভাদর। দ্বিতীয় বিশ্বকাপে যদিও আফ্রিকার দেশ মিশর ১৯৩৪—এ ইতালিতে খেলেছিল তখন মহাদেশ হিসাবে অঞ্চল ভাগ করে খেলা হত না। মরক্কো বালগেরিয়ার সঙ্গে ১—১ করে একটি পয়েন্ট নিয়ে নবম বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। ১৯৬২ থেকে চূড়ান্ত পর্বে খেলে বালগেরিয়া তিনবারে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি। আর তাদেরই হারিয়ে পেরু ১৯৩০—এর পর এবারই চূড়ান্ত পর্বে প্রথমবার বিশ্বকাপে একটি ম্যাচ জিতল। গ্রুপের তিনটি ম্যাচে বালগেরিয়া ২০ জন খেলোয়াড়কে ব্যবহার করে, চূড়ান্ত পর্বের এটা একটা রেকর্ড।
নবম বিশ্বকাপ উদ্বোধনের আগে দুটি ঘটনার কথা বলা যায়। বাছাই পর্বে এল সালভাদর ও হোণ্ডুরাস, মধ্য আমেরিকার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আকচাআকচি এমনি যে প্লে—অফ ম্যাচের চারদিন আগে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় আর এল সালভাদর ১—০ জেতার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধ বাধে এই দুই দেশের মধ্যে। তিন দিন পর যুদ্ধ থামে। এতে দুই পক্ষের তিন হাজার লোক মারা যায়। অন্য ঘটনাটি হল, মেক্সিকো যাবার পথে ইংল্যাণ্ড দল কলম্বিয়ায় খেলতে যায়। বোগোটায় হোটেলের গহনার দোকান থেকে একটি হীরের ব্রেসলেট চুরি করার দায়ে অধিনায়ক ববি মুরকে আটকান হয়। চার দিন পর তিনি মেক্সিকোয় দলের সঙ্গে মিলিত হন। পরে অবশ্য স্বীকার করা হয়, অভিযোগের সমর্থনে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইংল্যাণ্ডের মনোবল নষ্ট করার জন্য এই ‘সাজানো চুরির’ অবতারণা হয়েছিল। গুয়াদালারায় র্যামজি স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে উদ্ধত আচরণ করায় তারা চটে গিয়ে ইংরাজদের বিরুদ্ধে এমন লিখতে শুরু করে যে জনতা ক্ষেপে উঠে ব্রাজিলের সঙ্গে গ্রুপের খেলার আগের রাতে ইংল্যাণ্ড দলের হোটেলের চার পাশে সাররাত অবিরাম মোটরের হর্ন বাজিয়ে আর চিৎকার করে খেলোয়াড়দের ঘুমোতে দেয়নি।
