১৯৬৩—র শুরুতেই অপেশাদার আমলের ঝুলকালি পরিষ্কার করে ইংল্যাণ্ড পেশাদার কোচ আলফ র্যামজিকে জাতীয় ফুটবল দলের ম্যানেজার নিযুক্ত করে। র্যামজি ৩২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচই খেলেননি, ১৯৫০ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরাজয়ের গ্লানিরও অংশীদার এবং ১৯৫৩—য় হাঙ্গেরিয়ানদের কাছ থেকে দুটি ম্যাচে হাতে—কলমে—পাওয়া শিক্ষাটাও হজম করেছেন। তিনি এটা বোঝেন ইংল্যাণ্ডের নির্বাচকরা শৌখিন অপেশাদার লোকেদের নিয়ে তৈরি। এদের দ্বারা গড়া দল নিয়ে ইওরোপের বা দক্ষিণ আমেরিকার শীর্ষ দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়। তিনি দায়িত্ব নিতে রাজি হলেন একটি শর্তে, নির্বাচক কমিটি ভেঙে দিতে হবে এবং তিনি একাই নিজের দল বেছে নেবেন। ইংল্যাণ্ডের নতুন ফুটবল কর্তা হলেন র্যামজি। চাপাস্বভাবের হিসেবী, কম কথার মানুষ। ম্যানেজার নিযুক্ত হয়েই, তিনি বললেন, ‘আমরাই বিশ্বকাপ জিতছি।’ কারণ হিসাবে জানালেন, তাঁকে সাহায্য করবে ঘরের মাঠে খেলার সুবিধা, খাঁটি বিশ্ব পর্যায়ের তিনজন খেলোয়াড়কে দলের কেন্দ্রীয় শক্তি রূপে পাওয়া এবং খেলার ছক। তাঁর উদ্ভাবিত ৪—৩—৩ ছককে, ‘উইংলেস ওয়াণ্ডারস’ বলে তখন ব্যঙ্গও করা হয়।
অষ্টম বিশ্বকাপে দেখা গেল ব্রাজিলের বিস্ময়কর পতন। তাদের ১৯৫৮—র ম্যানেজার ভিসেন্ট ফিয়োলাই আবার দলের দায়িত্ব নিয়ে অরল্যাণ্ডো, বেলিনি, জালমা স্যান্টোস ও গ্যারিনচার মত প্রবীণদের ঘিরে দল গড়লেন। দলের সঙ্গে ১৬ বছরের এদু নামে একটি ছেলে এসেছিল কিন্তু তাকে খেলানো হয়নি। নির্মমভাবে লাথি মেরে প্রতিযোগিতা থেকে বার করে দেবার আগে পর্যন্ত পেলে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলতে পেরেছিলেন। এবারের বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত চমৎকারিত্বের থেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল দলগত খেলার সংগঠনের দিকটাই। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের প্রথম চাঞ্চল্যকর ঘটনা জুলরিমে ট্রফিটির চুরি যাওয়া। এক ডাকটিকিটের প্রদর্শনীর সঙ্গে ট্রফিটিও প্রদর্শিত হচ্ছিল ওয়েস্টমিনিস্টারের সেন্ট্রাল হলে। প্রচুর তল্লাশি চালিয়েও সেটির হদিশ পাওয়া যায়নি আট দিন। অবশেষে দক্ষিণ লণ্ডনের নরউডে একটি বাড়ির সামনে বাগানে ঝোপের মধ্যে সেটি খুঁজে পায় ‘পিকলস’ নামে এক কুকুর। এবারের বিশ্বকাপে ১৬টি দলের ৩৫২ জন ফুটবলারের জন্য বীমা করা হয় মোট দুই কোটি পাউণ্ডের। পেলের জন্য বীমা হয়েছিল আড়াই লক্ষ পাউণ্ডের।
উদ্বোধনী খেলায় ইংল্যাণ্ডের সঙ্গে উরুগুয়ের ০—০ হল। পরের ম্যাচে ইংল্যাণ্ড ২—০ হারাল মেক্সিকোকে এবং একই ফলে ফ্রান্সকে। মেক্সিকোর ৩৯ বছর বয়সী গোলকীপার কারবাল ১৯৫০ থেকে পাঁচটি বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলে অনন্য একটি রেকর্ড গড়ে এবার অবসর নিলেন। পশ্চিম জার্মানি ৫—০ সুইৎজারল্যাণ্ডকে, ০—০ আর্জেন্তিনার সঙ্গে এবং ২—১ স্পেনকে হারিয়ে কোঃ ফাইনালে পৌঁছল। ব্রাজিল খেতাব রক্ষা করতে এসেছে ১৯৫৪—র কোঃ ফাইনালে হাঙ্গেরির কাছে পরাজয়ের পর অপরাজিত অবস্থায়। ১৯৬৬—তে প্রথম খেলায় পেলে ও গ্যারিনচার ফ্রিকিক থেকে বালগেরিয়ার বিরুদ্ধে ২—০ গোলে জিতল বটে কিন্তু পেলে চোট পাওয়ায় পরের ম্যাচে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে তাঁকে বিশ্রাম দেওয়া হল। ব্রাজিল ১—৩ গোলে হেরে গেল সেই খেলায়। ১৯৫৮ থেকে বিশ্বকাপে ১১ জয় ও দুটি ড্র—এর পর এই পরাজয় ঘটল। তৃতীয় খেলায় পর্তুগালের বিরুদ্ধে ব্রাজিল নয়টি পরিবর্তন ঘটাল, তার মধ্যে সাতজন বিশ্বকাপে এই প্রথম খেলছে। ২৫ মিনিটেই সিমোয়েস ও ইওসেবিওর গোলে পর্তুগাল এগিয়ে যায়। রিলদো একটি গোল শোধ দিলেও ইওসেবিও ফল ৩—১ করেন। দ্বিতীয়ার্ধে পেলেকে মারাত্মক জখম করে মোরেইস। খোঁড়াতে খোঁড়াতে পেলে মাঠ ছাড়েন এবং ড্রেসিংরুমে ফিরে বলেন, আর কখনো তিনি বিশ্বকাপে খেলবেন না। কথাটা অবশ্য তিনি রাখতে পারেননি। কিন্তু এবারের মত ব্রাজিল বিদায় নিল।
ইতালি প্রথম খেলায় চিলির বিরুদ্ধে ২—০ জেতে। প্রথম গোলটি দেয় আলেসান্দ্রো মাজ্জোলা। ১৯৪৯—এ সুপারগা বিমান দুর্ঘটনায় তোরিনো ফুটবল দলের যে খেলোয়াড়রা মারা যান তার মধ্যে ছিলেন ভ্যালেনতিনো মাজ্জোলা। ১৯৫০—এর বিশ্বকাপে ইতালির অধিনায়ক রূপে তিনি নির্দিষ্ট ছিলেন। দুটি ছেলে রেখে তিনি মারা যান। বড় ছেলেটিই এই আলেসান্দ্রো। দ্বিতীয় খেলায় ইতালি ০—১ হেরে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে। মিডলসব্রাওয়ে এই গ্রুপেই উত্তর কোরিয়া যখন রুশীদের বিরুদ্ধে প্রথম খেলতে নামে তখন দর্শকরা তাদের দেখেই বুঝে নেন এরা কচুকাটা হবে। দলের সবথেকে লম্বা লোকটির উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি! কিন্তু ৩০ মিনিটেও রুশীরা গোল করতে পারেনি। পরে তারা বুঝে যায় শূন্যে খেলেই কোরীয়দের হারাতে হবে এবং সেই ভাবেই তিনটি গোল করে জেতে। গ্রুপে ইতালি শেষ খেলায় কোরীয়দের কাছে যেভাবে ভেঙে পড়ল, তার প্রতিধ্বনি ছড়াল বিশ্ব জুড়ে। কেউ প্রথমে বিশ্বাসই করেনি, যেমন ১৯৫০—এ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইংল্যাণ্ডের হারটাকে লোকে অবিশ্বাস করেছিল। ইতালির আন্তর্জাতিক নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে প্রতিটি বিষয়ে টক্কর দিয়ে এবং তাদের থেকে ভাল খেলে কোরীয়রা ১—০ জিতে যায় ৪১ মিনিটে পাক ডুক ইক—এর দেওয়া গোলে। এরপর তারা ইতালীয়দের এক ইঞ্চি জমিও ছাড়েনি। এরপর এশিয়ার এই দলটিকে নিয়ে ঠাট্টা রসিকতা বন্ধ হয়ে গেল। কোরীয়রা আরও উচ্চ পর্যায়ে উঠল কোঃ ফাইনালে পর্তুগালের বিরুদ্ধে। খেলার ২৬ মিনিটেই বিশ্ববাসী নিজেদের শ্রবণযন্ত্রকে অবিশ্বাস করে শুনল উত্তর কোরিয়া ৩ : পর্তুগাল ০! প্রথম মিনিটেই গোল, ২৪ মিনিটে দ্বিতীয়টি, ২৬ মিনিটে তৃতীয়টি! এরপর খেলায় হাল ধরেন ইওসেবিও। কয়েক মিনিট পরই একটি এবং ৪২ মিনিটে পেনালটি থেকে দ্বিতীয় গোলটি করলেন। ৫৮ মিনিটে করলেন তৃতীয়টি আর ৬১ মিনিটে চতুর্থটি, পেনালটি থেকে। খেলা শেষের কিছু আগে তোরেস পর্তুগালের পঞ্চম গোলটি দিয়ে উত্তর কোরিয়ার উজ্জ্বল প্রস্থান নিশ্চিত করে দেন। সেমি ফাইনালে ওঠার আগে ইংল্যাণ্ডকে টপকাতে হল আর্জেন্তিনার বেড়া। এই ম্যাচে র্যামজি মারপিট করে খেলার জন্য আর্জেন্তিনীয়দের ‘পশু’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তাদের অধিনায়ক র্যাতিনকে রেফারি মাঠ থেকে বার করে দেন। ইংল্যাণ্ড জেতে জিওফ হার্স্টের দেওয়া গোলে। পর্তুগালের বিরুদ্ধে ববি চার্লটন অনবদ্য খেলে দুটি গোল দিয়ে ইংল্যাণ্ডকে ফাইনালে তুলে আনেন। অবশ্য ববির ভাই জ্যাকি ফাঁকা গোলে ঢোকা বল হাত দিয়ে আটকে পর্তুগালকে পেনাল্টি পাইয়ে দেওয়ায় ইওসেবিও একটি গোল পান।
