১৯৬২
চিলি
ফিফা—র ১০৪ সদস্য দেশের মধ্যে ৫২টি দেশ ৯১ ম্যাচ খেলে ১৪টিতে বাছাই হয়ে চিলি ও ব্রাজিলের সঙ্গে যোগ দেয় সপ্তম বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে। এদের মধ্যে কলম্বিয়া ও বালগেরিয়া নবাগত। এই বিশ্বকাপ খুব বেশি উচ্চতায় উঠতে পারেনি। দক্ষিণ আমেরিকার পাঁচটি দলের—উরুগুয়ে, কলম্বিয়া, আর্জেন্তিনা, চিলি ও ব্রাজিল— মধ্যমণি ছিল ব্রাজিল। পেলে মাত্র একটি পুরো ম্যাচ খেলতে পেরেছিলেন। ইতালি ও স্পেন দলে দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকজন তারকা ছিলেন। ব্রাজিলের আলতাফিনি ও আর্জেন্তিনার সিভোরিকে ইতালি সঙ্গে আনে। স্পেন নিয়ে আসে উরুগুয়ের ১৯৫৪ বিশ্বকাপ খেলোয়াড় সান্তামারিয়াকে এবং রিয়্যাল মাদ্রিদ ক্লাবের দুই বিদেশী, হাঙ্গেরীয় ফেরেনস পুসকাস ও আর্জেন্তিনীয় আলফ্রেদো ডি স্তেফানোকে। অবশ্য চিলিতে আসার আগেই চোট থাকার অজুহাত দেখিয়ে ডি স্তেফানো একটি ম্যাচও খেলেননি। কারণটা ছিল ম্যানেজার হেলেনিও হেরেরার সঙ্গে ঝগড়া। যোগ্যতা বাছাই পর্বে ওয়েলসের বিরুদ্ধে স্পেন ১—০ জিতেছিল। গোলটি দিয়েছিলেন ডি স্তেফানো। এই বিরাট খেলোয়াড়ের এইটিই একমাত্র বিশ্বকাপ গোল। যোগ্যতা বাছাই পর্বে আর এক বিরাট খেলোয়াড় জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটি করেন। চিলিতে যাওয়ার যোগ্যতা না পাওয়া পর্তুগাল ২—৪ গোলে লাকসেমবুর্গের কাছে হারে এবং এই ম্যাচে তারা প্রথম খেলতে নামায় ১৯ বছরের ইওসেবিও ফেরেইরা দা সিলভা—কে। ইওসেবিও একটি গোল করেন।
চিলিতে স্পেনের প্রথম খেলা চেকোশ্লোভাকিয়ার সঙ্গে পড়ে। ১৯৫৫—৫৬ থেকে ১৯৬১—৬২ ইওরোপীয়ান কাপের ছয়টি ফাইনালে উঠে পাঁচবার ট্রফি জেতা রিয়্যাল মাদ্রিদ ক্লাবের সান্তামারিয়া, দেল সল, পুসকাস ও জেন্টো সমৃদ্ধ স্পেনকে ০—১ হারিয়ে দেয় চেকরা। ব্রাজিল ১৯৫৮ ফাইনালের বেলিনি ও অরল্যাণ্ডোকে বসিয়ে তাদের জায়গায় মাউরো ও জোজিমোকে দলে এনে প্রথম ম্যাচে নামে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে। খুব ভাল তারা খেলেনি। জাগালো ও পেলের গোলে তারা ২—০ জেতে। চেকদের বিরুদ্ধে ব্রাজিল দলে বদল ঘটায়নি। কিন্তু ইয়ান পপলুহার ও জোসেফ মাসোপুস্ত ডিফেন্সকে এমন দুর্ভেদ্য করে রাখেন যে ব্রাজিলীয়রা গোল করতে পারেনি। এই খেলাতেই ৩৫ গজের একটি শট নিয়ে পায়ের পেশীতে টান ধরায় পেলে মাঠ ছেড়ে যান। তিনি আর এই প্রতিযোগিতায় খেলতে পারেননি। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে হেরেরা আদ্যন্ত বদলানো এক স্প্যানিশ দল নামান এবং ৩৫ মিনিটে স্পেন ১—০ এগিয়েও যায়। দ্বিতীয়ার্ধে গ্যারিনচার চোখ ধাঁধানো খেলা ম্যাচের রঙ বদলে দেয়। তার তৈরি করে দেওয়া বল থেকে, পেলের জায়গায় নবাগত আমরিলডোর দুটি গোল ব্রাজিলকে ২—১ জেতায়। এই গ্রুপেই মেক্সিকোর শেষ খেলায় অধিনায়ক ও গোলকিপার আন্তাোনিও কারাবাল তাঁর ৩৩—তম জন্মদিনে খেলতে নামেন চেকোশ্লোভাকিয়ার সঙ্গে। তাঁকে দারুণ একটা জন্মদিনের উপহার দেবার জন্য মেক্সিকানরা দারুণ খেলে ৩—১ গোলে জিতে নেয় ম্যাচটি। ৩২ বছর আগে বিশ্বকাপে প্রথম অংশ নিয়ে মেক্সিকো এই প্রথম চূড়ান্ত পর্বে একটি ম্যাচ জিতল! কারাবালের এটি ১৯৫০ থেকে চতুর্থবার চূড়ান্ত পর্বে মাঠে নামা।
ইংল্যাণ্ড শুরু করে হাঙ্গেরির কাছে ০—২ গোলে হেরে। লায়স টিচি ও ফ্লোরিয়ান অ্যালবার্ত গোলদুটি করেছিলেন। এই ম্যাচেই বিশ্বকাপে প্রথম খেলতে নামেন ববি চার্লটন ও ববি মুর। অপ্রতিরোধ্য গ্যারিনচার দুটি ও ভাভাকে তার তৈরি করে দেওয়া একটি গোলে ব্রাজিল ৩—১ হারায় ইংল্যাণ্ডকে। সেমি ফাইনালে চিলির বিরুদ্ধে গ্যারিনচা এমনই তাণ্ডব শুরু করেন যে তাকে লাথি চালিয়ে থামাবার পদ্ধতি চিলিয়ানদের অবলম্বন করতে হয়। অবশেষে তিনি ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। পাল্টা আঘাত করার জন্য তাঁকে মাঠ থেকে বার করে দেওয়া হয়। বেরিয়ে আসার সময় দর্শকের ছোঁড়া বোতলে তাঁর মাথা গভীর ভাবে কেটে যায়। ব্রাজিলের ৪—২ জয়ে গ্যারিনচার ছিল দুটি গোল। চেকোশ্লোভাকিয়া ১—০ হাঙ্গেরিকে ও ৩—১ গোলে সেমি ফাইনালে যুগোশ্লাভিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়।
কাউকে মাঠ থেকে বার করে দেওয়া হলে পরের ম্যাচে তার মাঠে নামা নিষিদ্ধ। তাহলে গ্যারিনচা কি ফাইনালে খেলতে পারবেন না? ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে নগণ্য মজুরটিও উদ্বিগ্ন রইলেন ফিফা—র সিদ্ধান্তের জন্য। চব্বিশ ঘণ্টা পর ফিফা জানাল গ্যারিনচাকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে… তবে ফাইনালে তিনি খেলতে পারবেন। ১৭ জুন ব্রাজিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবার দাবি নিয়ে সান্তিয়াগোর ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে নামল এবং ১৯৫৮—র মত তারা প্রথমে মাসোপুস্তের দেওয়া গোল খেল, ১৪ মিনিটে। দু মিনিট পর অসম্ভব দুরূহ কোণ থেকে শট নিয়ে আমারিলডো গোলটি শোধ করলেন। ৬৮ মিনিটে জিটো হেড করে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন। নয় মিনিট পর গোলকীপার শ্রয়িফের হাত থেকে বেরিয়ে আসা বল গোলে ঠেলে ভাভা ৩—১ করে দেন। ব্রাজিল দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন ও চেকোশ্লোভাকিয়া দ্বিতীয়বার রানার্স হল। সপ্তম বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোল দেয় ব্রাজিল, ১৬টি। সর্বাধিক ব্যক্তিগত গোলের সংখ্যা হল—চার। ছয় জন এর ভাগীদার : ব্রাজিলের ভাভা, গ্যারিনচা, হাঙ্গেরির অ্যালবার্ট, সোভিয়েত ইউনিয়নের ইভানভ, চিলির ম্যানচেজ এবং যুগোশ্লাভিয়ার ইয়েরকোভিচ। রেফারি কর্তৃক বহিষ্কৃত খেলোয়াড়ের সংখ্যা—ছয়। গ্যারিনচা ছাড়া বাকি পাঁচজনকে কিন্তু একটি ম্যাচের জন্য সাসপেণ্ড হতে হয়!
১৯৬৬ ইংল্যাণ্ড
অষ্টম বিশ্বকাপে চূড়ান্ত পর্বের জন্য ১৬টি দেশের নাম যখন ঠিক হল, দেখা গেল তাতে দু’জন নবাগত ছাড়া বাকি সবই পুরনো নাম। নবাগতরা হল পর্তুগাল ও উত্তর কোরিয়া। তখন ফিফা—র সদস্য সংখ্যা ১২৫। যোগ্যতা বাছাই পর্বে নাম দিয়েছিল ৭০টি দেশ। কিন্তু না খেলেই নাম প্রত্যাহার করে ১৭টি দেশ। কোরীয়দের চূড়ান্ত পর্বে আসাটাকে সবাই হাসির ব্যাপার বলে ধরে নেয়। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মাত্র দুটি ম্যাচে ৬—১ ও ৩—১ গোলে জিতেই তারা ইংল্যাণ্ডে আসার ছাড়পত্র পেয়ে যায়। উত্তর কোরীয়দের ফুটবল মান সম্পর্কে সারা বিশ্বই অন্ধকারে। তবু সবাই ধরে নিল বিশ্বকাপের দম বন্ধ করা গম্ভীর কাজকর্মের মধ্যে ওরা যদি কিছু হালকা প্রহসন এনে দেয় তাহলে মন্দ লাগবে না।
