পাঁচটি ম্যাচে হাঙ্গেরির ২৭ গোল এখনো বিশ্বকাপ রেকর্ড। স্যাণ্ডর কোজিসের ১১ গোল (দুটি হ্যাটট্রিকসহ) তখন রেকর্ড গণ্য হয়। জার্মানি ছয় খেলায় ২৫ গোল দেয়। চূড়ান্ত পর্বে মোট ১৪০ গোলের রেকর্ড হয়েছিল। স্কটল্যাণ্ড, কোরিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়া একটি গোলও করতে পারেনি। জার্মানির ফ্রিৎশ এবং ওটমার ভাল্টার হলেন বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা এবং সোনার পদক পাওয়া প্রথম দুই ভাই।
১৯৫৮
সুইডেন
ষষ্ঠ বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় ফিফার ৮৬ সদস্যের মধ্যে অংশ নেয় ৬০টি দেশ। চূড়ান্ত পর্বে এবারই প্রথম এল ওয়েলস, উত্তর আয়ার্ল্যাণ্ড ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। ওয়েলসের সুইডেনে আসাটা বরাত জোরেই ঘটে। যোগ্যতা পর্বে তারা গ্রুপে চেকোশ্লোভাকিয়ার পরেই ছিল। এদিকে এশিয়ান—আফ্রিকান যোগ্যতা পর্বের গ্রুপের চারটি শাখা থেকে ইন্দোনেশিয়া, সাইপ্রাস, তুরস্ক ও ইজরায়েল শীর্ষ স্থান পায়। এবার এই চার দেশের মধ্যে খেলায় স্থির হবে কে সুইডেনে যাবে। কিন্তু তিনটি দেশ হঠাৎ নাম প্রত্যাহার করার ফলে ইজরায়েলই যোগ্যতা পায় একটি ম্যাচও না খেলে। কিন্তু ফিফা বলে তা হতে পারে না, একটি ম্যাচ খেলতেই হবে। ইওরোপের আটটি গ্রুপের রানার্সদের নিয়ে লটারি হয় এবং তাতে ওয়েলসের নাম ওঠে। তারা ২—০, ২—০ ইজরায়েলকে হারিয়ে চূড়ান্ত পর্বের জন্য যোগ্যতা পায়।
১৯৫৮—র ৬ ফেব্রুয়ারি মিউনিখে বিমান দুর্ঘটনায় ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের যে আটজন ফুটবলার মারা যান তার মধ্যে প্রতিভাবান ডানকান এডোয়ার্ডস, রজার বায়ারন, টমি টেলর ও ডেভিড পেগ বিশ্বকাপে খেলার জন্য দলে থাকতেনই। এদের মৃত্যুতে ইংল্যাণ্ড অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই বিমানে ম্যাট বুশবি গুরুতর জখম হন। স্কটল্যাণ্ড তাঁকে বিশ্বকাপে দলের ম্যানেজার নিযুক্ত করেছিল কিন্তু তিনি যেতে না পারায় স্কটল্যাণ্ড ম্যানেজার ছাড়াই বিশ্বকাপে খেলতে যায়। এমন ঘটনা আর দ্বিতীয় ঘটেনি।
দু বার বিশ্বকাপ জয়ী দুটি দেশকে সুইডেনে দেখা গেল না। যোগ্যতা বাছাই পর্বেই উরুগুয়ে ও ইতালি বিদায় নেয়। ১৯৫৬—র অভ্যুত্থান হাঙ্গেরির অসাধারণ ফুটবল দলকে খণ্ড খণ্ড করে দেয়। বিশ্বকাপ রানার্স দলের চারজন সুইডেন চলে যান। স্পেনে তিনজন, তাদের একজন পুসকাস। ১৯৫৮ গ্রুপ লীগে ওয়েলসের সঙ্গে তাদের সমান পয়েন্ট হয়। প্লে—অফ ম্যাচে হাঙ্গেরি ২—১ গোলে হারে। স্টকহলমে এই খেলায় ২,৮২৩ জন দর্শক মাঠে ছিল। বিশ্বকাপ চূড়ান্ত পর্বে এটি কম দর্শকের রেকর্ড।
ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এমন কয়েকজন তরুণ প্রথমবার খেলেছেন যাঁরা পরবর্তীকালে প্রবাদপুরুষে পরিণত হন। রাশিয়ার লেভ ইয়াশিন, জার্মানির উভে জিলার, আয়ার্ল্যাণ্ডের ডেরেক ডুগান, ফ্রান্সের রেমণ্ড কোপা এবং জুস্ট ফঁত্যেন আর ব্রাজিলের গ্যারিনচা ও পেলে। ববি চার্লটনকে ইংল্যাণ্ড দলের সঙ্গে সুইডেনে নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু তাকে একটি ম্যাচও খেলান হয়নি।
ব্রাজিল তাদের প্রথম ম্যাচটি খেলে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে। ইওরোপ এই প্রথম ৪—২—৪ ছক চাক্ষুষ করল। ৩—০ গোলে জেতা এই খেলায় মাজ্জোলা (আসল নাম আলতাফিনি) দুটি গোল করেন, অন্যটি নিলটন স্যান্টোসের। পরের খেলায় ব্রাজিল ০—০ ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলে, তৃতীয় ম্যাচে ২—০ গোলে হারায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে। গোল দুটি ভাভা—র। রুশীদের বিরুদ্ধে গোটেনবার্গের ১৫ জুনের এই ম্যাচেই পেলে ও গ্যারিনচা প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে নামেন। কোঃ ফাইনালে ওয়েলসের বিরুদ্ধে গ্যারিনচা, দিদি, পেলে, মাজ্জোলা ও জাগালো সমৃদ্ধ ব্রাজিল ৭০ মিনিট গোল করতে পারেনি। ৭৩ মিনিটে পেলে একক চেষ্টায় তাঁর প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করেন এবং ওই গোলেই ব্রাজিল জেতে। পেলে বলেছেন, ‘এটি তার খেলোয়াড় জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোল।’ সেমি ফাইনালে ফ্রান্সকে ৫—২ হারতে হয় ব্রাজিলের জাদুকরী খেলার কাছে। পেলে হ্যাটট্রিক করেন।
সুইডেন ১৯৫৮ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী খেলায় মেক্সিকোকে ৩—০ হারায়। পেশাদারী প্রথা সুইডেনে চালু হওয়ায়, ম্যানেজার জর্জ রেনর ইতালিতে খেলতে যাওয়া সুইডিশ ভাল খেলোয়াড়দের ডেকে আনেন। মেক্সিকো ১৯৩০ থেকে বিশ্বকাপে চারবার চূড়ান্ত পর্বে খেলে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি। এরপর সুইডেন ২—১ হাঙ্গেরিকে হারিয়ে, ০—০ করে ওয়েলসের সঙ্গে। কোঃ ফাইনালে তারা রুশীদের হারায় ২—০ গোলে আর জার্মানদের ৩—১ গোলে হারায় সেমি ফাইনালে।
ফাইনালে বৃষ্টি ও ভিজে মাঠ এবং নিলস লিয়েডহোমের চতুর্থ মিনিটের গোলে পিছিয়ে পড়েও ব্রাজিল বিপন্নবোধ করেনি। পাঁচ মিনিট পরেই ভাভা গোলটি শোধ করেন, তারপরই ম্যাচের পুরো কর্তৃত্ব ব্রাজিলীয়রা পায়ে তুলে নেয়। ৩২ মিনিটে ভাভা আবার গোল পেলেন। ৫৪ মিনিটে পেলে অকল্পনীয় একটি গোল করলেন। নিলটন স্যান্টোসের পাঠানো পাস বুকে থামিয়ে বলটা উরুতে নামালেন, উরু থেকে সেটা সেন্টার হাফ গুস্তাফসনের মাথার উপর দিয়ে তুলেই তাকে পাশকাটিয়ে ছুটে গিয়ে বল মাটিতে পড়ার আগেই ভলি মেরে গোল করেন। মারিও জাগালো ব্রাজিলের চতুর্থ ও সিমোনসন সুইডেনের দ্বিতীয় গোল করার পর পেলে ব্রাজিলের পঞ্চম গোলটি যুক্ত করেন খেলা ভাঙার এক মিনিট আগে। ইওরোপের মাটিতে এই প্রথম দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বিশ্বকাপ জিতল। তৃতীয় স্থান পেল ফ্রান্স ৬—৩ গোলে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে। মরক্কো থেকে আসা ফ্রান্সের সেন্টার ফরোয়ার্ড জুস্ট ফঁত্যেন প্রতিটি ম্যাচে গোল দিয়ে চূড়ান্ত পর্বে মোট ১৩টি গোল করার যে রেকর্ড করলেন তা এখনো অম্লান রয়েছে। পেলে রেকর্ড করলেন, সবথেকে কম বয়সে—১৭ বছর আট মাসে—চূড়ান্ত পর্বে খেলে, গোল দিয়ে এবং সোনার পদক জিতে। চারটি ম্যাচ খেলে তার গোল সংখ্যা ৬। ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মোট গোল হয় ৩৫টি ম্যাচ থেকে ১২৬টি। সবথেকে বেশি গোল দেয় ফ্রান্স—২৩টি। তারপর ব্রাজিলের—১৬টি। তারা ১৯৩০ থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে চূড়ান্ত পর্বে এ পর্যন্ত ২৩টি ম্যাচ খেলল ১৪টি জিতে এবং ৬৬ গোল দিয়ে। শুধু একটি ম্যাচেই ব্রাজিল গোল দিতে পারেনি, ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ০—০ করে।
