ইতিমধ্যে পশ্চিম জার্মানি বিশ্ব ফুটবল গোষ্ঠীতে আবার এসে ইওরোপে নতুন ফুটবল শক্তিধর রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। চমকপ্রদ প্রতিভাবান একটি প্রজন্মের উদয় ঘটেছে হাঙ্গেরিতেও। ইংল্যাণ্ড তখনো উটপাখির মত বালিতে মাথা ঢুকিয়ে বিশ্বাস করে যাচ্ছে, যারা পৃথিবীকে ফুটবল খেলা শেখাল তারাই তো সবার সেরা! বিশ্বাসের কারণ, দেশের মাটিতে তারা তখনো হারেনি। কিন্তু ১৯৫৩—র নভেম্বরে হাঙ্গেরিয়ানরা লণ্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে এসে ইংল্যাণ্ডের মোহ চূর্ণ এবং ঐতিহ্যের অসারত্ব প্রমাণ করে ৬—৩ গোলে এবং ছ’মাস পর বুদাপেস্তে, বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক তিন সপ্তাহ আগে আবার ৭—১ গোলে ইংরাজদের জবাই করে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়ে গেল দক্ষিণ আমেরিকার কাছ থেকে ফুটবল শ্রেষ্ঠত্ব ছিনিয়ে নিতে এবার একটা দল এসে গেছে। গত চার বছরে তারা একটিও আন্তর্জাতিক ম্যাচ হারেনি।
ফিফা—র ৮০ সদস্যের মধ্যে ৩৬টি দেশ অংশ নেয় পঞ্চম বিশ্বকাপে। উরুগুয়ে ও সুইৎজারল্যাণ্ড ছাড়া হাঙ্গেরিও বাছাই পর্বে না খেলেই চূড়ান্ত পর্বে চলে আসে যেহেতু তাদের গ্রুপের একমাত্র দল পোল্যাণ্ড নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। ব্রাজিল পাঁচটি বিশ্বকাপের সবকটির চূড়ান্ত পর্বে খেলা প্রথম দেশ হল এইবারই। স্পেন ও তুরস্কের মধ্যে খেলায় দু দলই একটি করে জেতায় এবং প্লে—অফ ২—২ হওয়ায় অবশেষে লটারিতে তুরস্ক ভাগ্যবান প্রমাণিত হয়। অস্ট্রিয়া ৯—১ গোলে পর্তুগালকে হারায়। ফ্রান্স ৬—১, ৮—১ লাকসেমবুর্গকে এবং আয়ারল্যাণ্ডকে ৫—৩, ১—০ গোলে হারিয়ে চূড়ান্ত পর্বে আসে। দক্ষিণ কোরিয়া ৫—১ ও ০—০ ফলে জাপানকে হারিয়ে এবং গ্রুপের তৃতীয় দল চীন নাম প্রত্যাহার করায় তারা সুইৎজারল্যাণ্ড যাওয়ার ছাড়পত্র পায়। কিন্তু সেখানে প্রথম খেলাতেই তারা হাঙ্গেরির সামনে পড়ে। দু বছর আগে ওলিম্পিক সোনা জেতা হাঙ্গেরি দলের এগারোজনই মাঠে নামে এবং ৯—০ গোলে জিতে চূড়ান্ত পর্বে একটি খেলায় তখনকার সর্বাধিক গোল দেওয়ার রেকর্ড করে। উরুগুয়ে ৭—০ স্কটল্যাণ্ডকে, ব্রাজিল ৫—০ মেক্সিকোকে হারায়। ম্যাথুজ, ফিনি, লফটহাউস সমৃদ্ধ ইংল্যাণ্ড ৪—৪ করে বেলজিয়ামের সঙ্গে। প্রাথমিক গ্রুপের খেলায় বিশ্বকাপ ইতিহাসের একটা বিরাট ‘যদি’ তৈরি হল। পশ্চিম জার্মানির সেণ্টার হাফ লাইব্রিখ হাঙ্গেরির অধিনায়ক পুসকাসকে যদি লাথি মেরে জখম না করতেন, এই জখমের ফলে পুসকাস ফাইনালের আগে আর খেলতে পারেননি এবং ফাইনালে খেলেছিলেন সম্পূর্ণ ফিট না থেকে। ফাইনালে যদি পুসকাস ফিট থাকতেন তাহলে কি হতে পারত?
গ্রুপ লীগে তুরস্ক ৭—০ কোরিয়াকে হারিয়ে দুটি পয়েণ্ট পেয়েছে। কোঃ ফাইনালে ব্রাজিলের সম্মুখীন না হবার জন্য জার্মানির কোচ শেপ হারবার্গার স্থির করলেন তাদের বিরুদ্ধে গ্রুপের খেলায় হাঙ্গেরি জিতুক। তারপর জার্মানরা তুরস্ককে হারিয়ে দুটি পয়েণ্ট নিয়ে ওদের সঙ্গে সমান হলেই প্লে—অফ ম্যাচ হবে। সেই খেলায় জার্মানরা যে তুর্কিদের হারাবেই হারবার্গারের তাতে কোন সন্দেহ ছিল না। পরিকল্পনা মতই জার্মানরা খেলল। ছয়জন রিজার্ভকে নামিয়ে হাঙ্গেরির কাছে ৩—৮ গোলে হেরে, তুরস্ককে ৪—১ এবং প্লে—অফে ৭—২ গোলে হারিয়ে তারা কোঃ ফাইনালে হাঙ্গেরির বদলে পড়ল যুগোশ্লাভিয়ার সামনে এবং ২—০ জিতল। চারটি গ্রুপের খেলা সম্পূর্ণ হল ৯২ গোলের রেকর্ড তৈরি করে।
কোঃ ফাইনালে ইংল্যাণ্ড ২—৪ গোলে উরুগুয়ের কাছে হারল। বার্ণ শহরে হাঙ্গেরি ও ব্রাজিলের মধ্যে খেলাটি ‘ব্যাটল অব বার্ণ’ নামে কুখ্যাতি লাভ করল মাঠে ও তার বাইরে খেলোয়াড়দের মধ্যে মারপিটের জন্য। খেলার চতুর্থ মিনিটে হিদেকুটির ও অষ্টম মিনিটে কোজিসের গোলে হাঙ্গেরি ২—০ এগিয়ে যায়। বিরতির ঠিক আগে পেনাল্টি কিক থেকে জালমা স্যাণ্টোস একটি গোল শোধ করেন। দ্বিতীয়ার্ধে হাঙ্গেরির ল্যানটস পেনাল্টি কিক থেকে একটি গোল দেন। জুলিনহো শোধ করেন একটি গোল। ব্রাজিল তখন ২—৩ গোলে পিছিয়ে। মাঠে তখন কুৎসিত মারামারি শুরু হয়ে যায়। ইংরাজ রেফারি আর্থার এলিস ব্রাজিলের নিলটন স্যাণ্টোস ও উমবার্তো তোজ্জিকে এবং হাঙ্গেরির বোজিককে মাঠ থেকে বার করে দেন। এরপর কোজিস হাঙ্গেরির চতুর্থ গোলটি করেন। এই খেলায় ৪২টি ফ্রি কিক, দুটি পেনাল্টি, চারজনকে হুঁশিয়ারি এবং তিনজনের বহিষ্কার ঘটে। খেলার পর ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা হাঙ্গেরির ড্রেসিংরুমের আলো নিভিয়ে দিয়ে সেখানে আক্রমণ চালায়।
সেমিফাইনালে জার্মানরা ৬—১ গোলে হারাল অস্ট্রিয়াকে আর হাঙ্গেরি পরিচ্ছন্ন সুন্দর খেলে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে জিতল ৪—২ গোলে। বিশ্বকাপে ১৯৩০ থেকে উরুগুয়ের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙে গেল। বার্ণ—এ ১৪ জুলাইয়ের ফাইনাল নিছকই আনুষ্ঠানিক একটা খেলা হবে ধরে নেওয়া হয় কেননা হাঙ্গেরিকে তখনই বিশ্বকাপ বিজয়ী রূপে সবাই গণ্য করতে শুরু করে দিয়েছে। খেলাটা প্রচণ্ড গতিতে শুরু করে হাঙ্গেরি ছয় মিনিটে পুসকাসের ও সাত মিনিটে জিবরের দেওয়া গোলে ২—০ এগিয়ে যায়। কিন্তু তিন মিনিট পরই মোরলক এবং তার নয় মিনিট পর হেলমুট রাহন গোলদুটি শোধ করে দেন। এরপর বোঝা যেতে থাকে আনফিট পুসকাসকে খেলানোর সিদ্ধান্তটা ভুল হয়েছে। খেলা থেকে তিনি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যান। সমাপ্তির পাঁচ মিনিট আগে রাহন আবার গোল করে পশ্চিম জার্মানিকে অপ্রত্যাশিত জয় এনে দেন। তৃতীয় স্থান পায় অস্ট্রিয়া ৩—১ গোলে উরুগুয়েকে হারিয়ে।
