তৃতীয় বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৫টি দলের মধ্যে ডাচ ইস্ট ইণ্ডিজ ও হল্যাণ্ড কোন গোল করতে পারেনি। সর্বাধিক গোল করে হাঙ্গেরি, ১৫টি। তারপর ব্রাজিল, ১৪টি। ব্যক্তিগত গোল সবথেকে বেশি লিওনিদাসের, চারটি খেলায় আট গোল। এরপর হাঙ্গেরির জেলেঞ্জারের সাতটি। চারটি হ্যাটট্রিক হওয়ার রেকর্ড হয় এবং তা টিকে ছিল ১৯৫৮ পর্যন্ত। যে দশজন বিশ্বকাপ ইতিহাসে ওলিম্পিকস ও বিশ্বকাপ স্বর্ণপদক জিতেছেন তাদের শেষ তিনজন, ইতালির ফোনি, রাভা ও লোকাতেল্লি খেললেন এইবার। ওরা ১৯৩৬ ওলিম্পিকস ফাইনালে জিতেছিলেন।
১৯৫০ ব্রাজিল
১৯৩৯ সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা দীর্ঘ ১২ বছর বন্ধ থেকে চতুর্থবারের মত শুরু হয় ব্রাজিলে। ১৯৩৪ থেকে ১৬ বছর ধরে ইতালির দখলে ছিল বিশ্বকাপ ও বিশ্ব খেতাব। ফিফার ৬৮ সদস্যের মধ্যে ৩১টি দেশ নাম দেয় এবং চূড়ান্ত পর্বের ১৬ দলের মাত্র ১৩টি হাজির হয়। ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়া এল না। জার্মানি তখনো ফিফা—র বাইরে। বহু অর্থব্যয় করে এতদূর এসে শুধু একটি ম্যাচ খেলেই কোন দেশকে যাতে ফিরে যেতে না হয় সেজন্য এইবার প্রতিযোগিতা নতুনভাবে বিন্যস্ত হল। প্রথম বিশ্বকাপের মত চারটি যোগ্যতা নির্ধারক গ্রুপ করে তার শীর্ষস্থানীয় চার দলকে নিয়ে চূড়ান্ত একটি লীগ খেলার ব্যবস্থার করা হয়, নক আউটের বদলে। লীগ বিজয়ীই পাবে জুল রিমে ট্রফি। উরুগুয়ে ২০ বছর পর আবার খেলতে এল আর এই প্রথমবার এল ইংল্যাণ্ড। গত দুইবারের বিজয়ী ইতালি খেতাব রক্ষার জন্য এল বটে কিন্তু তাদের আশা চূর্ণ হয়ে গেছল ১৯৪৯ মে মাসে বিমান দুর্ঘটনায় যখন তোরিনো ক্লাবের ১৭ জন খেলোয়াড় মারা গেলেন। ওদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন ইতালির আন্তর্জাতিক ফুটবলার।
৩১৮ মিটার উঁচু এবং ৯৪৫ মিটার বৃত্তের এক নতুন স্টেডিয়াম এই বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার জন্য রিও ডি জেনিরোয় মারাকানা নদীর ধারে তৈরি করা হল। তাতে দু লক্ষ দর্শক খেলা দেখতে পারবেন। ১৯৫০—এর ২৪ জুন ব্রাজিল মারাকানা স্টেডিয়ামে ৪—০ গোলে মেক্সিকোকে হারিয়ে চতুর্থ বিশ্বকাপের উদ্বোধন করে। প্রথম দুটি গোল করেন আদেমির। ইংল্যাণ্ড এই স্টেডিয়ামেই তাদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচটি খেলল চিলির সঙ্গে এবং জিতল ২—০ গোলে। তখন বিশ্বের নামী কয়েকজন খেলোয়াড় ছিলেন ইংল্যাণ্ড দলে, যেমন অধিনায়ক বিলি রাইট, ম্যানিয়ন, টম ফিনি, আলফ র্যামজি, বেণ্টলি, মর্টেনসন এবং স্ট্যানলি ম্যাথুজ। তবে প্রথম দুটি ম্যাচে ম্যাথুজকে খেলান হয়নি। তাদের দ্বিতীয় ম্যাচটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, রিও থেকে ৩০০ মাইল দূরে বেলো হরাইজেন্তাো (বিউটিফুল হরাইজন) শহরে। এই যুক্তরাষ্ট্র দলটি ছিল যেন এক খুদে রাষ্ট্রপুঞ্জ। এর অধিনায়ক একজন স্কট, একজন ব্যাক ছিলেন বেলজিয়ান, সেণ্টার ফরোয়ার্ড গেতিয়েনস ছিলেন হাইতির লোক, তাছাড়া ছিলেন দু’জন ইতালিয়ান, একজন দক্ষিণ আমেরিকান, একজন আইরিশ—আমেরিকান ও দু’জন জার্মান—আমেরিকান। এরা প্রথম ম্যাচে স্পেনের কাছে ১—৩ হেরে মুখোমুখি হল ইংল্যাণ্ডের এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের বৃহত্তম আপসেটটি ঘটাল। জোড়াতালি দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রকে তুড়ি মেরে ওড়াব এমন এক মনোভাব নিয়ে ইংল্যাণ্ড মাঠে নেমেছিল। ৩৮ মিনিটে হেড করে গেতিয়েনসের দেওয়া গোলে ১—০ জিতে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল দুনিয়াকে স্তম্ভিত করে দেয়। ইংল্যাণ্ডের পরের ম্যাচ স্পেনের সঙ্গে। ম্যাথুজকে নামিয়েও তারা ১—০ হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায়। যুক্তরাষ্ট্রও বিদায় নেয় চিলির কাছে ৫—২ হেরে।
ইংরাজ কোচ জর্জ রেনরের হাতে গড়া সুইডেন দল ১৯৪৮ ওলিম্পিকসে সোনা জিতেছিল। ব্রাজিলে তিনি যে দলটি আনেন সেটি পুরোপুরিই অপেশাদার। ৩—২ গোলে এরা ইতালিকে হারায়। এরপর ইতালি ২—০ প্যারাগুয়েকে হারালেও আর এগোতে পারেনি। উরুগুয়ে ৮—০ বলিভিয়াকে হারিয়ে চার দলের চূড়ান্ত লীগে ব্রাজিলের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল। লীগে বাকি দুটি দল হল সুইডেন ও স্পেন। ব্রাজিল ৭—১ সুইডেনকে ও ৬—১ স্পেনকে হারিয়ে দেওয়ায় এবং উরুগুয়ে ২—২ স্পেনের সঙ্গে খেলা শেষ করায় কারুর আর কোন সন্দেহ রইল না বিশ্বকাপটি ব্রাজিলের অধিনায়ক অগাস্তোর হাতেই উঠছে। তারা তখন ২৫—১ ফেভারিট।
সরকারীভাবে বলা হয়েছিল ১৬ জুলাই লীগের শেষে খেলাটি দেখতে ১,৯৯,৮৫০ দর্শক মারাকানা স্টেডিয়ামে ছিল, আসলে ছিল দু’লক্ষেরও বেশি। বিশ্বকাপে এটা একটা রেকর্ড। খেলা শুধু ড্র রাখলেই ব্রাজিল ট্রফি জিতে যাবে। কিন্তু শেষের এই খেলাটি যে ধাক্কা দিল সেটা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইংল্যাণ্ডের পরাজয়ের থেকেও বেশি। হাফটাইমের দু মিনিট পর ব্রাজিলের ফ্রিয়াকা গোল দেন। ১৮ মিনিট পর শিয়াফিনো সেটি শোধ করেন। ৮০ মিনিটে ঘিগ্গিয়া গোল দিয়ে উরুগুয়েকে আবার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন করেন। তৃতীয় স্থান পায় সুইডেন ৩—১ স্পেনকে হারিয়ে।
চতুর্থ বিশ্বকাপে ২২টি খেলায় হয় ৮৭ গোল। সবথেকে বেশি গোল দেয় ব্রাজিল ২২টি, তারপর উরুগুয়ে ১৫টি। ব্যক্তিগত সর্বোচ্চচ গোল ব্রাজিলের আদেমির করেন, ৭টি। ১৯৩০ বিশ্বকাপে উরুগুয়ের জোসে আন্দ্রাদে বিজয়ীর পদক পান, ১৯৫০—এ তার ভাইপো রডরিগুয়েজ আন্দ্রাদেও বিজয়ীর পদক পেলেন। দুই ভাই একই খেলায় গোল করার প্রথম নজির রাখলেন প্যারাগুয়ের আন্তাোনিও এবং ফ্রান্সেসকো লোপেজ। তারা গোল দেন সুইডেনকে।
১৯৫৪ সুইৎজারল্যাণ্ড
ফিফা—র ৫০ বছর পূর্তি এবং তার সদর দফতর জুরিখে সুতরাং পঞ্চম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা তো সুইৎজারল্যাণ্ডে হওয়াই স্বাভাবিক। চূড়ান্ত পর্বের বিন্যাস আর একবার বদলান হল। ১৬টি দলকে চারটি গ্রুপে ভাগ করে, প্রতি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল। সেখানে চার গ্রুপ বিজয়ীরা একদিকে এবং চার রানার্সরা অন্যদিকে নকআউট খেলে সেমিফাইনালে চারটি দল এবং তারপর ফাইনালে দুটি দল যাবে।
