৫৫ হাজার দর্শক রোম স্টেডিয়ামে ফাইনাল খেলা দেখে তার মধ্যে ছিলেন মুসোলিনিও। চেকদের পক্ষে প্রথম গোল করেন পুক ৭০ মিনিটে। ১২ মিনিট পর ওরসি গোলটি শোধ করেন। ১—১ খেলা শেষ হবার পর অতিরিক্ত সময়ের সাত মিনিটে শিয়াভিও গোল করে ইতালিকে বিশ্বকাপ জয়ী করান। তৃতীয় স্থান পায় জার্মানি ৩—২ গোলে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে। প্রথমবারের মত দ্বিতীয় বিশ্বকাপেও গোল হয়েছে ৭০টি, ১৬টি ম্যাচ ও একটি রি—প্লে থেকে। সর্বাধিক গোল দেয় ইতালি ১২টি, তারপর জার্মানি ১১টি। প্রত্যেকটি দেশই গোল করেছে। ব্যক্তিগত সর্বাধিক গোল ৪টি করে দিয়েছিলেন।
তিনজন—শিয়াভিও (ইতালি), নিদলি (চেকোশ্লোভাকিয়া) এবং কোনেন (জার্মানি)।
১৯৩৮ ফ্রান্স
নিজ দেশে খেললে সুবিধা বেশি পাওয়া যায়, এই ধারণাটা প্রথম দুটি বিশ্বকাপের পর বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছিল কিন্তু ফ্রান্সে ১৯৩৮ বিশ্বকাপে সেটা উৎপাটিত হল ইতালির খেতাব রক্ষার দ্বারা। ইওরোপে তখন যুদ্ধের ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে। জার্মানি দখল করে নিয়েছে অস্ট্রিয়া, স্পেনে গৃহযুদ্ধ চলছে। বিশ্বকাপ অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিল আর্জেন্তিনা কিন্তু না পাওয়ায় তারা বয়কট করেছে। উরুগুয়ে এবারও উপেক্ষা করল। অস্ট্রিয়া নাম প্রত্যাহার করায় শূন্যস্থান পূরণে ইংল্যাণ্ডকে আমন্ত্রণ করা হয় কিন্তু তারা অংশ নিতে রাজি হল না। ইতালির শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারার মত দেশগুলির কয়েকটি এবার অংশ নেয়নি। চার বছর আগে বিশ্বকাপ জয়ী দলটির মাত্র দু’জন, মিয়াজ্জা ও ফেরারি ছাড়া ১৯৩৮—এ সবাই নতুন মুখ। ১৯৩৬—এ ম্যানেজার পোজ্জোর গড়া দল ওলিম্পিক সোনা জেতে। সেই দলের তিনজনকে তিনি বিশ্বকাপ দলে তুলে আনেন আর আবিষ্কার করেন এক মারাত্মক সেণ্টার ফরোয়ার্ড—সিলভিয়ো পিওলা।
ফিফা—র সদস্য এখন ৫১। বিশ্বকাপে যোগ দেয় ৩৬টি দেশ। এইবারই প্রথম খেতাব দখলে রাখা দেশ এবং অনুষ্ঠাতা দেশ যোগ্যতা পর্ব থেকে না খেলে সরাসরি চূড়ান্ত পর্বে খেলছে। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এসেছে শুধু ব্রাজিল। তাদের দলে আছে ‘ব্ল্যাক ডায়মণ্ড’ লিওনিদাস দা সিলভা নামে নতুন এক চাঞ্চল্যকর সেণ্টার ফরোয়ার্ড। এশিয়া থেকে প্রথম দেশ ডাচ ইস্ট ইণ্ডিজ এবারই চূড়ান্ত পর্বে খেলতে এসেছে আর এসেছে কিউবা। বলাবাহুল্য দুটি দেশেরই এই প্রথম এবং এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত পর্বে শেষ আবির্ভাব। তবে কিউবা প্রথম রাউণ্ডে রুমানিয়ার সঙ্গে ৩—৩ করে রি—প্লেতে ২—১ গোলে জেতে। কিন্তু দ্বিতীয় রাউণ্ডে ০—৮ হারে সুইডেনের কাছে এবং গুস্তাফ ভেটারস্ট্রোম চারটি গোল করে। ডাচ ইস্ট ইণ্ডিজকে প্রথম খেলাতেই ০—৬ গোলে হারায় হাঙ্গেরি। অস্ট্রিয়ার সেরা চারজন খেলোয়াড়কে শেপ হারবার্গার তাঁর জার্মান দলে নিয়ে সুইৎজারল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ১—১ করেন। রি—প্লে খেলায় জার্মানি ২—৪ গোলে হেরে যায়। বিশ্বকাপে প্রথম আত্মঘাতী গোলটি হয় এই খেলায় যখন জার্মানি দ্বিতীয় গোলটি পায় সুইৎজারল্যাণ্ডের লোয়েৎশারের দ্বারা।
প্রথম রাউণ্ডে ব্রাজিল ও পোল্যাণ্ডের খেলায় হয় মোট ১১ গোল। ৯০ মিনিট খেলার পর ফল থাকে ৪—৪, এত গোলে অমীমাংসিত থাকারও এটি রেকর্ড। একটি খেলায় দু’জনের হ্যাটট্রিক এবং দু’জনের প্রত্যেকের চারটি করে গোল দেওয়া (তৃতীয় লোক ভেটারস্ট্রোম) এটিও চূড়ান্ত পর্বের রেকর্ড এবং এখনো তা বজায় রয়েছে। ব্রাজিলের লিওনিদাস প্রথমার্ধে এবং পোল্যাণ্ডের আরনেস্ট ভিলিমৌস্কি দ্বিতীয়ার্ধে হ্যাটট্রিক এবং অতিরিক্ত সময়ে দু’জনেই আবার একটি করে গোল দেন। সমাপ্তির কিছু আগে ব্রাজিলের রোমু গোল দিয়ে ব্রাজিলকে ৬—৫ জেতান। এরপর ব্রাজিলকেই বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ীরূপে গণ্য করা হতে থাকে।
কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল ও চেকোশ্লোভাকিয়ার খেলায় এত বেশি বন্য পদ্ধতির প্রয়োগ হয়েছিল যে ব্রাজিলের দু’জন ও চেক দলের একজনকে মাঠ থেকে বার করে দেওয়া হয়। চেক দলের গোলরক্ষক প্ল্যানিকার হাত এবং ইনসাইড লেফট নিদলির পা ভাঙে। খেলা ১—১ হয়। রি—প্লেতে দুটি দলই প্রায় নতুন খেলোয়াড়ে সাজান হয়। ব্রাজিলের লিওনিদাস ও গোলকিপার ওয়াল্টার ছাড়া আগের ম্যাচের আর কেউ ছিল না। চেক—রা নামায় নতুন ছয়জনকে। শান্তভাবে খেলাটি হয়। ব্রাজিল ২—১ গোলে যেতে।
সেমিফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে ব্রাজিলের ম্যানেজার পিমেণ্টা তৃতীয় বিশ্বকাপের সবথেকে গুরুতর ভুলটি করলেন দলের দুই সেরা, প্রতিযোগিতার দুই অসাধারণ নায়ক লিওনিদাস এবং টিমকে বসিয়ে রেখে। ‘ফাইনালের জন্য ওদের তুলে রাখলাম।’ দম্ভভরে তিনি এই কথা বলেছিলেন। কিন্তু ফাইনালে আর ব্রাজিলকে পৌঁছতে হল না। দুটি ম্যাচে ছয় গোল করা লিওনিদাসকে বাদ দিয়ে খেলতে নামার মাশুল গুনতে হল ব্রাজিলকে ১—২ গোলে হেরে। অন্য সেমিফাইনালে খেলার ৩৫ সেকেণ্ডে বিশ্বকাপে তখনকার দ্রুততম গোলটি করে সুইডেনের ওলে নাইবার্গ হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে দলকে এগিয়ে দিলেও তারপর পাঁচটি গোল খেয়ে ১—৫ গোলে হেরে যায়। প্যারিসে কলম্বেস স্টেডিয়ামে ৪৫ হাজার দর্শকের সামনে ফাইনাল খেলায় ইতালি ৪—২ গোলে হাঙ্গেরিকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতে। সুইডেনকে ৪—২ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল তৃতীয় স্থানাধিকারী হয়।
